পবিত্র লাইলাতুল বারাত সম্পর্কে আলোচনা –


পবিত্র লাইলাতুল বারাত সম্পর্কে আলোচনা –
*******************************************
গত কালের পর —
********************
*** কুরআন শরীফ-উনার আয়াত শরীফ দ্বারাই “শবে বরাত” প্রমাণিতঃ
শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক স্বীয় কুরআন শরীফ- উনার সূরা ‘আদ দোখান’ উনার ৩-৪ নম্বর আয়াত শরীফে ليلة المبارك (বরকত পূর্ণ রাত) হিসেবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ্ পাক তিনি ইরশাদ করেন-
(১)
انا انزلناه فى ليلة مباركة انا كنا منذرين. فيها يفرق كل امر حكيم
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি উহা (কুরআন শরীফ) এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে নাজিল করেছি | অর্থাৎ নাযিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি | নিশ্চয় আমি সতর্ককারী, ওই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপূর্ণ কাজসমূহের বন্টন করা হয় তথা বন্টনের ফায়সালা করা হয় |”
(সূরা আদ দোখান/৩-৪)
>>> উক্ত আয়াত শরীফ-এ বর্ণিত ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ দ্বারা অনুসরনীয় মুফাসসিরীনে কিরামগণ শবে বরাতকেই বুঝিয়েছেনঃ
ليلة مباركة দ্বারা বিশ্ববিখ্যাত ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা এবং হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা বলেন-
(২)
هى ليلة النصف من شعبان وسمى ليلة الرحمة والليلة المباركة وليلة الصك
অর্থ: “লাইলাতুম মুবারাকা দ্বারা লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান তথা অর্ধ শাবানের রাত (শবে বরাত) কে বুঝানো হয়েছে যেমন ليلة الرحمة (লাইলাতুর রহমত) তথা রহমতের রাত, ليلة المباركة (লাইলাতুল মুবারাকাতু) তথা বরকতের রাত | ليلة الصك (লাইলাতুছ ছেক) ভাগ্য লিপিবদ্ধকরণের রাত তথা ভাগ্য রজনী |”
আর ليلة مبارك (বরকতপূর্ণ রাত) দ্বারা শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ বহন করে তার পরবর্তী আয়াত শরীফের يفرق (বন্টন করা হয়) শব্দ দ্বারা | কেননা তাফসীর জগতের সকল তাফসীরে সমস্ত মুফাসসীরীনে কিরাম উনারা يفرق শব্দের তাফসীর করেন يكتب (বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়) يبرم (বাজেট করা হয়) “ فيصله ” (নির্দেশনা দেয়া হয় বা ফায়সালা করা হয়) ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে | কাজেই يفرق শব্দের অর্থ ও তার ব্যাখ্যার দ্বারা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল যে, ليلة المباركة দ্বারা ليلة النصف من شعبان অর্ধ শা’বানের রাত, বা শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে | যেই রাতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বৎসরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্য লিপি অনুসারে রমাদ্বান মাসে ليلة القدر বা শবে ক্বদরে তা চালু করা হয় | এ জন্য
ليلة النصف من شعبان
অর্ধ শাবানের রাতকে ليلة التجويز (নির্ধারণের বা বৈধকরণের রাত) এবং ليلة القدر কে ليلة التنفيذ (নির্ধারিত ফয়সালা কার্যকরী করার রাত বা বৈধকরণ বিষয়ের কার্যকরীকরণের রাত) বলা হয় |
(তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে খাযেন, তাফসীরে রুহুল মায়ানী ও রুহুল বায়ান)
 
>>> পাক ভারত উপমহাদেশে উক্ত বরকতময় রজনী ‘শবে বরাত’ হিসেবে মশহূর হওয়ার কারণঃ
স্থান, কাল, পরিবেশ ভেদে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের স্থানান্তরের কারণে এবং তাদের আধিপত্য বিস্তারের কারণে একই অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলেও প্রাধান্য তথা মাশহুবিয়াত লাভ করে থাকে | যা মূলত একই বিষয় ও বস্তুকে বুঝিয়ে থাকে | যেমন, উল্লিখিত নামসমূহ দ্বারা ليلة النصف من شعبان বা শা’বানের ১৫ তারিখ রাতকে বুঝানো হয় | একে ফারসীতে ‘শবে বরাত’ বাংলায় ‘মুক্তির রাত’ বা ‘ভাগ্য রজনী” বলে থাকে | আর এই ‘শবে বরাত’ শব্দটি যদিও বাহ্যত আরবী ও ফারসীর সমন্বয়ে গঠিত | তবুও তা ফারসী ভাষা | কেননা, ফারসী ভাষা মূলত আরবী ও ফারসীর সংমিশ্রণে গঠিত | তদ্রূপ উর্দূ ভাষাও মূলত আরবী উর্দূ এর সংমিশ্রণে গঠিত | যেমন,
افتاب الدين
(এখানে উর্দূ শব্দটি কমেন্ট বক্সে স্ক্রীন শর্ট দেয়া হলো)
شاه مخدوم شاه كبير . شاه عالم شاه صوفى . فول صرط . غول نور . شب معراد . اب حياة . قدرة خدا . اب زمزم . شب قدر
অনরূপভাবে شب براءة শব্দটিও আরবী ফারসীর সমন্বয়ে গঠিত | এরূপ আরো কোটি কোটি শব্দ রয়েছে | যা দ্বারা অসংখ্য অগণিত বিশ্বখ্যাত কিতাবও রচিত হয়েছে | তবে আমাদের দেশে ফারসী ও আরবী ভাষার প্রচলন এত ব্যাপক কেন? এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, এদেশের মানুষ ছিল বিভিন্ন বাতিল ধর্মের করাগ্রাসে নিমজ্জিত | আরবী ও ফারসী দেশ থেকে অসংখ্য আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ইসলামের মর্মবাণী এদেশের মানুষদের মাঝে প্রচার করে তাদেরকে কালিমা শরীফ পড়িয়ে মুসলমান বানিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন | ফলে এদেশের মানুষ মুসলমানের মহা সনদ লাভ করেন | বিশেষ করে ফারসী ভাষাভাষী আওলিয়ায়ে কিরামগণদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য | তাঁদের ছোহবত ও কুরবতের কারণে তাঁদের ফারসী ভাষাগুলো আমাদের কাছে ক্রিয়া করে মাশহূরিয়াত লাভ করেছে | তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ‘শবে বরাত’ |
উল্লেখ, এক ভাষায় অপর ভাষার শব্দের মিশ্রণ মূলত একটি অনিবার্য ঐতিহ্য | প্রায় সব ভাষায়ই এর নিদর্শন রয়েছে | আমাদের বাংলা ভাষায়ও এর নিদর্শন অনেক | এবং এটি প্রায় সব ভাষায়ই প্রকৃতি | ব্যাকরণের ভাষায় একে বলা হয় মিশ্র শব্দ | প্রতি ভাষায়িই মিশ্র শব্দের ব্যবহার রয়েছে |
কাজেই যারা বলবে যে, অর্ধেক আরবী আর অর্ধেক ফারসী ভাষার শব্দের মিশ্রন গ্রহণযোগ্য নয় | তারা মূলত শুধু ইসলাম সম্পর্কেই অজ্ঞ নয় বরং দুনিয়াবী জ্ঞানের দিক থেকেও তারা প্রাইমারি স্তরের জ্ঞানও রাখে না |
Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে