পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ তথা ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা বান্দা-বান্দী ও উম্মতের জন্য ফরয হওয়ার প্রমাণ


উছুলে ফিক্বাহর সমস্ত কিতাবেই উল্লেখ আছে যে-
اَلْاَمْرُ لِلْوُجُوْبِ
অর্থাৎ আদেশসূচক বাক্য দ্বারা সাধারণত ফরয-ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়ে থাকে। (উছূলুল বাযদুবী, উছূলুশ শাশী, আল মানার, নূরুল আনওয়ার) যেমন- পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- اَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ অর্থাৎ “তোমরা নামায আদায় কর।” পবিত্র কুরআন শরীফ উনার এ নির্দেশসূচক বাক্য দ্বারাই নামায ফরয সাব্যস্ত হয়েছে। অনুরূপ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- وَاعْفُوا اللُّحٰى অর্থাৎ “তোমরা (পুরুষরা) দাড়ি লম্বা কর।” পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার এ নির্দেশসূচক বাক্য দ্বারাই কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয-ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়েছে। ঠিক একইভাবে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা অর্থাৎ সাইয়্যিদুল আ’দাদ ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ইছনাইনিল আযীম শরীফ (সোমবার)-এ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত শরীফ উপলক্ষে ঈদ করা তথা খুশি প্রকাশ করা বান্দা-বান্দী ও উম্মতের জন্য ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এ ব্যাপারেও পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বহু স্থানে আদেশ-নির্দেশ রয়েছে। যেমন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার পবিত্র কালাম পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
اُذْكُرُوْا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ
অর্থাৎ “তোমাদেরকে যে নিয়ামত দেয়া হয়েছে, তোমরা সে নিয়ামতকে স্মরণ কর।” (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১০৩)
এ পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার প্রদত্ত নিয়ামত স্মরণ করা, নিয়ামতের আলোচনা করা, নিয়ামত প্রাপ্তি উপলক্ষে নিয়ামত প্রাপ্তির দিন ঈদ বা খুশি প্রকাশ করা ফরয সাব্যস্ত হয়। অর্থাৎ নিয়ামত প্রাপ্তি উপলক্ষে নিয়ামত প্রাপ্তির দিনে নিয়ামতকে স্মরণ করে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করা ফরয। আর সে নিয়ামতকে ভুলে যাওয়া বা খুশি প্রকাশ না করা কঠিন শাস্তির কারণ। এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, শাস্তি থেকে বেঁচে থাকাও বান্দা-বান্দী ও উম্মতের জন্য ফরয। এ বিষয়টি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ উনার ১১৪ ও ১১৫ নম্বর পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের মধ্যে আরও স্পষ্টভাবে ইরশাদ মুবারক করেন-
قَالَ عِيْسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّـهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُوْنُ لَنَا عِيْدًا لِّاَوَّلِنَا وَاٰخِرِنَا وَاٰيَةً مِّنكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَاَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِيْنَ ﴿১১৪﴾ قَالَ اللَّـهُ اِنِّـىْ مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ ۖ فَمَنْ يَّكْفُرْ بَعْدُ مِنكُمْ فَاِنِّـىْ اُعَذِّبُهٗ عَذَابًا لَّا اُعَذِّبُهٗ اَحَدًا مِّنَ الْعَالَمِيْنَ ﴿১১৫﴾০
অর্র্থ : “হে আমাদের রব আল্লাহ পাক! আমাদের জন্য আপনি আসমান হতে (বেহেশতী খাদ্যের) খাদ্যসহ একটি খাঞ্চা নাযিল করুন। খাঞ্চা নাযিলের উপলক্ষটি অর্র্থাৎ খাদ্যসহ খাঞ্চাটি যেদিন নাযিল হবে সেদিনটি আমাদের জন্য, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য ঈদ (খুশি) স্বরূপ হবে এবং আপনার পক্ষ হতে একটি নিদর্শন হবে। আমাদেরকে রিযিক দান করুন। নিশ্চয় আপনিই উত্তম রিযিকদাতা। খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতি খাদ্যসহ খাঞ্চা নাযিল করবো। অতঃপর যে ব্যক্তি সে খাদ্যসহ খাঞ্চাকে এবং তা নাযিলের দিনটিকে ঈদ তথা খুশির দিন হিসেবে পালন করবে না বরং অস্বীকার করবে আমি তাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি সারা কায়িনাতের অপর কাউকে দিব না।”
এ পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নিয়ামত প্রাপ্তির দিনটি পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকলের জন্য ঈদ বা খুশির দিন; যা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আয়াত শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত। আরও প্রমাণিত হয় যে, নিয়ামত প্রাপ্তি উপলক্ষে নিয়ামত প্রাপ্তির দিনে যারা ঈদ বা খুশি প্রকাশ করবে না তারা কঠিন আযাব বা শাস্তির সম্মুখীন হবে। অর্থাৎ এ পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারাও খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি নিয়ামত প্রাপ্তি উপলক্ষে নিয়ামত প্রাপ্তির দিনে খুশি প্রকাশ করাকে ফরয করে দিয়েছেন।
এখন কথা হলো- সাধারণভাবে কোন নিয়ামত প্রাপ্তির কারণে নিয়ামত প্রাপ্তির দিন ঈদ বা খুশি করা যদি ফরয হয়, আর হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার উম্মতের জন্য আসমান থেকে খাদ্য বা নিয়ামত নাযিল হওয়ার কারণে সে দিনটি যদি পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকলের জন্য ঈদ বা খুশির দিন হয় এবং সে ঈদকে অস্বীকারকারী বা সে ঈদ না পালনকারী যদি কঠিন আযাব বা শাস্তির উপযুক্ত হয়; তবে যিনি কুল-কায়িনাতের জন্যই সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত অর্থাৎ নিয়ামতে কুবরা আলাল আলামীন তিনি যেদিন যে সময়ে পৃথিবীতে তাশরীফ মুবারক আনলেন সে দিনটি কেন পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকলের জন্য ঈদ বা খুশির দিন হবে না? সেদিন যারা ঈদ বা খুশি প্রকাশ করবে না, তারা কেন কঠিন আযাব বা শাস্তির উপযুক্ত হবে না?
মূলত সেদিন অর্থাৎ সাইয়্যিদুল আ’দাদ ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ইছনাইনিল আযীম শরীফ (সোমবার) শুধু পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকলের জন্যেই নয়; কুল-কায়িনাতের সকলের জন্যেই সবচেয়ে বড় ঈদ অর্থাৎ সাইয়্যিদে ঈদে আ’যম ও সাইয়্যিদে ঈদে আকবার। সেদিন ঈদ পালন করা শুধু জিন-ইনসানের জন্যেই নয় বরং কুল-কায়িনাতের সকলের জন্য অবশ্যই ফরয। সেদিন যারা ঈদ পালন করবে না তারা ফরয তরক করার কারণে, নিয়ামতের না শুকরিয়া বা অবজ্ঞা করার কারণে অবশ্যই কঠিন আযাব বা শাস্তির উপযুক্ত হবে। তাই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা ইউনূস শরীফ উনার ৫৮ নম্বর আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বান্দা-বান্দী ও উম্মতদেরকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে লাভ করার কারণে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করতে সরাসরি নির্দেশ প্রদান করেন। যেমন তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ﴿৫৮﴾০
অর্র্থ : “হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি উম্মাহকে জানিয়ে দিন, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় অনুগ্রহ ও রহমত হিসেবে উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পাঠিয়েছেন, সেজন্য তারা যেন খুশি প্রকাশ করে। এই খুশি প্রকাশ করাটা সবকিছু থেকে উত্তম; যা তারা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে।” (পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৮)
অনুসরণীয় হযরত ইমাম-মুজতাহিদ, মুদাক্কিক্ব ও মুহাক্কিক্ব রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনারা এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত শরীফ উপলক্ষে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করাকে ফরয বলে ফতওয়া দেন।
কেননা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে فَلْيَفْرَحُوْا অর্থাৎ “তারা যেন খুশি প্রকাশ করে” আদেশসূচক বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর আদেশসূচক বাক্য দ্বারা যে ফরয সাব্যস্ত হয় তার উদাহরণ ও দলীল শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে।
কাজেই, প্রত্যেক বান্দা-বান্দী ও উম্মতের জন্যে তো অবশ্যই বরং কুল-কায়িনাতের সকলের জন্যে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা ফরযের অন্তর্ভুক্ত। এটাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণকারীরা বাতিল ও গোমরাহ।

Views All Time
2
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে