প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশিদের বর্ণনা : মনে হয় সাগরের সব পানি উঠে এসেছে রাস্তায়


সকাল হলে দেখতে পাই, রাস্তায় পানি আর পানি। এর মধ্যে গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে। মনে হয় সাগরের সব পানি উঠে এসেছে রাস্তায়। তখনো চলছে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি।’ বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্যান্ডির ছোবলের এ বর্ণনা দিচ্ছিলেন নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডের হিক্সভিল এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জের মেদিনীমণ্ডল গ্রামের মনি মোজাম্মেল।
টেলিফোনে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, গত রবিবার বিকেল থেকেই শুরু হয় ঝোড়ো হাওয়া। সেই সঙ্গে বৃষ্টি। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে মাত্রা বাড়তে থাকে। সোমবার গভীর রাতে মূল আঘাত হানে স্যান্ডি।
মনি মোজাম্মেল বলেন, ‘এই এলাকায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বেশ কিছু পরিবার বাস করে। এখানকার বাসিন্দাদের কয়েকজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও কোনো বাংলাদেশির হতাহত হওয়ার খবর আমরা পাইনি। রাস্তাগুলো এখনো চার থেকে ছয় ফুট পানির নিচে রয়েছে। বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া বইছে। দোকানপাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ঝড়ের পর বিদ্যুৎ না থাকলেও এখন বিদ্যুৎ আছে।’ মোজাম্মেল বলেন, সপ্তাহখানেক আগে থেকেই ঝড় নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এতে অনেকেই বাজার থেকে ১০ থেকে ২০ দিনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়েছেন। যাঁরা কিনতে পারেননি, গতকাল একটি দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গিয়ে হাজির হন। মুহূর্তেই দোকানের সব পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সারাক্ষণ শুধুই দুর্যোগের খবরাখবর প্রচার করছে। আমেরিকার লোকজন এ ধরনের দুর্যোগ, এমনকি দুই মিনিটের লোডশেডিংয়েও অভ্যস্ত নয়। তাই এ পরিস্থিতিতে সবার মধ্যে ভীতি বিরাজ করছে।
মনি মোজাম্মেলের মতো নিউ ইয়র্কে বসবাসরত সব বাংলাদেশি উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। টেলিফোন যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় তাঁরা পরিচিত অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। বহু কষ্টে গড়ে তোলা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। বাসার সামনের রাস্তায় জমা হওয়া পানি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ায় বাসা থেকে বের হতেও পারছিলেন না। রাস্তায় বিকল গাড়ি এলোপাতাড়ি পড়ে থাকতে দেখেছেন। পানি-বিদ্যুৎবিহীন ভুতুড়ে অবস্থার মধ্যে রাত পার করেছেন।
নিউ ইয়র্কে বসবাসরত কবি কচি রেজা কালের কণ্ঠকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ই-মেইলে লিখেছেন, ‘আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ব্রংস শহরে। হাইল্যান্ডের ওপর। আট তলায় অ্যাপার্টমেন্ট। বিশাল কাচের জানালা দিয়ে বহু দূরের পাহাড়, পাহাড়ের ওপর ঘরবাড়ি-রাস্তা-অবিশ্রান্ত গাড়ি দেখা যায়। সেই অত্যাধুনিক ঘরের জানালা কেঁপে ওঠে বাতাসের ধাক্কায়। তবে জানালা ভাঙেনি। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে ম্যানহাটানের ডাউন টাউন, যেখানে পৃথিবীর সেরা ধনীরা থাকে; সেখানে বিদ্যুৎ নেই। সাবওয়ে টানেলে ফ্লাড। ভার্জিনিয়ায় স্নো পড়ে বন্ধ রাস্তাঘাট।’
ম্যানহাটানে থাকেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আহম্মেদ নবী চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ম্যানহাটানে এখন পানি ও বিদ্যুৎ একাকার হয়ে গেছে। বেশির ভাগ জায়গায় পানি হয়ে পড়েছে বিদ্যুতায়িত। এ কারণে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টেলিফোন যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে। তাই কারো সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছি না। ম্যানহাটানে বহু বাঙালি আছেন, তাঁদের অবস্থা কী_এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া গ্রামের নবী চৌধুরী সপরিবারে প্রায় দেড় যুগ ধরে ম্যানহাটানে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল দুপুরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এসেছি, এখনো বলতে পারছি না, আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কী অবস্থায় আছে।’
নিজের ঘর থেকে দেখা দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে নবী চৌধুরী বলেন, ‘আমার ঘরের সামনে পানি আর পানি। এখানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় পানি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়েছে। আমার ঘরের সামনে যত দূর দেখা যাচ্ছে, সেখানে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছপালা ভাঙা দেখছি। কয়েকটি গাড়িও সড়কে বিকল এবং এলোপাতাড়িভাবে পড়ে থাকতে দেখছি।’
খুলনার বাসিন্দা ও নিউ ইয়র্কের চাকরিজীবী মোহাম্মদ ফায়েজ আহম্মেদ বলেন, ‘অবস্থা খুবই খারাপ। পানি, বিদ্যুৎ ও জেনারেটর কিছুই চালু নেই। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায়ও নেই। ফোন বিকল থাকায় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘এখন ভোর, সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি, তাই বিস্তারিত জানি না।’
প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে দেশে তাদের স্বজনদেরও উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। তাঁরা ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন। বারবার ফোন করেও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা ফারজানা আফরোজ বলেন, ‘আমার বোন ফৌজিয়া আফরোজ ও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান নিউ ইয়র্কে আছেন। এখনো তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। এই নিয়ে চিন্তায় আছি। আশা করছি, তাঁরা ভালো আছেন।’ নিজের ভাই এবং ভাতিজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন মোজাফফর আহমদ চৌধুরী নামের একজন প্রবাসীর ভাই। তিনি বলেন, ‘সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু আমার ভাই, ভাবি ও ভাতিজারা কেমন আছে এখনো জানি না।’

সূত্র : কালের কন্ঠ 31.10.2012

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+