ফল-ফসলের পবিত্র যাকাত তথা পবিত্র উশর সম্পর্কিত আলোচনা!


ফসলের পবিত্র যাকাত বা পবিত্র উশর কাকে বলে :
পবিত্র ‘উশর’ শব্দখানা আরবী, যা ‘আশরাতুন’ (দশ) শব্দ হতে এসেছেন। উনার আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থ হচ্ছেন- ‘এক দশমাংশ’। আর সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার পরিভাষায়- যমীন থেকে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য তথা ফল ও ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগ পবিত্র যাকাত হিসেবে আদায় করাকে পবিত্র উশর বলে। আর ২০ ভাগের ১ ভাগ পবিত্র যাকাত হিসেবে আদায় করাকে পবিত্র নিছফু উশর বলে।
ফসলের নিছাব ও উশরের শর্ত এবং পবিত্র উশর সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার দলীল: পবিত্র উশর সম্পর্কে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে একাধিক পবিত্র আয়াত শরীফ বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
أَنفِقُواْ مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِـمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الأَرْضِ.
অর্থ : “তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল সম্পদ হতে এবং যা আমি তোমাদের জন্য যমীন হতে উৎপন্ন করেছি তা হতে দান করো।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৬৭)
তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন- وَآتُواْ حَقَّه يَوْمَ حَصَادِه
অর্থ : “ফসল কাটার সময় তার হক (পবিত্র উশর) আদায় করো।” (পবিত্র সূরা আনআম শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৪১)
কৃষিজাতপণ্য বা ফসলাদি ও ফলফলাদির পবিত্র যাকাত সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দলীল : ধান, গম, যব, খেজুর ও আঙ্গুর প্রভৃতি শস্য ও ফলমূল বিনা সেচে বৃষ্টির পানিতে জন্মিলে- অল্প হউক বা বেশি হোক সেই ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগ পবিত্র যাকাত হিসেবে দিতে হয়। ইহাকে সাধারণতঃ পবিত্র ‘উশর’ বলে। এই সকল ফসল সেচ দ্বারা জন্মিলে উহার نصف العشر বা ২০ ভাগের ১ ভাগ পবিত্র যাকাত হিসেবে দিতে হয়। যেমন- এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
عن حضرت عبد الله بن عمر عليه السلام صلى الله عليه وسلم قال فيما سقت السماء والعيون او كان عشريا العشر وما سقى بالنضح نصف العشر
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, বৃষ্টির পানি, প্রবাহিত ঝর্ণার পানি বা মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা থেকে (কোন সেচ ব্যবস্থা ছাড়া) আপসে আপ যে ফল বা ফসলাদি উৎপাদিত হয়, সে ফল ও ফসলের এক দশমাংশ (১০ ভাগের এক ভাগ বা ১০%) পবিত্র যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে। আর সেচের মাধ্যমে যে ফল বা ফসল উৎপন্ন হয় তা থেকে এক-দশমাংশের অর্ধেক (২০ ভাগের এক ভাগ বা ৫%) পবিত্র যাকাত প্রদান করতে হবে।” (বুখারী শরীফ)
অনুরূপ মধুরও পবিত্র উশর বা পবিত্র যাকাত আদায় করতে হবে।
পবিত্র উশর সম্পর্কে সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার ফতওয়া : সম্মানিত হানাফী মাযহাব উনার ইমাম হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যমীনে উৎপন্ন যাবতীয় ফসলেরই পবিত্র উশর অথবা পবিত্র নিছফু উশর দিতে হবে। চাই দীর্ঘস্থায়ী শস্য যেমন- খেজুর, আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ইত্যাদি ফলফলাদি হোক, চাই ক্ষণস্থায়ী শস্য যেমন- ধান, গম, সরিষা, কলা, পেঁপে, শাক-সবজি ইত্যাদি যেটাই হোক। তিনি আরো বলেন, ফসল কম-বেশি যাই হোক না কেন, তার পবিত্র উশর অবশ্যই আদায় করতেই হবে।
পবিত্র উশর আদায়ের সময় : পবিত্র উশর আদায়ের নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। যতোবারই ফসল উৎপন্ন হবে ততোবারই ফসলের পবিত্র উশর দিতে হবে।
পবিত্র উশর প্রদানকারী : যিনি বা যারা ফসলের মালিক হবেন তিনি বা উনারাই পবিত্র উশর প্রদান করবেন।
পবিত্র উশর ব্যয়ের খাতসমূহ : যে খাতে বা স্থানে পবিত্র যাকাত ব্যয় করা যায়, সে খাত বা স্থানেই পবিত্র উশর ব্যয় করতে হবে।
পবিত্র উশর উনার নিছাব : সম্মানিত হানাফী মাযহাব মতে পবিত্র উশর উনার কোন নিছাব নেই। বিনা পরিশ্রমে যমীন থেকে উৎপাদিত ফসল ও ফল-ফলাদির ১০ ভাগের ১ ভাগ বা তার মূল্য দান করে দিতে হবে। আর পরিশ্রম করে ফসল বা ফল ফলাদি ফলানো হলে তখন ২০ ভাগের ১ ভাগ বা তার মূল্য দান করে দিতে হবে। ধান, চাল, গম ইত্যাদি ব্যতীত ফল-ফলাদির ১০টির ১টি বা ২০টির ১টি দিতে হবে। আর যদি ৫টি হয় তবে একটার অর্ধেক দিতে হবে অথবা সমপরিমাণ মূল্য দিতে হবে।
পবিত্র উশর আদায়ের হুকুম : পবিত্র উশর আদায় করা পবিত্র যাকাত উনার মতই ফরয। কেউ যদি পবিত্র উশর আদায় না করে তাহলে সে ফরয অনাদায়ের গুনাহে গুনাহগার হবে।
কর ও খাজনা প্রদানকৃত যমীনের ফসলে পবিত্র উশর দেয়ার হুকুম : কর ও খাজনা প্রদানকৃত যমীনের ফসলেরও পবিত্র উশর আদায় করতে হবে। কেননা কর ও খাজনা দেয়া হয় সরকারি খাতে জমি সংরক্ষণ, জরিপ ও দেখাশুনা করার জন্য। অনেক জমিতে ফসল না হলেও খাজনা দিতে হয়। আবার পূর্ব যামানায় জমিতে খাজনাও দিতে হতো না। অতএব, কর ও খাজনা প্রদানকৃত যমীনের ফসলেরও পবিত্র উশর আদায় করতে হবে, যা ফরযের অন্তর্ভুক্ত। স্মরণ রাখতে হবে পবিত্র যাকাত হলো ফরয ইবাদত। যা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের কর্তৃক ফরয করা হয়েছে। পবিত্র যাকাত উনার সাথে কর ও খাজনার কোন সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য কর ও খাজনা মানুষ কর্তৃক অর্থাৎ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয়।
পবিত্র উশর আদায়ের উদাহরণ : কারো যমীনে পরিশ্রমের মাধ্যমে ৫০ মণ ধান উৎপন্ন হলো তিনি নিছফু উশর অর্থাৎ বিশ ভাগের ১ ভাগ পবিত্র উশর প্রদান করতে হবে, অর্থাৎ ২.৫ মণ ধান উশর হিসেবে দিতে হবে। আর যদি বিনা পরিশ্রমে উৎপন্ন হয় তাহলে পবিত্র উশর তথা দশ ভাগের একভাগ ধান দিতে হবে, অর্থাৎ ৫ মণ ধান পবিত্র উশর হিসেবে দিতে হবে।
পবিত্র উশর আদায়ের ফযীলত :
পবিত্র যাকাত দিলে যেমন সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং পবিত্র হয়, ঠিক তেমনি পবিত্র উশর আদায় করলেও ফসল, ফল-ফলাদি বৃদ্ধি পাবে ও পবিত্র হবে। সাথে সাথে বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ যেমন- ঝড়-তুফান, বন্যা-খরা, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ইত্যাদি থেকেও ফসল ও ফল-ফলাদি হিফাযত হবে। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা তিনি বলেন-
انفق يا ابن ادم انفق عليك
অর্থ : “হে আদম সন্তান! তুমি আমার রাস্তায় দান অর্থাৎ খরচ করো; আমি তোমাকে দান করবো।” (বুখারী শরীফ)

ফসলের হক্ব আদায় সম্পর্কিত পূর্ববর্তী যুগের ঘটনা :
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে পূর্ববর্তীকালের একটি ঘটনা বর্ণিত রয়েছে, “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, এক ব্যক্তি এক মাঠে অবস্থান করছিলেন এমন সময় তিনি মেঘের মধ্যে এক শব্দ শুনতে পেলেন যে, অমুকের বাগানে পানি বর্ষণ করো। অতঃপর মেঘমালা সেই দিকে ধাবিত হলো এবং সেই বাগানে পানি বর্ষালো। তখন দেখা গেলো, উক্ত বাগানের নালাটি সমস্ত পানি নিজের মধ্যে ভর্তি করে নিলো।
তখন সেই ব্যক্তি মেঘের অনুসরণ করলেন অর্থাৎ মেঘ যেখানে বর্ষিত হয়েছিলো সেখানে তিনি গেলেন এবং গিয়ে দেখলেন যে, এক ব্যক্তি উনার বাগানে দাঁড়িয়ে সেচুনী দ্বারা পানি সেচতেছেন। তখন তিনি উনাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বান্দা! আপনার নাম কী? তিনি বললেন, আমার নাম অমুক- যে নাম তিনি মেঘের মধ্যে শুনেছিলেন সে নাম। তখন এ ব্যক্তি বললেন, হে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বান্দা! আপনি কেন আমাকে আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন? তিনি বললেন, যেই মেঘের এই পানি; সেই মেঘের মধ্যে আমি একটি শব্দ শুনেছি। আপনার নাম নিয়ে বলা হয়েছে যে, অমুকের বাগানে পানি বর্ষণ করো। তিনি আরো জানতে চাইলেন, হে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বান্দা! আপনি বলুন, আপনি ফসলের দ্বারা কী কী কাজ করেন, তিনি উত্তরে বললেন, যখন আপনি জানতে চাইলেন তখন শুনুন, আমার এই জমিতে যা ফলে তা আমি (আমাদের পবিত্র শরীয়ত মুতাবিক) তিন ভাগ করি। এক ভাগ দান করি, এক ভাগ আমি ও আমার পরিবারের খাবারের জন্য রাখি এবং অপর ভাগ ফসল উৎপাদনের জন্য লাগিয়ে থাকি।” (মুসলিম শরীফ, মিশকাতুল মাছাবীহ কিতাবুয যাকাত বাবুল ইনফাক্বা ওয়া কারাহিয়াতিল ইমসাক)
অতএব প্রমাণিত হলো যে, কেউ যদি তার যমীন থেকে উৎপাদিত ফসল ও ফল-ফলাদির যথাযথ পবিত্র যাকাত/হক্ব আদায় করে তথা দান-ছদকা করে তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুদরতীভাবেই তার ফসলের হিফাযত করবেন এবং তার ফসলে বরকত দান করবেন। তার ফসল কখনো নষ্ট হবে না। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র উশর আদায় না করার শাস্তি :
“হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যাকে মহান আল্লাহ পাক সম্পদ বা ফসল দান করেছেন আর সে তার পবিত্র যাকাত বা পবিত্র উশর আদায় করেনি কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো মাথা সাপ স্বরূপ বানানো হবে যার চক্ষুর উপর কিচমিচের দানার মত দুটি কালো বিন্দু থাকবে। কিয়ামতের দিন সাপটাকে তার গলায় বেড়ী স্বরূপ পড়ানো হবে। অতঃপর উক্ত সাপ তার মুখের দু’দিকে কামড় দিতে থাকবে আর বলবে, আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ আমি তোমার সঞ্চিত মাল।” নাউযুবিল্লাহ! (বুখারী শরীফ)
অতএব, প্রত্যেক ব্যক্তিরই উচিত যমীনে উৎপাদিত ফসলের পবিত্র উশর আদায় করে মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মত মুবারক অনুযায়ী মত ও পথ মুবারক অনুযায়ী পথ হয়ে হাক্বীক্বী রিযামন্দি মুবারক হাছিল করা।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে