বাঙালি মুসলমানরা কেন পাকিস্তানকে হারাতে পেরেছিল?


পাঞ্জাবী মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মূল স্তম্ভ ও সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যান্য যেসব জাতি, যেমন শিখ, রাজপুত, মারাঠা এরা ছিল পাঞ্জাবী ও পাঠানদের তুলনায় সামরিক বিচারে নিম্নশ্রেণীর। যে কারণে দেশবিভাগের সময়ে পাকিস্তানের ভাগে ভারতের তুলনায় কম জায়গা পড়লেও সামরিক শক্তির দিক দিয়ে পাকিস্তান ভারতের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

এখন বিষয়টি হলো, ব্রিটিশরা কিন্তু ১৮৫৭’র সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে বাঙালি মুসলমানদের মধ্য থেকে কোনো সেনাসদস্যই গ্রহণ করতো না। ব্রিটিশরা দুটি টার্ম ব্যবহার করত ‘মার্শাল রেস’ ও ‘নন-মার্শাল রেস’ নামে। বাঙালি মুসলমানদেরকে ব্রিটিশরা বলতো ‘নন-মার্শাল রেস’ তথা অ-সামরিক জাতি।

এখন ব্রিটিশদের কথিত ‘নন মার্শাল রেস’ হয়েও বাঙালি মুসলমানরা কেন পাঞ্জাবীদের হারিয়ে দিলো? কারণটি খুঁজে পাওয়া যাবে উইলিয়াম হান্টারের লেখা ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ বইতে। সে উল্লেখ করেছে –

“সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করা কোনও মুসলমান আমাদের কোনও রেজিমেন্টে ঢুকতে পারেন না এবং কখনও ঢুকতে পারলেও তা থেকে আর ধনার্জন সম্ভব নয়।……সুতরাং মুসলমানদের বিত্ত অর্জনের প্রথম দুটি উৎস, অর্থাৎ সেনাবাহিনী ও রাজস্ব-প্রশাসনের উঁচু পদÑএদের বিষয়ে আমরা যা করেছিলাম তা করার সঙ্গত কারণ ছিল, কিন্তু আমাদের কাজের ফলে বাংলার সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারগুলি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। আমরা বাংলার মুসলমান অভিজাত শ্রেণীর জন্য সামরিক বাহিনীর দরজা বন্ধ করে দিয়েছি, কারণ আমরা বিশ্বাস করতাম যে- আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য তাদের বাদ দেয়া প্রয়োজন।” (সূত্র: দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, পৃষ্ঠা ১১১-১১৫)

ব্রিটিশরা তাদের কথিত ‘মার্শাল রেস’ ও ‘নন-মার্শাল রেস’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতো তাদের প্রতি আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে। উইলিয়াম হান্টারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাঙালি মুসলমানদেরকে ব্রিটিশরা ‘নন-মার্শাল রেস’ তকমা দিয়ে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত করেছিল এই কারণে নয় যে, বাঙালি মুসলমানরা যুদ্ধ করতে জানে না। বরং তা করা হয়েছিল এই কারণে যে, বাঙালি মুসলমান তার যুদ্ধটি করেছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে।

ত্রয়োদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলা থেকে ২ হাজার মাইল দূরের সীমান্ত প্রদেশে ব্রিটিশবিরোধী মুজাহিদ শিবির গঠিত হয়েছিল। বাঙালি মুসলমানগণ ১৮২০ ঈসায়ী থেকে ১৮৭০ ঈসায়ী পর্যন্ত টানা পঞ্চাশ বছর এই ব্রিটিশ বিরোধী সেনা ছাউনিতে অর্থ ও জনবল প্রেরণ করেছিলেন। তাছাড়া ১৮৫৭’র সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহের মাধ্যমে। একারণে ব্রিটিশরা বাঙালি মুসলমানগণ উনাদেরকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করতো।

বিপরীতে পাঞ্জাবীরা ছিল ব্রিটিশ-অনুগত, যে কারণে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। এই পাঞ্জাবীরা তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের কথিত এই ‘নন-মার্শাল রেস’ টার্মটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত এবং বাঙালি মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো। ৭১’এ পাকিস্তানীরা যুদ্ধ করেছিল দাম্ভিকতার বশে, তারা মনে করেছিল এই ‘নন-মার্শাল রেস’ পাঞ্জাবী ও পাঠানদের সামনে টিকতে পারবে না।

মুজাদ্দিদে আ’যম, সাইয়্যিদুনা মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি উনার একখানা ক্বওল শরীফ উনার মধ্যে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ মুবারক করেছিলেন, “পাকিস্তানীরা বলেছিল, তারা ১০০ বছর বাংলাদেশকে তাদের কব্জায় রাখবে। কিন্তু তারা ৯ মাসই টিকে থাকতে পারেনি।”

টানা ৫০ বছর যেই জাতি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, সেই জাতি ৯ মাস যুদ্ধ করে ব্রিটিশ অনুগত পাঞ্জাবীদের হারিয়ে দেবে এটাই স্বাভাবিক। এখন বিষয়টি হলো, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এই ৫০ বছরের যুদ্ধটি কিন্তু করেছিলেন মুসলমান হিসেবে, ওলীআল্লাহগণ উনাদের মুরীদ হিসেবে।

যোদ্ধা হিসেবে বাঙালি মুসলমানদের যে অস্তিত্ব, তা নিহিত রয়েছে ওলীআল্লাহগণ উনাদের সিলসিলার মধ্যে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে বাঙালি মুসলমানদের উপলব্ধি করতে হবে, কারণ এখানেই বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও শেকড় নিহিত রয়েছে।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে