পরগাছা ইসরাইল এরব ফিলিস্থিন দখল ও আল কুদস দিবস।


 

১০৯৬ থেকে ১২০২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরপর তিনটি ক্রুসেড ঘোষণা করে। তৃতীয় ক্রুসেডের সময় জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সম্মিলিত বাহিনী জেরুজালেমে হামলা চালায়। কিন্তু গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহমতুল্লাহী আলাইহি উনার  প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এতে খ্রিস্টানদের হতাশা কাটিয়ে উঠতে কয়েকশ’ বছর পার হয়ে যায়। উনিশ শতকের শেষদিকে খ্রিস্টান ও ইহুদী সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের মোকাবেলায় আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হয়। ১৮৮২ সালে রাশিয়ায় ব্যাপক ইহুদী হত্যাকান্ড- ঘটে এরপর থেকে ইহুদীরা সারা দুনিয়া থেকে ইহুদীদের একটি জায়গায় এনে সেখানে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা শুরু করে। তারা বেছে নেয় জেরুজালেমকে।
১৮৯৬ সালে থিউর হারজল নামে এক ইহুদী জিওনজম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করে। তারা তাদের আন্দোলনকে ‘লাভারস আর জিওন’ নামে অভিহিত করে। হিব্রু ভাষা পুনঃ চালু করা এবং সমগ্র দুনিয়ার ইহুদীদের ফিলিস্তিনে যেতে উৎসাহিত করা তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। তারা গোপনে ফিলিস্তিনে জমি কিনতে থাকে। ফিলিস্তিনকে তারা ইসরাইল বলতে শুরু করে। এসব শুরু হয় ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসল নগরীর প্রথম ইহুদী কংগ্রেসে। তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যাসল সম্মেলনের অল্প কিছুদিনের মধ্যে অনেকগুলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান তারা গড়ে তোলে যেমন ইহুদী কংগ্রেস, কার্যনির্বাহী কমিটি, উপদেষ্টা কমিটি, কলোনিগুলোর জন্য ইহুদী ব্যাংক (১৮৯৮), কলোনি সম্বন্ধীয় কমিটি (১৮৯৮) এবং জাতীয় ইহুদী ফান্ড (১৯০১)। এসব প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও কমিটি গঠনের পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনকে কলোনি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা, বহুমুখী কার্যক্রমের সংগঠন ও সমন্বয় সাধন। সেই সঙ্গে জবরদখল হত্যা ও বিতাড়ন অব্যাহত রাখে।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মহাযুদ্ধের যখন সন্ধিক্ষণ, ইংল্যান্ড বিস্ফোরক উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান অ্যাসিটোনের অভাব, তখন কৃত্রিম অ্যাসিটোন তৈরির ভার নিলেন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনিভার্সিটির এক ইহুদী অধ্যাপক ভাইজম্যান। তখন ব্রিটিনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ। প্রফেসরকে বলল সমগ্র ব্রিটেনের ভাগ্য নির্ভর করছে তোমার সফলতা-বিফলতার উপর। আমি চাই তাড়াতাড়ি কাজ তাড়াতাড়ি ফল লাভ।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দিবারাত্রি অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে ইহুদী অধ্যাপক কৃত্রিম অ্যাসিটোন আবিষ্কার করল। সে ব্রিটেনকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করল। প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার দিতে চাইল। ভাইজম্যান সবিনয়ে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু একটি প্রার্থনা করে বলল ‘আমরা স্বজাতির জন্য চাই নির্দিষ্ট একটি দেশ, ইহুদী ন্যাশনাল হোম। এরপর ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথার জেমস ফিলিস্তিনে ইহুদী জনগণের আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা ইতিহাসে বেলফোর ডিক্লারেশন নামে প্রসিদ্ধ।
তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পরাজয় ইহুদীবাদের অগ্রগতির পথকে সুগম করে। তুর্কী সাম্রাজ্যকে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু দেশের জন্ম দেয়া হয়। ইসলামের আন্তর্জাতিকতার আদর্শের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে দাঁড় করানো হয় প্রায় সর্বত্র।
ভোগবাদী রাজন্যবর্গকে এসব কাজে লাগানো হয়। তারা লেবাননে খ্রিস্টান এবং প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাষ্ট্র গড়ে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্যালেস্টাইন অঞ্চলে ম্যান্ডেট পায় ব্রিটেন এবং লেবানন অঞ্চলের ম্যান্ডেট নেয় ফ্রান্স। ১৯৪৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রম্যান ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জেরুজালেমকে একটি আন্তর্জাতিক শহরে পরিণত করার পাশাপাশি একটি ইহুদী ও আরব রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে ডেভিড বেন গুরিয়ন ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তেলআবিবকে রাজধানী করে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণায় মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে আমেরিকা ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়ার স্বীকৃতি এসে যায়। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইহুদী রাষ্ট্র গঠন সংক্রান্ত নীলনকশার পেছনে ব্রিটেন ও আমেরিকাসহ ইউরোপীয় শক্তির মদদ কতটা সক্রিয় ছিল। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন আরব রাষ্ট্রগুলো এই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করলেও তারা সেদিন সঙ্গে সঙ্গে পৃথক ‘প্যালেস্টাইন’ রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দিতে পারেনি।
১৯৬৭ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের ফলে ইসরাইল বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে নেয়। ১৯৭৩ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল দ্বিতীয় যুদ্ধের মাধ্যমেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বায়তুল মুকাদ্দাসের সার্বভৌমত্ব মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা। মুসলমানদের প্রকাশ্য দুশমন ইহুদীরা প্রতি মুহূর্তে আল-কুদসের পবিত্রতা বিনষ্ট করে চলেছে। গত প্রায় ২৫ বছরে কোন বিদেশী মুসলমানের পক্ষে তাদের প্রাণপ্রিয় আল-কুদস গমন ও বায়তুল মুকাদ্দাসে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। ইসরাইলী রক্তপিপাসু নরপশুরা মসজিদুল আকসায় ঢুকে অহরহ মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে।
১৯৬৯ সালে মানবতার দুশমন ইসরাইল পবিত্র আকসায় আগুন ধরিয়ে দেয় ফলে এই পবিত্র ঘর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বিরুদ্ধে সমগ্র মুসলিম দুনিয়া মারমুখো হয়ে ওঠে। মুসলিম নেতারা ওই বছর রাবাতে এক শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয় এবং আল-আকসা মসজিদে অগ্নি সংগোগের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। ঐ শীর্ষ সম্মেলনে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা’র জন্ম হয়। অগ্নিসংযোগ করেই ইসরাইলী দস্যুরা ক্ষান্ত হয়নি। তারা আল-কুদসের তলদেশ খনন শুরু করে। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ইসরাইল আল-কুদসের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে খনন কার্য চালায়। ফলে আল-কুদসের দেয়াল অতিক্রম করে বিশ মিটার এলাকাজুড়ে এক বিরাট গর্তের সৃষ্টি হয়।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে