সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত। ব্লগের উন্নয়নের কাজ চলছে। অতিশীঘ্রই আমরা নতুনভাবে ব্লগকে উপস্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ।

বঙ্গোপসাগর আর মেঘনার ছোবলে দিন দিন ছোট হচ্ছে সন্দ্বীপ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সন্দ্বীপের প্রতি সরকারের আশু নজর দেয়া প্রয়োজন।


“ফোরাতের তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে থাকে তবে আমি হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমাকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে”- এই হলো ইসলামের আদর্শ।

অথচ আমাদের দেশে কেবল রাজধানী আর মহানগরের ক্ষেত্রেই যত দৃষ্টি। রাজধানীতে উড়াল সেতু, বৃত্তাকার নৌপথ, ওয়াটার বাস চালু ইত্যাদি বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাজধানীতে যাত্রাপথ সুন্দর ও নির্বিঘান করার নিরন্তর প্রয়াস নেয়া হচ্ছে।
কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলও যে দেশেরই অংশ সেখানকার লোকজন যে দেশেরই জনগণ; তাদেরও যে সমঅধিকার রয়েছে সে অনুভূতি ও দৃষ্টান্ত স্বাধীনতাউত্তর কোনো সরকারই এ যাবৎ প্রতিভাত করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদ সন্দ্বীপের মানুষের সড়ক যাতায়াতের লালিত স্বপ্ন দীর্ঘ দিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সন্দ্বীপবাসীকে নানা দুর্ভোগ দুর্গতি পোহাতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সাগরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে সন্দীপের মানুষকে যুগ যুগ ধরে দেশের মূল ভূখ-ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে উত্তাল সাগরের সাথে যুদ্ধ করে নৌকা, সাম্পান, লঞ্চ আর স্টিমারে দ্বীপবাসীর যাতায়াতের তিক্ত অভিজ্ঞতা যুগ যুগ ধরে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক বিখ্যাত লোকসহ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে, লাশ পাওয়া যায়নি অনেকেরই। সন্দ্বীপের হতভাগ্য যাত্রীদের নিয়ে ঐতিহাসিক বাদুরা জাহাজ ট্রাজেডি, কুমিরা নৌকাডুবি ট্রাজেডি, বাড়বকু- লঞ্চ ট্রাজেডিসহ অনেক ট্রাজেডি রয়েছে। এই দিবসগুলোতে স্বজন হারানোর বেদনায় বাতাস ভারী হয়ে উঠে।
সাগরের উত্তাল তরঙ্গে ঝুঁকিসহ যাতায়াত থেকে মুক্তি পেতে এখানকার মানুষ হাজার বছর ধরে সড়কপথে যাতায়াতের স্বপ্ন লালন করে আসছে, কিন্তু তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে- বাস্তবে পরিণত হয়নি। মূল ভূখ-ের সাথে যোগাযোগের জন্য এখানে বিআইডব্লিউটিসি ও জেলা পরিষদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি রুটের মাধ্যমে লঞ্চ ও স্টিমারের ব্যবস্থা রয়েছে। দিনের বেলায় ৩টার মধ্যে এসব রুটে যাতায়াত সম্ভব হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় অনেক সময় ৪-৫টার দিকে যাতায়াত সম্ভব হলেও সন্ধ্যার পর কখনো সম্ভব হয় না।
ফলে জরুরী প্রয়োজনে ও চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত দ্বীপবাসীর মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়তে হয়। সময়মতো চিকিৎসার অভাবে করুণ মৃত্যুতে ঝরে যায় অনেক মূল্যবান জীবন। ডেলিভারী রোগীদের নিয়ে দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। অনেক ডেলিভারী রোগীকে স্যালাইন সংযোগ দিয়ে উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দিতে হয়।
অনেক সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে বিশেষ নৌযানের মাধ্যমে চোখ বন্ধ করে যাত্রা করতে হয়। পারাপারের প্রতিটি মুহূর্তই যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। এত দুর্ঘটনা, এত সমস্যার পরও দ্বীপের মানুষের করুণ দুর্দশার কথা চিন্তা করে সড়কপথে যোগাযোগ বাস্তবায়নে কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিগত সরকারের আমলে সন্দ্বীপ কোম্পানিগঞ্জ সড়ক প্রকল্পের আওতায় মূল ভূখ-ের সাথে দ্বীপের মানুষের দ্রুত ও আরামদায়ক সড়ক প্রকল্পের মাধ্যমে যোগাযোগের উদ্যোগ নেয়া হলেও মাঝপথে এসে তা বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে মেঘনার মোহনায় এই দ্বীপ-উপজেলাটির অবস্থান। পঞ্চদশ শতাব্দীর ৬০০ বর্গমাইলের ঐতিহ্যময় এ বিশাল ভূখ-টি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে এখন মাত্র ৬০ বর্গমাইলের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এক সময় ৬২ মৌজার দেশ বলা হতো সন্দ্বীপকে। ছিল ৩১টির মতো চর। এখন সন্দ্বীপ নিজেই একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে পরিণত হয়েছে। ১৪টি ইউনিয়ন প্রতিনিয়ত দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল অংশজুড়ে ভাঙ্গছে। বর্তমানে দ্বীপটির ৫৮ কিলোমিটার জুড়ে বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার ২৯ কিলোমিটারই ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ মানুষ হয়েছে গৃহহারা, সম্পদহারা। বহু ঐতিহ্যের নাম সন্দ্বীপ। এখানে সবই ছিল। এখন অনেক কিছুই নেই। এক সময় পীর-আউলিয়াদের বসতি-খানকা শরীফ ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগী মানুষের পছন্দের তালিকায় ছিল এই দ্বীপটির নাম। বহু খ্যাতিমান জন্ম নিয়েছে এই দ্বীপটিতে। আগে সন্দ্বীপকে ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষায় ক্রসবাঁধ আন্দোলনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সন্দ্বীপের ভাঙ্গন রোধ করা। কিন্তু আদৌ সন্দ্বীপের ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হয়নি। ২০০১ সালের আদমশুমারির হিসাবে ২ লাখ ৯১ হাজার বাসিন্দা থাকলেও এখন তা আড়াই লাখে নেমে এসেছে। তার মধ্যে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি লোক বেড়িবাঁধের উপর মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছে। সরকার আসে সরকার যায়; কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী দ্বীপটিকে নিয়ে ভাবার যেন কেউ নেই।
নদীমাতৃক এই দেশে নদীভাঙ্গন নতুন বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙ্গনও জাতীয় দুর্যোগ হিসেবেই চিহ্নিত। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে ব্যাপকতা ছড়ায়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ১০ হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে থাকে। প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নদীভাঙ্গনের শিকার হয়। দেশের ভূমিহীন ও উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ ভাঙ্গনকবলিত। সন্দেহ নেই গ্রামীণ দারিদ্র্যের একটি বড় কারণও নদীভাঙ্গন। সন্দ্বীপ তারই একটি অংশ। এ অঞ্চলে ক্রসবাঁধের দাবি বহুকালের। কেবলমাত্র ক্রসবাঁধ নির্মাণ করেই সন্দ্বীপের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব।
পাশাপাশি বর্তমানে সন্দ্বীপের উত্তরাংশের একতা বাঁধের প্রান্ত থেকে উরিরচরের দক্ষিণাংশে পাকা সড়কের প্রান্ত পর্যন্ত বেইলী ব্রীজের মাধ্যমে সন্দ্বীপ ও উরিরচরের সংযোগ সম্ভব।
এদিকে উরিরচরের উত্তরাংশে পাকা সড়কটির প্রান্ত থেকে নির্মিত হয়ে আশা কোম্পানিগঞ্জের একটি সড়কে আরেকটি বেইলী ব্রিজের মাধ্যমে সংযোগ সম্ভব। সন্দ্বীপবাসীর দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবে তাই সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। সন্দ্বীপ রক্ষা ও সম্প্রসারণ এবং সন্দ্বীপের সাথে মূল ভূখ-ের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে অতি শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে