পারিবারিক অশান্তির কারণ এবং উত্তোরনের কতিপয় দিক-০৭


যৌতুক নেয়া বা দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। মেয়ের থেকে বরপক্ষকে এ হিন্দুয়ানী কু-প্রথা ও হারাম থেকে বের হয়ে আসার সর্বাগ্রে চিন্তা করতে হবে।

 

যৌতুকের পরিচয়:

যৌতুক বাংলা শব্দ। এর প্রতিশব্দ পণ। দু’টোই সংস্কৃত থেকে এসেছে। হিন্দীতে বলে দহীজ (উবযরল) ইংরেজিতে Dowry (ডাওয়ারি)।

ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে-

`Dowry’ : The Property that a wife or a wifes family give to her husband upon marriage. যৌতুক হল বিবাহ উপলক্ষে কন্যা বা কন্যার পরিবারের পক্ষ থেকে বরকে প্রদেয় সম্পদ। (The New Encyclopedia Britannica V. 4, P. 205)

যৌতুকের উৎপত্তি:

যৌতুকের উৎপত্তি প্রাচীন হিন্দুসমাজে , এটি প্রায় স্বীকৃত। যৌতুক প্রথার উৎপত্তি হিসাবে ‘কন্যাদান’ অথবা ‘স্ত্রীদান’ নামক বৈদিক যুগের একটি ধর্মীয় রীতিকে গণ্য করা হয়। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিতে কন্যার কোন অধিকার নেই। বিয়ের পর থেকে কন্যার দায়-দায়িত্ব আর পিতার থাকে না, যা কন্যার স্বামীর উপরে বর্তায়। এজন্য বিয়ের সময় পিতা কন্যাদান রীতির মাধ্যমে কন্যার স্বামীকে খুশী হয়ে কিছু উপহার বা দক্ষিনা দেয় (সামর্থ অনুযায়ী)। আবার পিতার দক্ষিনা ছাড়া কন্যাদান তথা বিবাহ ধর্মীয়ভাবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বৈদিক সময়ের সামর্থ্যানুযায়ী দক্ষিনাই কালাতিক্রমে বর্তমানে বাধ্যতামূলক ও সাধ্যাতিরিক্ত যৌতুকে বিবর্তিত হয়েছে । শুরুর দিকে কন্যাদান উচ্চবর্ণের হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে নিম্নতর বর্ণের হিন্দুরাও তা অনুসরণ করা শুরু করে। প্রসংগত হিন্দু ধর্মে বিয়ে হয় চিরজীবনের জন্য। এজন্য ধর্মীয়ভাবে বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনঃবিবাহের প্রচলন নেই। বিবিসি’র রিপোর্টে দেখা যায় ভারতে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বিধবা মানবেতর জীবনযাপন করে। অনেক গবেষকের মতে যৌতুক প্রথার সাথে এই বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ।

এক গবেষণায় দেখা যায় ১৯৬০ সালে ভারতে যৌতুকের হার ছিল ৯৪% । অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার টিভির ডকুমেন্টারীর তথ্য অনুযায়ী ভারতের ৯৯% পুরুষ বিয়েতে যৌতুক নিয়ে থাকে। বর্তমানে ছেলে পক্ষের বিত্তশালী হওয়ার সহজ মাধ্যম হচ্ছে যৌতুক। এটা রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যা আর শুধু বিয়েতে সীমাবদ্ধ নেই। বাচ্চা গর্ভধারণ, বাচ্চা প্রসব, প্রতিটি পূজা-পার্বনেও যৌতুক দিতে হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের এক কন্যাকে বিয়ে দিতেই পুরো পরিবারকে হতে হয় নিঃস্ব ও সহায়-সম্বলহীন। গবেষণায় দেখা যায়, গড়ে যৌতুকে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ হচ্ছে এক পরিবারের সমস্ত অর্থের ৬৮% অথবা ছয় বছরের বাৎসরিক আয়ের সমান । শিক্ষিত সমাজে উচ্চ হারে যৌতুক নেয়ার প্রবণতা বেশী লক্ষ্য করা যায় ( Dowry Market)। সমাজের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে যৌতুক ক্যালকুলেটর (Dowry Calculator) এর মাধ্যমে।

হিন্দুসমাজের কালক্রমে বরপণে রূপান্তরিত হওয়ার পিছনে যেসব কারণ রয়েছে তা হল :

শ্রেণীবৈষম্য বা কুলিনত্ব:

প্রাচীনকালে অনার্যরা সমাজে মর্যাদা পাওয়ার আশায় আর্যদের নিকট তাদের কন্যা সম্পাদন করত। বিনিময়ে মোটা অংকের সম্পদ দিত। তখন থেকেই যৌতুক প্রথা কালক্রমে একটি সামাজিক রূপ নেয়। (ইসলাম ও যৌতুক, প্রাগুক্ত)

হিন্দুসমাজের এই শ্রেণীবৈষম্য বা কুলিনত্বের কারণে হিন্দুসমাজে আজো যৌতুক প্রথা বেশি। বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মাঝে এর প্রচলন অনেক। উনবিংশ শতাব্দিতে দেখা যায়, উচ্চবর্ণের বাহ্মণরা প্রচুর যৌতুক পাওয়ার আশায় শতাধিক বিবাহ করত। এসব স্ত্রী তাদের পিতৃগৃহেই থাকত। স্বামীরা বছরে একবার দেখা করতে আসত এবং প্রচুর আতিথেয়তা ভোগ করে যাওয়ার সময় অনেক যৌতুক নিয়ে যেত। (বাংলা পিডিয়া ৮/৪৫৫)

শ্রেণীবৈষম্য বা কুলিনত্বে নতুন মাত্রার সংযোজন:

উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও কুলিনত্বের মর্যাদা লাভ করে। তখন হিন্দুসমাজে একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়। তারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ডিগ্রী অর্জন করে। এতে চাকুরির বাজারে তাদের দাম বেড়ে যায় এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তখন কন্যাপক্ষ বিভিন্ন উপহার-উপঢৌকন দিয়ে বরপক্ষকে আকর্ষণের চেষ্টা করত। তাদের উপহারের মান ও পরিমাণের উপর নির্ভর করত পাত্রের পিতা-মাতার সন্তুষ্টি। এককথায় এটি দাবি করে নেওয়ার পর্যায়ে চলে যায়।

আশা ছিল শিক্ষার ফলে কুলিনত্বের ক্ষতিকর দিকগুলো দূরিভূত হবে। কিন্তু তা না হয়ে বরং শ্রেণীবৈষম্য বা কুলিনত্ব আরো শক্তিশালী হয়েছে। (বাংলা পিডিয়া ৮/৪৮৮; ইসলাম ও যৌতুক পৃ. ৮৬, ৫২)

হিন্দুসমাজের উত্তরাধিকার আইন:

একে যৌতুক প্রথার উৎপত্তির একটি মৌলিক কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। হিন্দু-আইনের মিতাক্ষারা ও দায়ভাগ উভয় মতবাদের আলোকেই সাধারণত কন্যা পিতার সম্পত্তি পায় না। বিশেষ করে দায়ভাগ মতবাদ অনুযায়ী সম্পত্তিতে বিবাহিতা কন্যার অংশিদারত্ব  অনিশ্চিত।

হিন্দু আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র, বা বিধবা থাকতে কন্যা পিতার পরিত্যক্ত সম্পদ লাভ করতে পারে না এবং অবিবাহিতা কন্যা বিবাহিতা কন্যার উপর প্রাধান্য পায়। কন্যা কখনো এই সম্পত্তি পেলে তা শুধু ভোগের অধিকার থাকে। তাতে স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। (হিন্দু আইন, পৃ. ৩৫)

হিন্দু আইনে এ সম্পত্তিকে নারীর মূল সম্পত্তি বা স্ত্রীধন বলা হয় না। নারীর স্ত্রীধন বলতে বুঝায়, যাতে তার স্বত্বও প্রতিষ্ঠিত হয় তা হল, পিতামাতা, বন্ধু-বান্ধব ও অন্যান্য আত্মীয়ের দান এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল যৌতুক। (হিন্দু আইন, পৃ. ৫৮-৬৯)

হিন্দুসমাজে নারীরা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দিক থেকে নির্যাতিত। উত্তরাধিকারের বিষয়েও তারা চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছে। বৌদ্ধায়নের শাস্ত্রে লেখা আছে, স্ত্রী লোকেরা বুদ্ধিহীন, তাহাদের কোন বিচারশক্তি নাই, তাহারা উত্তরাধিকার লাভের অযোগ্য। (হিন্দু আইন, পৃ. ৫১)

হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার সূত্রে নারীরা কোন স্ত্রীধন (যে সম্পদে নারীর স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়) পায় না। তাই বিয়ের সময় যৌতুক দেওয়ার নামে তাদের স্ত্রীধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। (হিন্দু আইন, পৃ. ৫৮-৬৯)

এটিই পরবর্তীতে বর্তমান সর্বগ্রাসী যৌতুকের রূপ লাভ করেছে।

আরো লক্ষণীয় হল, হিন্দু আইনে স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবার অংশগ্রহণ প্রায় অনিশ্চিত। কারণ পুত্র, পৌত্র অথবা প্রপৌত্রের মধ্যে কেউ জীবিত থাকলে বিধবা তার স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছুই পায় না। ওরা না থাকলে যদি কখনো পায় তবে তা শুধু ভোগস্বত্ব। এজন্য বিধবার মৃত্যুর পর স্বামী থেকে প্রাপ্ত সম্পদে তার পরবর্তী ওয়ারিসরা উত্তরাধিকার না হয়ে তার মৃত স্বামীর ওয়ারিশরা উত্তরাধিকার হয়। (হিন্দু আইন, পৃ. ৩৪)

বিধবার একমাত্র স্ত্রীধন হচ্ছে বিভিন্ন দান ও বিয়ের সময় প্রাপ্ত যৌতুক। ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বিষয়টি এভাবে বলা হয়েছে।

Another function of a dowry in some societies has been to provide the wife which a means of support in case of her husband’s death. In this latter case the dowry is a substitute for a compulsory share in the succession or the inheritance of the husband’s landed property. (The New Encyclopaedia Britannica, V. : 4, P. : 204)

মোদ্দাকথা হিন্দু সমাজের বিভিন্ন রীতিই বর্তমান ভয়াবহ যৌতুক প্রথার উৎপত্তির মূল কারণ। ১৯ শতক থেকে ২০ শতকের মধ্যে ইউরোপেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। (ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা, প্রাগুক্ত)

বাংলাদেশে কখন কীভাবে যৌতুক প্রথার প্রচলন শুরু হয়

মুসলিম নিয়ম অনুযায়ী পাত্রীকে মোহরানা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে উল্টো পাত্রী পক্ষকে যৌতুক দিতে বাধ্য করা হচ্ছে! ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যৌতুক নামক প্রথা অপরিচিত ছিল। সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৯৪৫-১৯৬০ সালে যৌতুকের হার ছিল ৩%। ১৯৮০ সালে আইনগতভাবে যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তারপর থেকে যৌতুকের হার অনেকাংশে বেড়েছে, যা ২০০৩ সালে ছিল ৭৬% । সাম্প্রতিক  ব্র্যাক ও আমেরিকার পপুলেশন কাউন্সিলের সমীক্ষা অনুযারী বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা ভেদে যৌতুকের হার হচ্ছে ২০% থেকে ৮০% ।

কিন্তু প্রাচীন মুসলিম সামজে যৌতুকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।  ইতিহাসেও পাওয়া যায় না।

ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকায় এর ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বিংশ শতকের শুরুতে হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজকে যখন যৌতুক প্রথা অস্থির করে তুলেছিল তখন মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ নিশ্চিন্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত ছিল। শুধু তাই নয়, মুসলিম সমাজের মেয়েদের কদরও ছিল অনেক বেশি।

দীর্ঘদিন যাবৎ হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজ একত্রে বসবাসের কারণে সাম্প্রতিককালে আরো বিভিন্ন কুপ্রথার মতো এই যৌতুক কুপ্রথাটিও মুসলিম সমাজে সংক্রমিত হয়। (ইসলামের বৈধ ও নৈতিক প্রেক্ষাপট, তমিজুল হক, ব্যরিস্টার এট ল., পৃ. ৫২৮)

বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা প্রচলনের কিছু কারণ:

১. ইসলাম থেকে সরে যাওয়া যৌতুক প্রথা বাংলাদেশে চালু হওয়ার মূল কারণ।

২. দীর্ঘদিন যাবৎ হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজ একত্রে বসবাসের কারণে।

৩.  সমাজ বিজ্ঞানীর মতে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা প্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে ।
৪.  হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী আমাদের দেশে যৌতুক প্রথা প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলিম বিবাহ সংক্রান্ত আইন-কানুন পরিবর্তন (দ্বিতীয় বিবাহে অত্যন্ত কঠোরতা ও বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনত ঝামেলাপূর্ণ) ও বাকীতে মোহরানা (deferred bride price) দেওয়ার প্রবণতাকেও দায়ী করা হয়েছে ।
৫. কন্যার বৈবাহিক জীবনের নিশ্চয়তার লক্ষ্যে ‘সিকিউরিটি মানি’ (Security money) হিসেবে যৌতুক দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অন্যদিকে পাত্ররাও মোহরানা বাকীতে পরিশোধ করতে চায়। এজন্য কন্যার অবিভাবকেরাও বড় অংকের মোহরানা ধার্য করে যা বেশীর ভাগ পাত্রই পরিশোধ করার সমর্থ রাখে না। কিন্তু আইন অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ হলে ঐ মোহরানা আদায় করা হয়। যার ফলে এতে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমবে বলে ধরে নেয়া হয় ।
৬.  যৌতুক গ্রহণে মানুষের লোভ অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে তরুন সমাজের বেশীর ভাগ যৌতুককে খারাপ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে। কিন্তু দূর্মূল্যের বাজারে ফাও (Free, বিনা পরিশ্রমে) পেতে সবারই থাকে প্রচণ্ড আকাংখা ।

যারা যৌতুক নেন না, তারাও কি যৌতুক থেকে মুক্ত?

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারে  যৌতুক প্রথা সাধারণত পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু অন্যভাবে(খুশি নামে) কন্যার পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখা হয়, যেটা যৌতুকের অন্তর্ভূক্ত।

বিয়ের পর অনেক ছেলের চাপে মেয়ের পরিবার নি:স্ব হওয়ার মত অবস্থা হয়। যারা চক্ষুলোজ্জার ভয়ে যৌতুক নেয়নি, তারা বিয়ের পর হাজারো জিনিস চেয়ে বসে মেয়ের পরিবারের কাছে। আর যদি মেয়ের পরিবার না দিতে পারে, তাহলে মেয়ের উপর নির্যাতন শুরু হয়। মাওলানা,মুফতি,ছুফি নামধারীরাও এর থেকে পিছিয়ে নেই। মূলত এরাই এগুলো কাজ বেশি করে।

সলামিক ভাবধারা মতে কন্যার পরিবারকে বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান পালনে নিরুৎসাহি করা হয়েছে। তবে পাত্র পক্ষকে সামর্থানুযায়ী বউভাত (ওলিমা) করতে উৎসাহি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সামাজিক ও বরপক্ষের চাপে কন্যাপক্ষকে রীতিমতো ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়। বর্তমানে বিয়েতে আবার আমদানী করা হয়েছে ভিনদেশী নতুন নতুন অনুষ্ঠান । যার ফলে অনেক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবার মেয়ে বিয়ে দেওয়ার সময় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। অন্যদিকে পাত্রকে সমাজের মুখ রক্ষা করতে গিয়ে সামর্থের অধিক খরচ করতে বাধ্য করা হয়। আর এর প্রভাব পড়ে নব-দম্পতির পারিবারিক জীবনে। অভাব-অনটন দিয়ে শুরু হয় নতুন পরিবারের যাত্রা।

মোহরানা নিয়ে অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার

মুসলিম সমাজে মোহরানা দেয়ার নিয়ম থাকলেও এই প্রথার কারণে কোন প্রকার হত্যা কিংবা নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে না। যেখানে যৌতুক প্রথার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার নারী হত্যার শিকার সহ লক্ষ লক্ষ নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, সেখানে ইসলাম-বিদ্বেষী একটি চক্র যৌতুক প্রথার ভয়াবহতাকে চেপে যেয়ে মুসলিম সমাজে মোহরানার উপর ভিত্তি করে স্ত্রীকে  “স্বামীর যৌনদাসী” হিসেবে প্রচার চালাচ্ছে।

 

যৌতুকের তথ্যচিত্র:

যৌতুকই হচ্ছে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় গৃহ-বিবাদের ২০ থেকে ৫০ ভাগের জন্য দায়ী হচ্ছে যৌতুক । যৌতুকের জন্য নারীরা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও অত্যাচারের শিকার। ২০১০ সালে Bangladesh Society for the Enforcement of Human Rights (BSEHR)’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধুমাত্র যৌতুকের জন্য বলি হয় ২৪৯ জন বিবাহিতা নারীর জীবন। যৌতুকের কারণে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি ঘন্টায় ১২ জন নারীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।  Harvard ও Johns Hopkins বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা যায় প্রতি বছর ভারতে এক লক্ষ নারীকে পুড়িয়ে মারা হয়, যা সরকারী হিসাবের চেয়ে অন্তত ৫/৬ গুণ বেশী। এই গবেষণালব্ধ ফলাফল পপুলেশন রিসার্চের  জার্নাল Lancet-এ প্রকাশিত হয়। ভারতে গত দশ বছরে ১২ মিলিয়ন গর্ভস্থ কন্যাশিশু হত্যার জন্য যৌতুক প্রথাকেই দায়ী করা হয়।

বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা নিরসনে কিছু কার্যকরি বিষয়:

১। যৌতুক রোধে ইসলামী শিক্ষা যথেষ্ট পজিটিভ ভূমিকা রাখে। সমীক্ষায় দেখা গেছে ইসলামে শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের যৌতুকহীন বিবাহ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। ইসলাম ছাড়া অন্যকোনও ভাবে এ হিন্দুয়ানী কু প্রথা রোধ সম্ভব নয়।

২। আমেরিকার পপুলেশন কাউন্সিলের সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে যেসব এলাকাগুলোতে ইসলামী মূল্যবোধ তুলনামূলকভাবে বেশী চর্চা করা হয় সেসব এলাকাগুলোতে  যৌতুকের প্রবণতা কম পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধ যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে কার্যকরী বলে স্পষ্টত প্রতীয়মান। বিভিন্ন সংস্থা (সরকারী এবং এনজিও) যৌতুক প্রথা নিরসনে মূলত নারীর শিক্ষা, প্রগতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা এবং স্বাধীনতা তথা কাথত আধুনিকায়নের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়ে থাকে। সামাজিক মূল্যবোধকে (যেমন মোহরানা) এ ক্ষেত্রে সাধারণত উপেক্ষা করা হয় বা তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না, কেননা আমাদের দেশের যৌতুক বিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রাশ্চাত্যের মডেলকে অনুসরণ করা হয়। মনে রাখা দরকার, এই ভাবধারা বা মডেল অনুযায়ী পশ্চিমা সমাজ যেমন যৌতুক নামক সামাজিক ব্যাধি থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছে, তেমনি অন্য আরো নতুন নতুন সামাজিক অবক্ষয়েরও জন্ম দিয়েছে। নারীরাই মূলত এই অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। আর মেয়েদেরকে গড়ে তোলা হচ্ছে সেক্সুয়াল অবজেক্ট হিসেবে। যেটা যৌতুক থেকে মারাত্বক ক্ষতিকর।

মুসলিম সমাজের ‘একের অধিক বা বহু বিয়ে’ নিয়ে যারা উপহাস-বিদ্রূপ করে থাকে তারাই কিনা অবাধ ও বাছ-বিচারহীন যৌন ক্ষুধা মিটিয়ে থাকে। সেন্টার ফর ডিজীজ কন্ট্রোল (CDC)’র সমীক্ষায় দেখায় যায় আমেরিকার একজন পুরুষ অন্তত কমপক্ষে ৭ জন নারীর সজ্জাসংগী হয়। এদের প্রায় ৩০% রয়েছে ১৫ জনেরও বেশী সজ্জাসঙ্গিনী। ইউরোপে এই হার আরো বেশী। যেমন অস্ট্রিলিয়াতে প্রত্যেকে পুরুষ কমপক্ষে ২৯ জন নারীকে ভোগ করে। আর এই অবাধ মেলামেশাকে ‘প্রাকৃতিক’ বলে অভিহিত করে জাস্টিফাই করা হয় ডারউইনিয়ান বিবর্তনবাদ তত্ত্ব দিয়ে! যা হাস্যকর। আর এসব কারণে লক্ষ লক্ষ গর্ভস্থশিশুকে গর্ভপাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে বিবাহ-বিচ্ছেদের হারও আশংকাজনকভাবে বেশী। অবাধ যৌনাচার ও বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে মিলিয়ন মিলিয়ন শিশু বেড়ে উঠছে এককেন্দ্রিক পরিবারে (Single-parent)। বাবা অথবা মা’র অনুপস্থিতিতে শিশুদের মানসিক বৃদ্ধি যে চরম বাধাগ্রস্ত হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০০৬ সালের জরিপ অনুযায়ী আমেরিকার প্রায় ১৩ মিলিয়ন পরিবার এককেন্দ্রিক বা Single-parent. আমাদের দেশে ইসলামী মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে  সামাজিক মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে যৌতুক প্রথা নিরসন করা হলেও নারীরা যে তাদের প্রাপ্য সন্মান ও অধিকার আদায় করতে পারবে – তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে?

যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আইন:

১৯৮০ সালে বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়। তাতে আছে কেউ যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করিলে অথবা প্রদান বা গ্রহণে সহায়তা করলে সে ৫ বছর পর্যন্ত (এক বছরের কম নয়, আবার ৫ বছরের বেশি নয়) কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়বিধ দন্ডে দন্ডণীয় হবে। (আরো দেখুন : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩  ধারা ১১/(ক); ইসলামী আইনের ভাষ্য, গাজী শামসুর রহমান থেকে সংগৃহিত) ।  যদিও এ আইন যথেষ্ট না। শাস্তি বাড়াতে হবে।

নারী নির্যাতন মূলত যৌতুকের সাথে সম্পর্কিত যা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। যৌতুক সংশ্লিষ্ট বিয়েতে নারীরা বেশী বেশী নির্যাতিত হয়। অন্যদিকে যৌতুকহীন বিয়েতে মেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক সুখী জীবন যাপন করে।

অতএব বরপক্ষ নিজেকে মুসলমান দাবি করলে কাফিরদের এ প্রথা থেকে দুরে থাকবেন। আর মেয়েপক্ষকে আল্লাহপাক উনার প্রতি ভরসা রেখে আরজি করতে হবে। আল্লাহপাক অবশ্যই গায়েবী মদদ করবেন।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. মহানন্দামহানন্দা says:

    ছুফি-দরবেশ-মাওলানা দাবিদার/পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের মধ্যেও অনেকে এত লোভী যে- সুন্দরী নারী আর পয়সা-কড়ি ছাড়া তার দু’চোখে কিছু দেখে না। এমনকি এ লোভী মাওলানাগুলো পয়সা-কড়িওয়ালী অপর সুন্দরী নারী দেখে নিজের স্ত্রীকে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিতে দিধা করে না।

  2. MNURUNNABI says:

    ভাই এই লেখাগুলো ধারা বাহিক ভাবে এক পেজে প্রকাশ করলে অনেক উপকার হতো।

  3. গবেষণাধর্মী পোষ্ট।মারহাবা!মারহাবা!

  4. AroshArosh says:

    vai jan ami kechu likty parini tai but apnar likha amar jonno kub dorkar.plz likbyn.sukria

    • কাঁচাগোল্লাকাঁচাগোল্লা says:

      ভাইজান আপনি একজন সাংবাদিক মানুষ। আমার এ নগন্য লেখা থেকে আপনি বহুত লিখতে পারেন। তারপরও আশা দিচ্ছি আপনাদের সাথে থাকব, ভাল কিছু দিতে না পারলেও আশা রাখতে পারেন খারাপ কিছু দিব না। অনেক শুকরিয়া আপনাকে প্রকৌশলী ভাইজান। Coffee Coffee Coffee

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে