বাঙালি মুসলিম জাতির আজ ৪৫তম বিজয় বার্ষিকী ॥ * সব যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের ফাঁসি কার্যকর ও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জোরদার দাবি সর্বমহলে * হানাদার ভারতীয় ‘র’-এর দালাল সাংবাদিক ও মিডিয়া বর্জনের ডাক সর্বত্র


আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয়ের ৪৫তম বার্ষিকী। ৪৫ বছর আগে এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এদেশের বাঙালি মুসলমানদেরকে এনে দিয়েছিলো আত্মপরিচয়ের স্বাধীন ঠিকানা। আজ স্বাধীনতা বিজয়ের নির্মল আনন্দ প্রকাশের দিন, স্বাধীন আবাস ভূমি পওয়ায় মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি শুকরিয়া প্রকাশের দিন।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে, লাল-সবুজের নিশান উড়িয়ে বিজয়ের দামামা ঘোষণার দিন আজ। বাঙালি মুসলিম বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুধারায় মিশে পূর্ব দিগন্তে বিজয়ের রক্তিম সূর্য উদিত হওয়ার দিন আজ। বঞ্চনা আর নিগ্রহের শিকার ক্ষোভাতুর রক্তচোখে আগুন মেখে রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে, মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় পাকী সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসর মওদুদী জামাতী, দেওবন্দী খারিজী, ওহাবী সালাফী রাজাকার, আল-বাদর, শান্তিকমিটির ঘাতকদের খুঁজে বেড়ানো দেশপ্রেমিক তেজি বাঙালি মুসলিম তরুণের পদভারে এদিন পৃথিবীর বুকে নতুন একটি মুসলিম দেশ- ‘বাংলাদেশ’-এর জন্ম হয়।
কিন্তু এ বিজয় অর্জনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন যে পটভূমি রচনা করে দেয়, ছেষট্টির স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে টালমাটাল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে এক উদ্দাম ঝড় হয়ে তা স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে দানবের মতো জলপাই রঙয়ের ট্যাঙ্ক, রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগানের খই ফোটানো গুলিতে বহু গ্রাম, শহর, ছাত্রাবাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, পুলিশ লাইন, এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত উজাড় করেছিলো পাকিস্তানি বাহিনী।
ঈমানদীপ্ত দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বীর বাঙালি মুসলিমরা সেই কালো রাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর মোকাবেলায়। এ জনপদে জ্বলে উঠেছিলো স্বাধীনতার দীপ্ত শিখা। শুরু হয় বাংলার স্বাধীনতাকামী বীর ছেলেদের সশস্ত্র প্রতিরোধের পালা। অপরদিকে পাকিস্তানী সেনাদের পাশাপাশি তাদের এদেশীয় ঘাতক ওহাবী সালাফী, মওদুদী জামাতী, দেওবন্দী খারিজী ধর্মব্যবসায়ীদের বশংবদ রাজাকার, আল-বাদর, শান্তিকমিটির সদস্যরাও মেতে উঠে স্বাধীনতাবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞে। ৯ মাসের যুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষরা তাদের জীবন-মরণ বাজি রেখে প্রাণপণ যুদ্ধ করে গেছেন। শেষে সাগরসম রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতার বিজয়। ৪৫ বছর আগে আজকের দিনে পরাক্রমশালী পাকিস্তানী বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে বীর বাঙালি মুসলিমর সামনে হাঁটু গেঁড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলো। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। যে অস্ত্র দিয়ে তারা দীর্ঘ নয় (৯) মাস বাঙালি মুসলিমদের রক্ত ঝরিয়েছে, ত্রিশ লাখ বাঙালি মুসলমানকে হত্যা করেছে, প্রায় ৫ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে- সেই অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে এক রাশ হতাশা এবং অপমানের গ্ল¬ানি নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় মেনে নেয়। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর আমরা বাঙালি মুসলমানদের স্বাধীনতা অর্জনের বিজয় দিবস।
১৯৭১ সালে ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর বিজয়ের লগ্নে ১৬ ডিসেম্বর সকালে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কর্মকর্তা জন আর কেলি পৌঁছায় ঢাকা সেনানিবাসের কমান্ড বাংকারে। সেখানে নিয়াজি নেই, রাও ফরমান আলীকে পাওয়া গেলো বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত অবস্থায়। ফরমান আলী জানায়, আত্মসমর্পণ সংক্রান্ত মুক্তিবাহিনীর প্রস্তাব তারা মেনে নিয়েছে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেই সংবাদ পাঠাতে পারছে না তারা।
কেলি প্রস্তাব দেয়, জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে সে বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। আত্মসমর্পণের জন্য বেঁধে দেয়া সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আরো ৬ ঘণ্টা বাড়ানো ছাড়া মুক্তিবাহিনীর সব প্রস্তাব মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা পৌঁছানো হয় জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে। ভারতে তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের (বর্তমান শেক্সপিয়ার সরণি) একটি দোতলা বাড়িতে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিবালয় আর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সকাল আনুমানিক ১০টায় তাজউদ্দীন আহমদের ফোন বেজে উঠলো। ওই ফোনে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছাড়া ফোন করতে পারেন না। কী কথা হলো বোঝা গেলো না। কিন্তু ফোন রেখে, চোখে-মুখে সব আনন্দ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, ‘সবাইকে জানিয়ে দিও, আজ আমরা স্বাধীন। বিকেল চারটায় আত্মসমর্পণ।’ প্রধানমন্ত্রী নিজেই অবশ্য খবরটি সবাইকে শোনালেন। আর বললেন, কাজের প্রথম পর্যায় শেষ হলো কেবল। এবার দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
ঢাকায় খুশির খবর এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগে। আত্মসমর্পণ হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়। ঢাকাবাসী কী করবে, আর কী করবে না, বুঝে উঠতে পারছে না। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মুক্তিবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করলো। পৌষের সেই পড়ন্ত বিকেলে ঢাকা রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রস্তুত হলো ঐতিহাসিক এক বিজয়ের মুহূর্তের জন্য। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে ৯১ হাজার ৫৪৯ জন পাকিস্তানি সেনা। আত্মসমর্পণের দলিলে বিকেলে সই করলেন পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। ৯ মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে জন্ম নিলো একটি নতুন মুসলিম দেশ- ‘বাংলাদেশ’।
আজ সরকারি ছুটি। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। বিজয়ের ৪৫ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে নতুন উদ্যমে দিনটি উদযাপন করছে পুরো বাঙালি মুসলিম জাতি। কালের পরিক্রমায় প্রতি বছর এ দিনটি একবার ঘুরে এলেও এবার দিনটির রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। বিশেষ প্রেক্ষাপট। দীর্ঘ দিন থেকেই বিভিন্ন মহল ও প্রান্ত থেকে আমাদের বুকের তাজা রক্তে অর্জিত প্রিয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে বারবার। ভারতীয় হানাদার সন্ত্রাসী সংস্থা (RAW) ‘র’ আমাদের স্বাধীনতা বিপন্ন করতে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছে। তারা তাদের পেইড এজেন্ট তথা ভাড়টে সাংবাদিক ও মিডিয়ার দ্বারা দুই বাংলা এক করে দেয়ার আওয়াজ তুলেছে। বাংলাদেশকে পশ্চিমবঙ্গের সাথে একীভূত করে ভারতের অঙ্গ রাজ্য বানাতে ষড়যন্ত্র ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে এক শ্রেণীর দালাল সাংবাদিক ও মিডিয়া। অথচ সরকার নীরব। মনে হচ্ছে- সরকার যেন নীরব পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে। তাই এখন আমাদের দেখিয়ে দেয়ার সময় এসেছে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। জীবনের মায়া উপেক্ষা করে যেসব বীর সেনানি সে দিন দেশমাতৃকার টানে অস্ত্র হাতে লড়াই করে জীবন দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন, জাতি আজ তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।
কর্মসূচি:
প্রত্যুষে ৩১বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসটির সূচনা হবে। সকাল দশটায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হবে বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ। এতে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।
অন্য অনুষ্ঠানের মধ্যে আছে সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গমন, শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া, মীলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ইত্যাদি।
সর্বমহলে মওদুদী জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ, সব যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের ফাঁসি কার্যকর ও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জোরদার দাবি:
একাত্তরের বিজয় আজ পরাজয়ে পর্যবসিত হচ্ছে কিনা- সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মওদুদীবাদী জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, সকল যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের দ্রুত ফাঁসি কার্যকর ও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জোর দাবি উঠছে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে সভা সেমিনারে, গণমাধ্যমে ও সোস্যাল নেটওয়ার্কে।
সর্বমহলে এখন মওদুদীবাদী জামাতের পরিচালিত ব্যাংক ব্যবস্থার ‘মৌলবাদী অর্থনীতির’ মূলোৎপাটন এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে মৌলবাদের অর্থের উৎসগুলো রাষ্ট্রয়াত্ত করার দাবি উঠেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উৎখাত ছাড়া কোনো মৌলিক সংস্কার সম্ভব নয় বলেও মত প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে