বাংলাদেশে ইসলাম ॥ ৬৯ হিজরীতে লালমনিরহাটে নির্মিত হয় মসজিদ


সাধারণভাবে এটা ধরে নেয়া হয় যে, ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকেই এ অঞ্চলে মুসলমানদের বসতি শুরু হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের বহু পূর্বেই কিছু সংখ্যক আরব বণিক চট্রগ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। যদিও কোন কোন ঐতিহাসিক তা স্বীকার করতে নারাজ। কিন্তু বাংলার উপকূলে আরব বণিকদের পরিভ্রমনের তথ্য, সমন্দর, সন্দ্বীপ ইত্যাদি সমুদ্র বন্দরগুলোর সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাস বারথেসা ও বারবোসার বর্ণিত মতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে মেঘলর মোহনায় বহু আরব, ইরানী ও আবিসিনীয় মুসলমানের ব্যপ্তি, সর্বপোরি চট্রগ্রাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়াবে বার্ণ ভিল্লীর চট্রগ্রাম নামটি আরবদের থেকে উৎপত্তি হয়েছে।

এ কথার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, চট্রগ্রামের সাথে আরবদের সম্পর্ক বহুদিনের এবং তা ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর আগমনের বহু পূর্ব থেকেই চলে আসছে। তবে কেবল চট্রগ্রামই নয়, বখতিয়ারের পূর্বে বাংলায় অন্যান্য স্থানেও মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। বাগদাদের বিখ্যাত খলিফা হারুন অর-রশীদের আমলের একটি মুদ্রা (১৭৬ হিজরী/৭৮৮ খ্রীষ্টাব্দ) রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসস্তুপের মাঝে পাওয়া গিয়েছে, কুমিল্লার কাছে ময়নামতির ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও কিছু আরবীয় মুদ্রা আবিস্কৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের বক্তব্য হচ্ছে, আরব ধর্ম প্রচারকগণ খ্রীষ্টীয় অষ্টম বা নবম শতকে তা আনয়ন করেছেন। কাজেই এ থেকে অনুমিত হয় যে, বাংলার বিভিন্ন স্থানে আরব বণিক বা ধর্ম প্রচারকদের পদধূলি পড়েছিল। যার কিছুটা আবিস্কৃত হয়েছে, কিছুটা হয়তবা অনাবিস্কৃত রয়ে গেছে, আর কিছু নিদর্শন ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্নও হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক নিদর্শন বা উৎস বিশেষ করে ভারতবর্ষে মুসলিম অবস্থানের মূল ঐতিহাসিক উৎসের ব্যাপারে বলা হয় যে, এর সংখ্যা হলো পাঁচটি যথা (১) মুদ্রা বা শিলালিপি (২) স্মৃতিসৌধ, অট্টালিকা বা মসজিদ (৩) ঐতিহাসিক সাহিত্য (৪) রাজকীয় দলিলপত্র (৫) বিদেশী পর্যটকদের বিবরণ। এগুলোর প্রত্যেকটিই যথাযথভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মুদ্রা বা শিলালিপি এবং অট্টলিকা বা মসজিদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তাতে চাক্ষুষ বিবরণ পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিকদের খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ৬৩৬-৩৭ খ্রীষ্টাব্দে খলিফাতুল মুসলেমীন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর শাসনামলে সর্বপ্রথম ওমান হতে ভারতের কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৌ-অভিযান প্রেরিত হয়েছিল। এরপর ৬৪৩-৪৪ খ্রীষ্টাব্দে তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর শাসনামলে হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নেতৃত্বে অভিযান প্রেরিত হয় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে উভয় অভিযানই কতটুকু সম্প্রসারিত হয়েছিল? বিশেষ করে তা বাংলা পর্যন্ত ঠেকেছিল কিনা তার বর্ণনা সহজলভ্য নয়।

আল্লাহ্ পাক-এর বেশুমার শোকরিয়া আদায় করতে হয়, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাট জেলার বড়বাড়ীতে রামদাস মৌজার মসতার পাড় নামক স্থানে এক অভূতপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গিছে, যা ৬৯ হিজরীতে নির্মিত একটি মসজিদ।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, উক্ত মসতার পাড় স্থানটি বহু বৎসর ধরে ৭/৮টি উঁচু মাটির টিলা ও জঙ্গল দ্বারা আবৃত ছিল। এ জঙ্গলের নাম মজদের আড়া। স্থানীয় ভাষায় আড়া শব্দের অর্থ জঙ্গলময় স্থান। কেউ হিংস্র জীব-জন্তু, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদির ভয়ে ভেতরে প্রবেশ করতো না।

জমির মালিক তা সমতল ও আবাদযোগ্য করার জন্য উঁচু স্থানটি খননে নিয়োজিত হন।

জঙ্গল পরিস্কার করতে যেয়ে বেরিয়ে আসে প্রাচীন কালের তৈরী ইট যার মধ্যে ফুল অংকিত। এমনিভাবে মাটি ও ইট সরাতে গিয়ে একটি পূর্ন মসজিদের ভিত বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে ৬’’× ৬’’× ২’’ সাইজের একটি শিলালিপি পাওয়া যায় যার মধ্যে ষ্পষ্টাক্ষারে আরবীতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ, হিজরী সন ৬৯।

পরে আরো খননের পর মসজিদের মেহরাব এবং মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ্ মাঠ ও ইমাম সাহেব সে স্থানে খুৎবা পাঠ করতেন, তাও আবিস্কৃত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সনে এ আবিষ্কার সাধিত হয় এবং তখন থেকেই উক্ত স্থানে টিন দ্বারা একটি সাধারণ ছোটখাট মসজিদ করে এলাকার লোকজন নামায পড়ে আসছেন। তারা উক্ত মসজিদের নাম দিয়েছেন হারানো মসজিদ। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, কারা এ মসজিদ তৈরী করলেন? এর জবাবে অন্ততঃ এটুকু বলা যায় যে, তারা নিশ্চয় মুসলমান এবং সঙ্গত কারণেই বলতে হয় আরব থেকে আগত মুসলমান -যাঁরা ৬৯ হিজরীতে এ এলাকায় বসবাস করেছিলেন এবং নিজেদের ধর্মীয় প্রয়োজনে মসজিদও তৈরী করেছেন। উপস্থিত এ নিদর্শন ইতিহাস বা ঐতিহাসিকের জন্য কতটুকু গুরুত্ব বহন করে? এর উত্তরে বলতে হয় তা আরবদের সিন্ধু বিজয়সহ, পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম ঐতিহ্য বিশেষতঃ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কেননা এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে, কেবলমাত্র বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলেই প্রাচীনকালে আরবদের আগমন ঘটে এবং তা খুব বেশী অতীত হলে খ্রীষ্টীয় অষ্টম বা নবম শতক থেকে। কিন্তু লালমনিরহাটে আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরীর হারানো মসজিদ তার জ্বাজল্যমান প্রমাণ নিয়ে সে ধারণাকে তিরষ্কার করছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য একটি কথা বলার অপেক্ষা রাখে। তা হলো- কালের দিক দিয়ে তাতে আশ্চার্যান্বিত হলেও অত্যাশ্চর্যের কিছুই নেই। কেননা অষ্টম হিজরীতে ক্যান্টন থেকে চীনের রাজা তাইশাং হযরত আবু কাবশা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মারফত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ইসলামের আলো নিয়ে এসেছিলেন। গুজরাটের দরাদরের রাজা বোজের কাছে হযরত ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ এসেছিলেন। ক্যারোলার রাজা চেরুমল পেরুমলও ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই সেদিক থেকে বিচার করলে ৬৯ হিজরীতে বাংলাদেশে মসজিদ নির্মিত হওয়া বিচিত্র কিছুই নয়। তবে অবশ্যই তা বিরাট গৌরবের বিষয় এবং আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের নিদর্শন।

হিজরী ৬৯ সন লেখা। বর্তমানে এটি রংপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

ফলকের পাশে ফুলের নকশা।

এখানে ছিল মসজিদের দেয়াল

মসজিদের ইট সমুহ

মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠের দেয়াল।

মসজিদের মিম্বর

পথ নিদের্শক সাইনবোর্ড

বি:দ্র: ছবিগুলো প্রজন্ম  ফোরাম থেকে নেয়া

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+