পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে আলোচনা —


পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে আলোচনা —
**************************************
কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফে শবে বরাতের কোন অস্তিত্ব নেই- এ বক্তব্য সম্পূর্ণ জিহালতপূর্ণ ও গুমরাহীমূলক, যা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত-ধারাবাহিক।
*********************************************************************
انا انزلناه فى ليلة مباركة انا كنا منذرين. فيها يفرق كل امر حكيم
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি উহা (কুরআন শরীফ) এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে নাজিল করেছি | অর্থাৎ নাযিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি | নিশ্চয় আমি সতর্ককারী, ওই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপূর্ণ কাজসমূহের বন্টন করা হয় তথা বন্টনের ফায়সালা করা হয় |”
(সূরা আদ দোখান/৩-৪)
 
“শবে বরাত” শব্দের তাহক্বীক্ব বা বিশ্লেষণ ও ভাষা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা-
মহান আল্লাহ্ পাক তিনি ইনসান তথা মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের জীবন যাপন করার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন | আর এই ইনসান তথা মানবজাতিকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে তাদের বসবাসের স্থানও নির্ধারণ করে দিয়েছেন |
মানবজাতির বিভিন্ন দলভুক্ত এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডে বসবাস করার কারণে তাদের মুখনিঃসৃত বাণী তথা তাদের মুখের ভাষা বা লিখনীও বিভিন্ন ভাষায় হয়ে থাকে | এর সমর্থনে মুহাদ্দিসীনে কিরামগণ ‘মিশকাত শরীফে’ বর্ণিত এ হাদীছ শরীফখানা পেশ করেন-
عن عمر بن خطاب رضى الله تعالى …… قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان هذا القران انزل على سبعة احرف
অর্থ: “হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত | রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, পবিত্র কুরআন শরীফ সাত হুরুফ তথা সাত ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে |” (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)
মূলত হাদীছ শরীফখানার ব্যাখ্যার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, পৃথিবীতে যত ভাষাভাষীর মানব সম্প্রদায় রয়েছে, তাদের সকলের জন্য একমাত্র হিদায়েতের মুল হচ্ছে কুরআন শরীফ এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মুবারক তথা হাদীছ শরীফ | আর উভয়টি হচ্ছে আরবী ভাষায় | এ কারণে | আরবী ভাষা সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষা | তাই রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-
عن عبد الله بن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى عليه وسلم احبوا العرب لثلاث لأنى عربى والقران عربى وكلام اهل الجنة عربى.
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত | তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা তিন কারণে আরবী ভাষাকে মুহব্বত কর | কেননা আমি স্বয়ং আরবী অর্থাৎ আমার ভাষা মুবারক আরবী | আল্লাহ্ পাক-এর কালাম পাকও হচ্ছে আরবী এবং জান্নাতের ভাষাও হচ্ছে আরবী |”
(তাফসীরে কুরতুবী ১ম খণ্ড)
তাই আরবী ভাষা ব্যবহার করা সুন্নত এবং তা হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত আছে |
আরবী তথা কালামুল্লাহ শরীফ-এর ভাষা ব্যবহার করলে প্রতি হরফে দশগুণ ছওয়াব পাওয়া যায় | তবে তাই বলে অন্যান্য ভাষা যে ব্যবহার করা নাজায়িয তা নয় | বরং মূল আক্বীদা ঠিক রেখে যে কোন ভূখণ্ডের মানুষ যে কোন ভাষায় আল্লাহ পাককে এবং আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডাকতে ও সন্তুষ্ট করতে পারেন; ছলাতে তথা নামাযে ও তিলাওয়াত ব্যতীত |
কাজেই বুঝা গেল যে, অন্যান্য ভাষা জায়িয তো অবশ্যই বরং এক দিক থেকে সুন্নতও বটে | কেননা, স্ব-স্ব স্থানীয় আধিবাসীদের জন্য তাদের স্থানীয় তথা মাতৃভাষা ব্যবহার এই দিক থেকে সুন্নত | যেহেতু রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় মাতৃভাষাই কথা বলতেন |
তবে আরবী ভাষা যে যে ক্ষেত্রে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া আছে তা ব্যতীত সকল ক্ষেত্রেই মূল ভাব ও বিষয় ঠিক রেখে একই বিষয় ও বস্তুকে বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহার করাও আল্লাহ্ পাকের সুন্নত | যেমন কালামুল্লাহ্ শরীফ-এর ভাষা হচ্ছে আরবী | এতে অন্যান্য আজমী ভাষাও উল্লেখ করে আল্লাহ্ পাক অন্যান্য ভাষার ব্যবহার শিক্ষা দিয়েছেন |
কুরআন শরীফ-এ রয়েছে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নাম মুবারক যা ছুরইয়ানী ভাষার অন্তর্ভূক্ত | হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম ও হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর নাম মুবারক যা হিব্রু ভাষার অন্তর্ভূক্ত | এরূপ শব্দ মুবারক যা আরবী নয় বরং অনারবী তথা আরবী ও আজমী’র সংমিশ্রণে পবিত্র কুরআন শরীফ | তবে আরবী সংখ্যাধিক্য হওয়ার কারণে আরবী |
অনুরূপভাবে হাদীছ শরীফেও আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজে আরবী ও অনারবী ভাষা ব্যবহার করেছেন | তদ্রুপ আওলিয়ায়ে কিরামগণও ওইরূপ ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং স্থান, কাল, পাত্র, পরিবেশ ও অঞ্চল ভেদে মূল বিষয় তথা একই বস্তু ও জিনিস এর মূল ভাব ঠিক রেখে একই অর্থে তা বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহার হয়ে থাকে | এটা জায়িয তো বটেই বরং ক্ষেত্র বিশেষে সুন্নাতুল্লাহ, সুন্নাতে রসূলুল্লাহ্ ও সুন্নাতুল আওলিয়া এবং সুন্নাতুল আউয়ালীন ওয়াল আখিরীন |
এর অসংখ্য ও অগণিত উদাহরণ রয়েছে | নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ বর্ণনা করা হলো-
যেমন, ‘ছলাত’ শব্দটি আরবী | যা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত পাঁচবার পড়া প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য (শর্ত সাপেক্ষে) ফরয | ‘ছলাত’ শব্দটিকে ফারসী ভাষায় বলা হয় ‘নামায’| উর্দূতেও নামায বা ‘বন্দিগী’| বাংলায় ‘প্রার্থনা’| ইংরেজিতে Prayer (প্রেয়ার) | আরো অন্যান্য ভাষাভাষীর লোকেরা অন্যান্য ভাষায় ‘ছলাত’ শব্দকে বুঝিয়ে থাকে যার মূল ভাব, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন |
অনুরূপভাবে ‘রোযা’ শব্দটি ফারসী | আরবীতে বলা হয় ‘ছিয়াম’ | ইংরেজীতে বলে Fasting (ফেসটিং) বাংলায় আমরা বলে থাকি অভূক্ত থাকা, পানাহার ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি |
যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন| কিন্তু বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহার হলেও সকল ভাষার মূল বিষয় হচ্ছে ‘ছিয়াম’ |
অনুরূপভাবে معراج (মি’রাজ) এর রাত্রিকে আরবীগণ বলে থাকেন, ليلة المعراج বা ليلة الاسراء (লাইলাতুল আসরা) |
ফরাসীগণ ফারসী ভাষায় এটাকে شب معراج (শবে মি’রাজ) বলে থাকেন | উর্দূতে معراج كى ليل (মি’রাজ কী লাইল) বাংলায় যার অর্থ হচ্ছে ঊর্ধ্বগমনের রাত | একইভাবে ক্বদরের রাতকে আরবীতে ليلة القدر ফারসীতে শবে ক্বদর বলা হয় |
তদ্রুপ ‘শবে বরাত’ ফারসী ভাষায় ব্যবহার হয় যার বাংলায় অর্থ হচ্ছে ভাগ্যরজনী বা মুক্তির রাত | আরবীতে শবে বরাতের বহু নাম রয়েছে যা বিশ্ববিখ্যাত হাদীছ শরীফ-এর কিতাবে এবং সর্বজনমান্য তাফসীর ও ফিক্বাহর কিতাবসমূহে উল্লেখ হয়েছে | যেমন-
>>> কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, তাফসীর ও ফিক্বাহর কিতাবে বর্ণিত ‘শবে বরাত’- এর অন্যান্য নামসমূহঃ
(১) الليلة المباركة (আললাইলাতুল মুবারকাতু) বরকতময় রজনী |
(২) ليلة النصف من شعبان (লাইলাতুল্ নিছফি মিন শা’বানা) অর্ধ শা’বানের রজনী |
(৩) ليلة القسمة (লাইলাতুল ক্বিসমাতি) ভাগ্য রজনী |
(৪) ليلة التكفير (লাইলাতুত্ তাকফীরি) গুনাহখতা ক্ষমা বা কাফফারার রাত্রি |
(৫) ليلة الاجابة (লাইলাতুল ইজাবাতি) দোয়া কবুলের রাত্রি |
(৬) ليلة الحياة (লাইলাতুল হায়াতি) হায়াত বা আয়ু বৃদ্ধির রাত্রি |
(৭) ليلة عيد الملائكة (লাইলাতু ঈদিল্ মালায়িকাতি) ফেরেশতাগণের ঈদের রাত্রি |
(৮) ليلة البراءة (লাইলাতুল বারাআতি) মুক্তির রাত্রি বা ভাগ্য বন্টনের রাত |
(৯) ليلة التجويز (লাইলাতুত্ তাজবীযি) বিধান সাব্যস্ত করার রাত্রি |
(১০) ليلة الفيصلة (লাইলাতুল ফায়সালাতি) সিদ্ধান্ত নেয়ার রাত্রি |
(১১) ليلة الصك (লাইলাতুছ্ ছক্কি) ক্ষমা স্বীকৃতি দানের রাত্রি |
(১২) ليلة الجاءزة (লাইলাতুল জায়িযাতি) মহা পুরস্কারের রাত্রি |
(১৩) ليلة الرجحان (লাইলাতুর্ রুজহানি) পরিপূর্ণ প্রতিদানের রাত্রি |
(১৪) ليلة التعظيم (লাইলাতুত্ তা’যীমি) সম্মান হাছিলের রাত্রি |
(১৫) ليلة التقدير (লাইলাতুত্ তাক্বদীরি) তক্বদীর নির্ধারণের রাত্রি বা ভাগ্য নির্ধারণের রাত |
(১৬) ليلة الغفران (লাইলাতুল গুফরানি) ক্ষমাপ্রাপ্তির রাত্রি |
(১৭) ليلة العتق من النار (লাইলাতুল ইতক্বি মিনান্ নীরানি) জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার রাত্রি |
(১৮) ليلة العفو (লাইলাতুল আফবি) অতিশয় ক্ষমা লাভের রাত্রি |
(১৯) ليلة الكرام (লাইলাতুল কারামি) অনুগ্রহ হাছিলের রাত্রি |
(২০) ليلة التوبة (লাইলাতুত্ তাওবাতি) তওবা কবুরের রাত্রি |
(২১) ليلة الندم (লাইলাতুন্ নাদামি) কৃত গুনাহ স্মরণে লজ্জিত হওয়ার রাত্রি |
(২২) ليلة الذكر (লাইলাতুয্ যিকরি) যিকির-আযকার করার রাত্রি |
(২৩) ليلة الصلوة (লাইলাতুছ্ ছলাতি) নামায আদায়ের রাত্রি |
(২৪) ليلة الصدقة (লাইলাতুছ্ ছদাক্বাতি) দানের রাত্রি |
(২৫) ليلة الخيرات (লাইলাতুল খইরাতি) নেক কাজ সম্পাদনের রাত্রি |
(২৬) ليلة انزال الر حمة (লাইলাতু ইনযালির রহমাতি) রহমত নাযিলের রাত্রি |
(২৭) ليلة صلوة وسلام على سيد المر سلين صلى الله عليه وسلم (লাইলাতু ছলাতিন ওয়া সালামিন আলা সাইয়্যিদিল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাইয়্যিদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ছলাত ও সালাম পাঠের রাত্রি ইত্যাদি | (ইনশাআল্লাহ চলবে)
 
Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে