বাংলার বুকে নতুন ইসরাইল সৃষ্টির পাঁয়তারা। আলাদা জুম্মল্যান্ড বানানোর গভীর ষড়যন্ত্র। তৈরি করছে আলাদা মানচিত্র ও নিজস্ব মুদ্রা।


পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ব্রিটিশ হিল ম্যানুয়েল এ্যাক্ট-১৯০০ কিংবা উপজাতিদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের ধুয়া তুলে কতিপয় রামপন্থী ও বামপন্থী নেতা এবং তাদের বিদেশী ত্রাতারা আবারো পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে নতুনভাবে তাঁতিয়ে তুলছে। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের এক দশমাংশ হিসেবে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দীর্ঘ ২৭৩ দিন যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের একাংশ হিসেবে মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। কিন্তু ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ওই অংশে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরও রহস্যজনকভাবে আজো পাহাড়ে শান্তি নেই। আজো পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি ভাই-বোনেরা শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। আজো পাহাড়ে বন্দুকযুদ্ধ চলছে, পাহাড়ের প্রতিটি বাঙালিকে অস্ত্রধারী উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে চাঁদা দিয়ে চলতে হচ্ছে।
বেশ কিছুদিন আগে ১৯৮০ জন উপজাতীয় সন্ত্রাসী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করেছিলো। কিন্তু আত্মসমর্পণের পরও উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ দেশী-বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং বর্তমানে তাদের রয়েছে একটি সশস্ত্র সংগঠিত সন্ত্রাসী বাহিনী।
দুঃখজনক হলো- দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও লেখনীয় মাধ্যমে কখনোই পাহাড়ের প্রকৃত সমস্যাকে তুলে ধরে না। বিভিন্ন সভা সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বলা হচ্ছে; কিন্তু বাঙালিদের উপর উপজাতি সন্ত্রাসীদের যুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো সময় বলা হচ্ছে না। টিআইবি’র কর্মকর্তা ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলো, ‘শান্তিচুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়ন করলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসবে।’ তার এই বক্তব্যে সুর মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামালও বললো, ‘উপজাতীয় নেতা সন্তু, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের হাতে পাহাড়ের যাবতীয় বিষয়াদি ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যা মিটে যাবে।’ যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
কারণ তারা বেআইনী অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য একটি কথাও তারা বলেনি। একই সুরে কথা বলছে ইয়াসমীন হক, স্বপন আদনান, মেঘনাগুহ, গৌতম দেওয়ান, জুয়েল দেওয়ানসহ দেশদ্রোহী অন্যান্য দালালরা। তাদের মুখ থেকে এ কথাটি একবারও কেন আসছে না যে- ‘পাহাড়ের ৫০৯৩ বর্গমাইল ভূমির নাম বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের কোনো অংশেরই ভূমিতে বসবাসের অধিকার কেবল ওই এলাকার উপজাতীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা হতে পারে না। ব্রিটিশরা তাদের শাসনের সুবিধা ও খাজনা আদায়ের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে তিনজন উপজাতীয় নেতাকে সার্কেল চীফ বানিয়ে খাজনা আদায় করতো। সেসব সার্কেল চীফরাই স্থানীয়ভাবে অশিক্ষিত লোকদের কাছে নিজেদেরকে ‘রাজা’ বানিয়ে (চাকমা রাজা, বোমাং রাজা, মং রাজা) হেডম্যান, কারবারী, খীসা, লারমা পদবী সৃষ্টি করে; যারা মূলত খাজনা আদায়ের কাজে নিযুক্ত ছিলো। প্রকৃতপক্ষে পাহাড়ের হেডম্যান, কারবারী, পাড়াপ্রধান, সার্কেল চীফ বা রাজা বলে যাদেরকে ভূমির মালিক সাজানো হচ্ছে; তারা আদৌ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিক নয়, তারা খাজনা আদায়কারী সরকারি প্রতিনিধি অর্থাৎ আর্দালী বা কেরানী মাত্র।
পাকিস্তান বা ব্রিটিশ আমলের অজুহাত দেখিয়ে উপজাতীয় নেতারা যা বলছে, তা মেনে নিলে আমাদের ১৯৪৭ সালের পাক-ভারত বিভক্তি এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবমাননা করা হবে। বিভিন্ন রকম ছলাকলা ও যুক্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে বিগত কয়েক বছর যাবৎ উপজাতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী নেতারা তথাকথিত ‘জুম্মল্যান্ড’ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। তারা এখন বলছে, তারাই পাহাড়ের ‘আদিবাসী’ জুম্মজাতি। তাদের সংবাদপত্র (মুখপত্র) জুম্ম নিউজ বুলেটিন, জুম্মকণ্ঠ, তাদের নতুন রাষ্ট্রের নাম ‘জুম্মল্যান্ড’ তাদের সেনাবাহিনীর নাম হবে জুম্ম লিবারেশন আর্মি। অন্যদিকে পাহাড়ে সুদীর্ঘকাল যাবৎ বসবাসরত বাঙালিদেরকে তারা বলছে, মুসলিম অনুপ্রবেশকারী, সেটেলার, রিফিউজী কিংবা মোগদা বাঙাল নামে। তাদের লেখনীতে আমাদের যেসব বীর সৈনিকেরা পাহাড়ের সন্ত্রাস-যুদ্ধ মোকাবিলা করে জীবন দিচ্ছে ও জনগণের নিরাপত্তা দিচ্ছে, তারা হলো- ‘দখলদার, বাংলাদেশী সামরিক জান্তা, জলপাই স্বৈরাচার।’ ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ো, জুম্মল্যান্ড কায়েম করো; কাটো কাটো বাঙালি কাটো’ বলেও শ্লোগান দিচ্ছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। অথচ সরকার এসব জেনেও রহস্যজনকভাবে নীরব। ভাবলেশহীন।
উপজাতীয় কোনো ব্যক্তি সে ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মিজোরাম, আসাম কিংবা যেখান থেকেই আসুক না কেন, তার জন্য পাহাড়ের মাটি উন্মুক্ত। তার কোনো দলিলপত্র, খাজনা-ট্যাক্স না দিলেও সে প্রথাগত ভূমি অধিকারের বলে পাহাড়ের মাটিতে তার সার্বভৌম দখল থাকবে। সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো উপজাতীয় নেতারা জাতিসংঘ, আইএলও’সহ আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদেরকে পূর্বপুরুষের দেয়া পরিচিতি তথা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, পাংখু, লুসাই, তনচঙ্গা ইত্যাদি ঐতিহ্যগত বংশ পরিচয় না দিয়ে ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজনাস’ পিপল হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে জোর অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এজন্য অতীব কৌশলের সাথে তারা চাকমা সার্কেল চীফ রাজাকারপুত্র দেবাশীষকে জাতিসংঘের ‘আদিবাসী’ বিষয়ক কমিটির সদস্য বানাতেও সক্ষম হয়েছে। গারো নেতা সঞ্জীব দ্রংকে ঘন ঘন তারা বিদেশে পাঠায় এই কাজের জন্য। অথচ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান বা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মতো হাজার বছর আগের অধিবাসী নয় বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রা। তারা তিব্বত, আরাকান, মিয়ানমার, (বার্মা), চীন প্রভৃতি থেকে পানিদস্যু ও সরকারের তাড়া খেয়ে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে আগমন করে ও বসতি স্থাপন করে। ফলে বাংলাদেশে তারা প্রকৃতপক্ষে আশ্রিত বা অভিবাসী জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ‘আদিবাসী’র সংজ্ঞায় তারা পড়ে না। কিন্তু ছলে-বলে-কৌশলে নিজেদের আদি পরিচয় চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা ইত্যাদি বাদ দিয়ে কোনোভাবে জাতিসংঘ থেকে তারা ‘আদিবাসী’ পরিচিতি আদায় করে বাংলাদেশের সংবিধানে তা সংযোজন করে নিতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তারা জানে একবার যদি তারা নিজেদেরকে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকৃতি নিতে পারে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করতে তাদের আর কোনো আন্দোলন সংগ্রাম বা যুদ্ধ করতে হবে না। জাতিসংঘের ‘আদিবাসী বিষয়ক সনদ’ মোতাবেক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাংলাদেশ সরকারকে হাত গুটাতে হবে। জুম্মল্যান্ড স্বপ্ন সফল হবে। পূর্ব-তিমুর ও দক্ষিণ সুদানেও তাই ঘটেছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী উপজাতি সন্ত্রাসীদের বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন, আবার কোনো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে এতদাঞ্চলের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং যেকোনো সময়ের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আরো বেশি বিস্ফোরণেœামুখ হয়ে উঠবে। উপজাতি সন্ত্রাসীরা যদি মনে করে, বাঙালিদের অত্যাচার নির্যাতন করে সকলের নজর ঘুরিয়ে ফায়দা হাসিল করবে, তাহলে তা হবে নিদারুন ভুল। তাদের মনে থাকা উচিত- ১৯০ বৎসর ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে মধ্য আগস্টে ব্রিটেন এদেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
অতএব, সরকারের উচিত হবে- এসব রাজাকার, দেশ ও জাতির শত্রু, নৃ-তাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, মিশনারী এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে তিন পার্বত্য অঞ্চলকে রক্ষার নিমিত্তে অনতিবিলম্বে উপজাতিদের বিভিন্ন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া। অর্থাৎ তাদেরকে কোনো অবস্থাতেই পার্বত্য অঞ্চলে সংঘবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ না দেয়া এবং বাঙালিদের উপর নির্যাতন চালানোর পথ রুদ্ধ করা। পাশাপাশি ঐ অঞ্চলের স্থানীয় বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপকভাবে সুযোগ করে দেয়া এবং বাঙালিদের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে