প্রসঙ্গঃ ‘ভিটামিন-এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ক্যাম্পেইন: আপনার সিদ্ধান্ত কি? প্রাকৃতিক ভিটামিন খাওয়াবেন, নাকি কৃত্রিম ক্যাপসুল খাওয়াবেন?


অনেকেই ফ্রিতে ভিটামিন-এ খাওয়ানোর কথা সন্তানকে নিয়ে দৌড় দেন। দৌড় দেয়ার আগে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন। এরপরও যদি আপনার ভিটামিন-এ ক্যপসুলের ওই ফ্রি ক্যাপসুল সন্তানকে খাওয়াতে মন চায়, তাইলে সেটা আপনার ব্যাপার।
পয়েন্ট-১: আপনার কি জানা আছে- ভিটামিন খাওয়ানোর এই ক্যাম্পেইনটির মূল আয়োজনকারী কারা?
-এর আয়োজনকারী হলো জাতিসংঘের একটি বিশেষ সংস্থা জাতিসংঘ শিশু তহবিল। সংক্ষেপে- ‘ইউনিসেফ’। তারা ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রতিবছর এই ক্যম্পেইন পরিচালনা করে আসছে।
পয়েন্ট-২: প্রতিদিন কতটুকু ভিটামিন এ প্রয়োজন?
-একজন শিশুর জন্য প্রতিদিন ৩০০ (১০০০ আইইউ) থেকে ৫০০ (১৬৬৭ আইইউ) মাইক্রোগ্রাম ও একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৯০০ (৩০০০ আইইউ) মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ প্রয়োজন।
পয়েন্ট-৩: কি কি খাবারে কতটুকু ভিটামিন এ থাকে?
-মাঝারি একটি গাজরে-১০১৯১ আইইউ, এক কাপ কাঁঠালে-৪৯০ আইইউ, লতাপাতা জাতীয় শাকে এক কাপ-২৪৬৪ আইইউ, একটি আলুতে-২১৯০৯ আইইউ, ১০০ গ্রাম কলিজায় ৭৫৩৩৩ আইইউ, এক কাপ দুধে-৩৯৫ আইইউ, পাতাকপিতে (এক কাপ)-১০৩০২ আইইউ, ডালে (এক কাপ)-১৬৮০ আইইউ, কাঁচা টমেটোতে (একটি)-১০২৫ আইইউ, ডিমে (একটি)-৫২০ আইইউ, এক কাপ আমে-১৭৮৫ আইইউ।
পয়েন্ট-৪: অতিরিক্ত ‘ভিটামিন এ’ কি ধরনের অসুবিধা তৈরি করতে পারে?
-বেশি ‘ভিটামিন-এ’ খাওয়ার ফলে দেহের তেল গ্রন্থিগুলো এতো সংকুচিত হয়ে যায় যে, তারা আর চুল ভালো রাখার জন্য তেল উৎপাদন করতে পারে না। ফলে চুল পড়া শুরু করে।
-অন্যান্য ভিটামিন পরিমাণে বেশি হলে শরীর থেকে সহজে বের হয়ে গেলেও ‘ভিটামিন-এ’ দেহে জমা থাকে। অতিরিক্ত ভিটামিন-এ দেহের রক্তের ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, ফলে দেহের দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, তন্দ্রাভাব, পেটের ব্যথা, তৃষ্ণা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধামন্দা, কিডনিতে পাথর সৃষ্টিসহ কিডনি ধ্বংস করতে পারে।
-সম্প্রতি এক গবেষণা তথ্যমতে, অতিরিক্ত ভিটামিন-এ গ্রহণের ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আগের কোনো ক্ষত সম্পর্কে বিস্মৃত হয়। অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ে যাওয়া রোগীদের ভিটামিন-এ পরিহার করতে হবে। পাকস্থলির আলসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ভিটামিন-এ ক্ষতিকর।
-গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ভিটামিন-এ খেলে গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন-এ গ্রহণ করলে দৈহিক বৃদ্ধির উপর প্রভাব পড়ে, বিশেষ করে গোশত পেশি বেশি ঢিলে হয়ে যায়। এছাড়া মাসিক রজঃস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, লোহিত রক্ত কণিকা ধ্বংস হওয়া ইত্যাদি সমস্যা হয়।
পাঠক! নিশ্চয়ই এতগুলো লেখা পড়ে আপনি হয়তো বলবেন- এত কথার কি দরকার, আমরা তো অতিরিক্ত ভিটামিন-এ খাচ্ছি না। দেশে এত এত ডাক্তার থাকতে আপনার এত মাথাব্যথা কেন?
প্লিজ, অধৈর্য হবেন না। আরেকটু কষ্ট করে বাকি লেখাটাও পড়ে যান। মনে রাখবেন- শিখার কোনো শেষ নেই।
ক) আমরা ‘পয়েন্ট-২’তে উল্লিখিত পরিমাণ ভিটামিন-এ এর চাহিদা ‘পয়েন্ট-৩’তে উল্লিখিত খাবারের মাধ্যমেই সহজে পেয়ে যাচ্ছি। কারণ আমাদের দেশের মানুষ সে যত দরিদ্রই হোক না কেন উল্লিখিত খাবারগুলোই তাকে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় খেতে হয়। উল্লিখিত খাবারগুলো আমাদের দেশে খুবই এভেইলেবল। তবে কেউ যদি দীর্ঘদিন থেকে অনাহারে থাকে তার ব্যাপার ভিন্ন। দেখা যাচ্ছে আমরা যদি আমাদের খাবার দাবারের রুটিন ঠিক রাখি তাহলে আমাদেরকে আলাদাভাবে অতিরিক্ত কোন ভিটামিন-এ’ গ্রহণ করার প্রয়োজন হয় না।
খ) এবার আসি মাতৃদুগ্ধ খাওয়া কোলের শিশুদের কথায়। এটা সবাই জানেন- মা যা কিছু খেয়ে থাকেন, মায়ের দুধ খাওয়া শিশুটিও মায়ের উক্ত খাবারের পরিপূর্ণ পুষ্টি দুধের মাধ্যমে পেয়ে যায়। তাহলে এখানেও দেখা যাচ্ছে- মায়ের খাবারের রুটিন ঠিক থাকলে কোলের শিশুকেও আলাদাভাবে অতিরিক্ত কোনো ভিটামিনের ডোজ খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
গ) আমরা যদি এত সহজেই ভিটামিন এ-এর চাহিদা পূরণ করতে পারি- তাহলে কেন আমাদের দেশের ভিটামিন-এ খাওয়ানোর জন্য এত তোড়জোড়, এত আয়োজন। একজন মানুষ বা শিশুর কি ভিটামিন-এ ছাড়া আর কোনো ভিটামিনের প্রয়োজন নেই? থাকলে অন্য ভিটামিনগুলো কেন এভাবে ‘ক্যাম্পেইন’ করে খাওয়ানো হচ্ছে না?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলে- অনেক অনেক প্রসঙ্গ চলে আসবে। তবে সংক্ষেপে বলি- বিগত কয়েক বছর থেকেই ক্যাম্পেইনে বিদেশ থেকে আসা ভিটামিন-এ ক্যাপসুলগুলোর মান, বিশুদ্ধতা ও উৎস নিয়ে অনেকগুলো নেগেটিভ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের অনেক সচেতন দেশগুলোও এ ধরনের ক্যাম্পেইনকে নিজেদের দেশে নিষিদ্ধ করেছে।
পাঠকদের উদ্দেশ্যে আবারো বলি- আমরা বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু অতি সহজে, সুলভে এবং স্বাভাবিকভাবেই ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করি, তাহলে আমাদের উচিত সতর্কতার জন্য হলেও এ ধরনের একটি অপ্রয়োজনীয় ক্যাম্পেইন থেকে নিজেকে ও নিজের শিশুকে দূরে রাখা। একটি কথা আছে ‘সতর্কতার মার নেই’। আপনি যদি এতই ভিটামিন-এ এর প্রয়োজন মনে করেন তাহলে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করুন। এটা তো চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও কথা- সংগৃহীত বা প্যাকেটজাত ভিটামিনের চেয়ে সরাসরি প্রাকৃতিক খাবারের ভিটামিন শরীরের জন্য বেশি উপকারী ও বেশি কার্যকরী।
সবশেষে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে শেষ করবো। আমাদের এই বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ জনগণ মুসলমান। আমাদের যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মাধ্যমে সকল বিধর্মী, অমুসলিম, মূর্তিপূজারী-মুশরিক, নাস্তিক অর্থাৎ সকল বিধর্মীকে মুসলমানদের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাই আমাদের যদি মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি এতটুকু ঈমান থেকে থাকে- তাহলে আমাদের উচিত ওইসব বিধর্মীদের থেকে সতর্ক থাকা, সচেতন থাকা, দূরে থাকা। ‘পয়েন্ট-১’ এ বলাই হয়েছে- ১৪ নভেম্বরের কথিত ভিটামিন এ খাওয়ানোর যে ক্যম্পেইন তার মূল আয়োজনকারী, উদ্যোক্তা, পরিচালক হলো ওইসব কাফিরদের সংঘ ‘জাতিসংঘ’। এমনকি এসব ক্যাম্পেইনে খাওয়ানো এই ক্যাপসুলগুলোও তাদের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতায়, নিজস্ব গবেষণাগারে, নিজস্ব এজেন্ট দিয়ে তৈরি।
পাঠক! এবার আপনিই সিদ্ধান্ত নিন- আপনার সন্তানকে আপনার ঘরের প্রাকৃতিক ‘ভিটামিন’ খাওয়াবেন নাকি বিধর্মীদের তৈরি ‘ভিটামিন’ খাওয়াবেন?

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে