প্রসঙ্গ: সুদভিত্তিক চলমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির অসম চিত্র ও বৈষম্য এবং সুদবিহীন ব্যাংকিং পদ্ধতি


ঋণখেলাপীরা নামে-বেনামে কথিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ঋণ নিয়ে তাদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন খাতে খরচ করে বা পাচার করে বলে যে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে, এখন আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব না ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন ব্যাংকেরও কিছু করার থাকে না। অর্থাৎ এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে কিছু ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় লোকসান খেয়ে ভিটা-মাটি পর্যন্ত হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছে।
যাই হোক, ধরি- উক্ত চারজনকে ১০০ টাকা করে ঋণ দিল ব্যাংক। শর্ত হচ্ছে লাভ-লোকাসানের অর্ধেক বহন করবে ব্যাংক। অর্থাৎ লাভ হলে অর্ধেক নিবে ব্যাংক, আবার লোকসান হলেও অর্ধেক বহন করবে ব্যাংক। আসলে ঠিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করা হলে সাধারণত লোকাসান হয় না, লাভই হয়।
চার জনেই উক্ত চারশত টাকা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা শুরু করল। প্রথম উদাহরণের মতই এতে ১ম ব্যক্তি ২০%, ২য় ব্যক্তি ১০%, ৩য় ব্যক্তি ৫% এবং ৪র্থ ব্যক্তি ২% লাভ করল।
সূতরাং ব্যাংকের দেয়া ঋণে ১ম ব্যক্তি লাভ করল ২০ টাকা, ২য় ব্যক্তি ১০ টাকা, ৩য় ব্যক্তি আড়াই টাকা এবং ৪র্থ ব্যক্তি ২ টাকা। এখন ব্যাংককে অর্ধেক লভ্যাংশ দিয়ে দেয়া হল। সূতরাং প্রথম ব্যক্তির লাভ থাকল ১০ টাকা, ২য় ব্যক্তির ৫ টাকা, তৃতীয় ব্যক্তির ৩ টাকা এবং ৪র্থ ব্যক্তির থাকল ১টাকা। এখানে কিন্তু কেউ লোকাসানের সম্মুখীন হয় নি। কম-বেশী সবাই লাভবান হয়েছে। অপরদিকে ৪% হার সুদে যখন উপরোক্ত চারজনকে ঋণ দেয়া হয়েছিল তখন ৪র্থ ব্যক্তির লোকসান হয়েছিল। তখন তৃতীয় ব্যক্তির লাভ হয়েছিল ১ টাকা মাত্র, কিন্তু এখানে তৃতীয় ব্যক্তির লাভ হয়েছে আড়াই টাকা। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে- উপরের দুই ব্যক্তির লাভ কিছুটা কমেছে কিন্তু নিচের দুই ব্যক্তির লাভ বেড়েছে। একজনের লভ্যাংশ এক শতাংশ থেকে বেড়ে আড়াই শতাংশ হয়েছে, এবং অন্যজনের লোকসান তো হয়নি বরং ১% লাভ হয়েছে। মানে সুদবিহীন এই সিস্টেমে সুদভিত্তিক সিস্টেমের তুলনায় আয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকছে এবং কেউ এতে লোকসান খেয়ে রাস্তায়ও বসে যায় নি। অপরপক্ষে সুদভিত্তিক সিস্টেমে আয়ের বৈষম্য ছিল চরমে।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, “পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চলমান সুদভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে চরমভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে।“
উপরে বর্ণিত সুদবিহীন অর্থনীতি উক্ত বৈষম্য দূরিভূত করবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অসমতা কমে সমাজে ইকোনোমিক ব্যালেঞ্চড (অর্থনৈতিক ভারসাম্য) বজায় থাকবে।
যেমন- উপরের উদাহরণটিতে একটু খেয়াল করুন- যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১০ টাকা লাভ করেছে এর অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে অর্থনীতির ভাষায়- সাপ্লাই (যোগান) এর তুলনায় তার পণ্যের ডিমান্ড (চাহিদা) ছিল বেশি। এজন্য ১ম ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন মার্কেটে একচেটিয়া বিজনেস করতে পেরেছে। অপরপক্ষে, যিনি সবচেয়ে কম তথা ১% লাভ করেছেন এরও অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে মূল কারণ হচ্ছে- তার পণ্যের সাপ্লাই (যোগান) এর তুলনায় ডিমান্ড (চাহিদা) ছিল কম। অন্যভাবে বললে- চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই ছিল অনেক বেশি। এজন্য লাভ কম হয়েছে। এটা একটা স্বাভাবিক নিয়ম যে, প্রতিদ্বন্দ্বী বেশি থাকলে সেখানে ব্যবসা করা কষ্টসাধ্য।
ব্যবসার আরেকটা স্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে- যে ব্যবসা অধিক লাভজনক, মানুষ ঐ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে বেশি। এটা একটা কমন ট্রেন্ড। সূতরাং বেশি লাভবান ব্যক্তির পণ্যের চাহিদা বাজারে বেশি থাকায় অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও কিন্তু বাজারে বেশি চাহিদা সম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে থাকবে। এমনকি অন্য ব্যবসায় যারা ১ শতাংশ বা এর চেয়ে কিছু কম বেশি লাভ করেছিল তাদেরও বড় একটা অংশ অধিক লাভজনক ব্যবসার দিকে চলে আসবে। ফলে একসময় বাজারে উক্ত পণ্যের সাপ্লাই চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাবে এবং তখন লাভও কম হবে।
যখন ১ম ব্যক্তির ব্যবসার দিকে অধিকাংশরা ঝুঁকে গেল তখন কিন্তু আবার ৪র্থ ব্যক্তির ব্যবসার মার্কেটে চাহিদার তুলনায় পণ্য সাপ্লাই কমে গেছে। কারণ এখানে ব্যবসা কম হওয়ায় এখানকার অনেক ব্যবসায়ীরা ১ম ব্যক্তির ব্যবসার দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। কাজেই এখন যেহেতু ৪র্থ ব্যক্তির ব্যবসার মার্কেটে প্রতিদ্বন্দ্বীতা কমে গেছে সেহেতু এখানে ব্যবসাও বেড়ে গেছে অর্থাৎ লাভও বেড়েছে। তাহলে একটা বিষয় কিন্তু পরিষ্কার। সেটা কী? সেটা হচ্ছে- এই মুহূর্তে মার্কেটে ১ম ব্যক্তির করা ব্যবসায় লাভ কমে গেছে কিন্তু ৪র্থ ব্যক্তির করা ব্যবসায় লাভ বেড়ে গেছে। এখন আবার অনেক ব্যবসায়ী অধিক লাভজনক ব্যবসা তথা ৪র্থ ব্যবসায়ীর করা ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়বে। এভাবে ব্যবসায়ী, পণ্য এবং মার্কেট একটা সার্কেলের মত ঘুরতে থাকবে। আর সার্কেলের মত ঘুরতে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আয়ের মধ্যে একটা ব্যলেঞ্চ (সমতা) থাকবে। খুব বেশি আয়-বৈষম্য (ইনকাম-ইমব্যালেঞ্চ) হবে না।
সূতরাং সুদবিহীন অর্থ ব্যবস্থায় এভাবে সমাজ থেকে অর্থ-বৈষম্য দূর হয়ে অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইনশাআল্লাহ!
পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য অর্থ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। স্ষ্ঠুু, বৈষম্যহীন এবং একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি জাতি তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকেই যার যার অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু মানুষ ফুলে-ফেঁপে কলা গাছ হয়ে যায়, কিন্তু অন্যরা অর্থাৎ মধ্যবিত্তরা কোনো রকম শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে আর নিম্নবিত্তরা নিঃশেষ হয়ে যায় সেটা আর যাই হোক, গণমানুষের অর্থ ব্যবস্থা নয়। সেটা হতে পারে গুটি কয়েক মানুষের স্বার্থে। এটা সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও নয় বরং শোষণমূলক। এমনই একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে পুঁজিবাদ।
পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব ও পার্থক্য থাকলেও উভয়টিতেই সুদ বিদ্যমান এবং একটি স্থবির এবং অন্যটি শোষণমূলক গতিশীল। সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের সাথে টিকে থাকতে না পারায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। অন্যদিকে পুঁজিবাদ পৃথিবীর সর্বসাধারণকে শোষণ করে চলেছে। আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থার শুরু থেকে আজ অবধী অর্থাৎ গত দুই শত বছরে বৈষম্যহীন কোনো ব্যবস্থাপনা উপরোক্ত কোনো মতবাদই দিতে পারেনি। বরং দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে বৃদ্ধি হয়েছে অর্থনৈতিক সংঘাত ও বৈষম্য। আজ পৃথিবীর একটা শ্রেণী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছে, আরেকটি শ্রেণী দারিদ্রতার শেষ সীমা অতিক্রম করে অনাহারে, অর্ধাহারে, ঋণে জর্জরিত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এটাই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আসল পরিণতি। যতদিন পুঁজিবাদ চলবে ততদিন এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। পুঁজিবাদ কত বেশি অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সেটা নিম্নের প্রতিবেনটি দেখলে কিছুটা বুঝা যাবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে- “বিশ্বের সবচেয়ে গরিব অর্ধেক মানুষের সম্পদের সমপরিমাণ সম্পদ সবচেয়ে ধনী ২৬ জনের হাতে। ওই ২৬ জন ধনীর সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা ৩৮০ কোটি মানুষের সম্পদের সমান।” সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভায় রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়েছিল। রিপোর্টটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যান ইকোনমি ফর দ্য ওয়ান পারসেন্ট’। অক্সফামের রিপোর্ট আরো বলেছে, “পৃথিবীর জনসংখ্যার একাংশের সম্পদ বাকি ৯৯ শতাংশের চেয়েও বেশি।”
সুদকেন্দ্রীক চলমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির অসম চিত্র ও বৈষম্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে প্রতিবেদনটিতে।
পুঁজিবাদ ধনিকে আরো ধনী করে এবং গরিবকে আরো গরীব করে। কিন্তু ধনীরা আরো ধনী এবং গরিবরা আরো গরিব কীভাবে হয়ে যায়, সেটা কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না।
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল অনুষঙ্গ হচ্ছে সুদ। অর্থাৎ এতে যত লেন-দেন হয় সব সুদ ভিত্তিক। সুদকেন্দ্রীক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উপরোক্ত অর্থ-বৈষম্য কীভাবে তৈরি করে, সেটা বুঝতে চলুন সহজ একটা হিসাব কষে দেখি-
মনে করুন- একটা ব্যাংক ৪ জন ব্যক্তিকে ৪% হারে সুদে ১০০ করে টাকা ঋণ দিল। চার জনেই উক্ত চারশত টাকা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা শুরু করল। এতে ১ম ব্যক্তি ২০%, ২য় ব্যক্তি ১০%, ৩য় ব্যক্তি ৫% এবং ৪র্থ ব্যক্তি ২% লাভ করল।
সূতরাং ব্যাংকের দেয়া ঋণে ১ম ব্যক্তি লাভ করল ২০ টাকা, ২য় ব্যক্তি ১০ টাকা, ৩য় ব্যক্তি ৫ টাকা এবং ৪র্থ ব্যক্তি ২ টাকা।
সুদ ৪% হওয়ায় প্রতিজনকে ব্যাংকে দিতে হবে ১০০ টাকায় ৪ টাকা। সূতরাং ১ম ব্যক্তি লাভ করল ২০- ৪ = ১৬ টাকা, ২য় ব্যক্তি ১০- ৪= ৬ টাকা, ৩য় ব্যক্তি ৫- ৪ = ১ টাকা। কিন্তু ৪র্থ ব্যক্তির কোনো লাভ হয়নি, ২ টাকা লোকসান হয়েছে। কারণ তার লাভ হয়েছে ২ টাকা, কিন্তু ব্যাংককে সুদ দিতে হয়েছে ৪% হারে অর্থাৎ ৪ টাকা। কাজেই সে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পথে বসে গেল।
এখানে ব্যাংক কিন্তু কারো রিস্ক নেয়নি, শুধু ঋণ দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেছে। ব্যাংকের প্রধানতম দুটো কাজ হচ্ছে- ঋণ দেয়া ও আমানত সংগ্রহ করা। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক শুধু নির্দিষ্ট কিছু সিকিউরিটি মেইনটেইন করে মাত্র। আর এই সিকিউরিটিটা শুধু ব্যাংক কেন্দ্রীক, ব্যক্তি কেন্দ্রীক নয়। ব্যাংক যে বিষয়টা দেখে সেটা হচ্ছে- ঋণ ফেরত দেবার সক্ষমতা ঋণগ্রহীতার রয়েছে কী না। সেটা হোক বাড়ি-ঘর কিংবা জমী-জমা ইত্যাদি বিক্রী করে হলেও। এজন্য আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে এমন করুণ দৃশ্য দেখা যায় যে, ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ভিটা-মাটি পর্যন্ত হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে অতি ধনীদের কিংবা প্রভাবশালীদের সিকিউরিটি ছাড়াই ঋণ দেয়া হয়। ফলে তারা ঋণখেলাপী সেজে হাজার কোটি টাকা মেরে দেয়। ব্যাংকের চলমান এই নীতি ধনী-গরিবের বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Views All Time
3
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে