প্রসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ: সুনির্দিষ্ট আইন থাকতে কেন বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে?


১৯৯৬ সালের ২৫ থেকে ২৮ মার্চ মস্কো শহরে ৪ দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচ্য বিষয় ছিল জার্মানির নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। ১৯৬৯ সালে অনুষ্ঠিত উক্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আদৌ কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হয়নি। কারণ তখন জার্মানির মাঝখানে প্রবাহিত রাইন নদী দিয়ে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে এবং তখন সর্বসম্মত যে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে তার সারমর্ম- পশ্চিম জার্মানি সরকারকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে এবং সেটা দ্রুত করা জরুরী এই জন্য যে, দেশের প্রশাসনে যুদ্ধাপরাধীরা খুটা গেঁড়ে আছে। প্রস্তাবটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জার্মানি প্রজাতন্ত্র ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কাজটি শেষ করে ফেলেছে। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, উভয় জার্মানিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে ইতঃপূর্বে আইন প্রণিত হয়েছিল।

বাংলাদেশেও জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ (অ্যাক্ট নং- ১৯/১৯৭৩)’ যথাসময়ে প্রণীত হয়েছে এবং সেটা ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই থেকে আজতক বলবৎ আছে। শুধু তাই-ই নয়, এই আইনটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ দফা দ্বারা সংরক্ষিত আছে এবং ৪৭ক অনুচ্ছেদের ২ দফায় বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে হেফাজতকৃত আইনটি প্রযোজ্য হলে সুপ্রিম কোর্টে কোনো আবেদন করার অধিকার সে ব্যক্তির থাকবে না।

১৯৭৩ সালে উপর্যুক্ত ১৯নং আইনটির ‘ট্রাইব্যুনাল’ উপ-শিরোনামের ৬ ধারায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করার নিয়মগুলো বলা আছে। একজন চেয়ারম্যানসহ অনধিক দুইজন ও সর্বাধিক চারজন সদস্য সমন্বয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে। উল্লেখ্য, সরকার এক কিংবা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্য হওয়ার যোগ্যতা এই যিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য কিংবা যিনি ইতঃপূর্বে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন কিংবা যিনি প্রতিক্ষা বাহিনীর জেনারেল কোর্ট মার্শালের সদস্য হওয়ার যোগ্য। ট্রাইব্যুনালের স্থায়ী আসন ঢাকায় থাকবে; তবে ট্রাইব্যুনাল অন্য যেকোনো স্থান বা স্থানসমূহে তার অধিবেশন অনুষ্ঠিত করতে পারবে। একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন কিংবা তার চেয়ারম্যান কিংবা কোনো সদস্য সম্পর্কীয় বৈধতা বিষয়ে অভিযোগকারী কিংবা অভিযুক্ত কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

১৯৭৩ সালের উপরোক্ত আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে তিনি ৬০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অপিল করতে পারবেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের ১ দফা বলে হাইকোর্ট বিভাগের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির এখতিয়ার আপিল বিভাগের আছে এবং ওই অনুচ্ছেদের ৪ দফা বলে এই অনুচ্ছেদের বিধানসমূহ হাইকোর্ট বিভাগের প্রসঙ্গে যেমন প্রযোজ্য, অন্য কোনো ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও সেগুলো সে রকম প্রযোজ্য হবে।

প্রিয় পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছেন, ১৯৭৩ সালে উপর্যুক্ত আইনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদে বর্ণিত সুপ্রিম কোর্ট কিংবা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত অধস্তন আদালত নয় এবং তার ধরন নিজস্ব এবং সেভাবে তাকে গঠন করা হয়েছে।

১৯৭৩ সালের উপর্যুক্ত আইনের ৩ ধারায় যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা বা তালিকা দেয়া হয়েছে এবং ৮ ধারায় এই অপরাধগুলোর তদন্তের কার্যপদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর আগে ৭ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার এক কিংবা একাধিক ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনালের সমীপে মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেবেন। ফৌজদারি আইনি পরিভাষায় প্রসিকিউটর ইংরেজি শব্দটি বহুল প্রচলিত যার আভিধানিক অর্থ যিনি কোনো ব্যক্তিকে ফৌজদারিতে সোপর্দ করেন। ৮ ধারায় বলা হয়েছে, প্রসিকিউটর একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন। তিনি ঘটনা ও পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত বলে অনুমিত ব্যক্তির মৌখিকভাবে সাক্ষ্য নেবেন এবং সে ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করবেন। অতঃপর আইনটির ৯ ধারা বলে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচারকার্য শুরু হবে প্রসিকিউটর কর্তৃক অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র পেশ করার পর। তার কমপক্ষে তিন সপ্তাহ আগে সাক্ষীদের তালিকা ও তাদের লিপিবদ্ধ সাক্ষ্য এবং দালীলিক সাক্ষ্য যদি থাকে ট্রাইব্যুনালকে দিতে হবে।১৯৭৩ সালের ওই আইনটির ১০ ধারায় বিচার পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রথমে অভিযোগপত্র পাঠ করা হবে এবং অভিযুক্তকে ট্রাইব্যুনাল জিজ্ঞেস করবেন, তিনি দোষ স্বীকার করেন না নির্দোষ দাবি করেন। অভিযুক্ত যদি দোষ স্বীকার করেন, তবে ট্রাইব্যুনাল তা লিপিবদ্ধ করে তার সুবিবেচনায় দণ্ডাদেশ দিতে পারেন, নতুবা প্রসিকিউটর মোকদ্দমার সূচনা বক্তব্য দেবেন। অতঃপর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। সেটা শেষ হলে অভিযোগকারীর পক্ষে ও তারপর অভিযুক্তের পক্ষে বক্তব্য পেশ করা হবে। সবশেষে ট্রাইব্যুনাল রায় দেবন। বিচারকাজ উন্মুক্ত হবে, তবে ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করলে রুদ্ধদ্বারে হতে পারে।

ইংরেজ শাসনকলে ১৮৯৮ সালে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রণীত হয়। অতঃপর এই সুদীর্ঘকাল যাবৎ অনেক সংশোধন করা হয়েছে। ইংরেজদের অধীন অনেক দেশে এই কার্যবিধি জারি করা হয়। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনটিতে নির্দিষ্ট বিচারিক কার্যক্রম উপর্যুক্ত ফৌজদারি কার্যবিধির অনুসরণে প্রণীত হয়েছে এই উদ্দেশ্যে যেন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কাজ ও রায় আন্তর্জাতিক আইন অঙ্গনে প্রশংসিত হয়। খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি গুরুতর অপরাধের বিচার একজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে হয় এবং তার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি হাইকোর্ট বিভাগে দু’জন বিচারপতির সন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ হয়। কিন্তু ন্যায়বিচার অধিকতর দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারপতির সংখ্যা কমপক্ষে তিনজন করা হয়েছে এবং একই উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের যে বেঞ্চ শুনবেন, তার বিচারপতিদের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচজন হবেন। এতদসত্ত্বেও কেন বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে?

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+