প্রবাসী জীবন


   প্রবাসী জীবন

বিদেশের কথা প্রথম শুনে সব লোকেই হাসে

 আনন্দে চার পা ওপরে তুলে ধেই ধেই নাচে ৷

যাওয়ার সময় বিদায় চেয়ে খুঁজে খুঁজে নেয় ঠিকানা

  বিদেশ গিয়ে টাকা দেবে কোনো অভাব থাকবে না ৷

যাওয়ার কালে অশ্রুজলে মা দেয় মাথা মুছে

দোয়া করো মা, এবার তোমার দুঃখ যাবে ঘুচে ৷

কেঁদো না মা, বিদায় নিয়ে বলবে মাগো আসি

খানিক দূরে পেছন ফিরে চোখ মুছে হাসি ৷

মা কাঁদে ছেলের শোকে বিদেশ চলে যায়

কে জানে কে বেঁচে থাকলে কবে দেখা হয়?

থলে কাঁধে পরান কান্দে সোনার দেশটি ছাড়তে

শখ করে যায় কেউ কেউ, কেউবা না-পারতে ৷

কেউ কেউ ছুটে যায় সোনার হরিণ লালসায়

উড়ে বেড়ানো টাকা নেবে মোটা-মোটা বস্তায় ৷

যাওয়ার পরে একদিনে তার কলিজা যায় উল্টে

আশার বাণী শুধানো মন নিমিষে যায় পাল্টে ৷

কী ভুল করেছি মা, কেন বিদেশ এলাম

জীবন-যৌবন-শখ-আহ্লাদ বন্দীশালায় দিলাম ৷

ফিরে যেতে পারি তবে মান যাবে সব চলে

লাখো টাকা খরচাপাতি ভাসবে বানের জলে ৷

জমিজমা বন্ধক দিয়ে টাকা কামাতে এলাম

সুখের জীবন রেখে কঠিন কষ্ট বেছে নিলাম ৷

জীবনে কভু ধুইনি কাপড়, বাজার করিনি লাজে

এখন সবই করতে হয় যতই লাগুক বাজে ৷

তীব্র উত্তাপ মাথায় নিয়ে করতে হয় কাজ

কোথায় নয়া জামা-কাপড় কোথায় মডার্ন সাজ ৷

জ্বর হয়, সর্দি হয়, লুকিয়ে কাঁদি ভেউ ভেউ

ব্যস্ত সবাই যে যার কাজে খোঁজ লয়না কেউ ৷

এমন দুঃখের প্রবাস জীবন, যদি জানতাম আগে

দেশেই কিছু করে নিতাম যত কষ্টই লাগে।

দেখতে দেখতে বছর যায়, ইনকামপাতি কম

 মাস শেষে বেতন পেয়ে বন্ধ হয় দম ৷

বেতন যে তার নিজেরই হয় না, পাঠাবে কি বাড়ি

কোথায় গেল স্বপ্নপুরী, কোথায় স্বপ্নের গাড়ি ৷

তবুও, কষ্টেশিষ্টে জানটা রেখে জমা করতে হয়

এদিক সেদিন ধার-দেনা করে বাড়িতে পাঠায় ৷

চিন্তা চাপে মাথার ভেতর বাবা-মা কেমন আছে

ভাই-বোনেরা না-খেয়ে হয়তো স্কুলেতে গেছে ৷

সাধ্যমতো চেষ্টা করে, সবাইকে খুশি রাখতে চায়

তারা ভাবে বাছা আমার মোটা বেতন পায় ৷

জমি কেনে, বাগান কেনে, বোনকে বিয়ে দেয়

তার পরও ছোট ভাই তার ব্যবসার টাকা চায় ৷

কষ্ট তার বোঝে না কেউ, স্বপ্নে সবাই বিভোর

টাকার নেশায় ভুলে যায়, আপনকে করে পর ৷

মনের কষ্ট মনে থাকে প্রকাশিবে যাকে

প্রবাসে সবার একই কষ্ট, বলতে যাবে কাকে?

আগের মতো ভাবনা হয় না, মনে ছিল ঢেউ

প্রেম ছিল, প্রেমিকা ছিল, পাশে ছিল কেউ ৷

জীবনে কত স্বপ্ন ছিল কোথায় গেল হায়

বাস্তবের কশাঘাতে সবই ভুলে যায় ৷

তিনটি বছর পার হলেও জমা হয় না টাকা

মাস শেষে বাড়ি পাঠালে পকেট থাকে ফাঁকা ৷

মাথা ধরে চুল ছিঁড়ে তখন বিকল্প চিন্তা করে

কাজের শেষে বাইরে গিয়ে ঘণ্টায় কাজ ধরে ৷

সেখান থেকে আয় হয় বাড়তি কিছু পয়সা

মনের মাঝে খুঁজে পায় ছুটি যাওয়ার ভরসা ৷

কাজ শেষে গোসল করে রাত বারোটা বাজে

 রান্না করে খেয়ে ঘুমায় পাঁচটায় ফের কাজে ৷

পাঁচ বছর পর কষ্টেশিষ্টে পয়সা কিছু জমে

মুখে হাসি ফুটে ওঠে বুকের চাপটা কমে ৷

নতুন করে মনে জাগে পুরোনো সেই স্বপন

আশায় আশায় করে যায় সুখের বীজ বপন ৷

মনে হতেই অজা‌েন্ত সে একা একা হাসে

কখনো বা বদ্ধ ঘরেÿ ধিতাং ধিতাং নাচে ৷

লাফিয়ে ওঠে সামনে ধরে ছোট্ট একখান আয়না

লালটু চেহারা বেগুন-পোড়া চোখ ফেরানো যায় না ৷

তবুও পায় সান্ত্বনা, অন্তত পরীর চোখে অকর্মা নয়

বুক ফুলিয়ে সামনে যাওয়ার প্রবল সাহস খুঁজে পায় ৷

হালাল কর্মে গাল ভাঙলেও চেহারা একদম মন্দ না

শ্রমের রসে সুগন্ধ রয়, ওটা ঘামের গন্ধ না। (ক্রমশ)

(লেখক সৌদি আরবপ্রবাসী)

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে