বাম্পার ফলন সত্ত্বেও দ্বিগুণ লোকসান গুনছেন উত্তরাঞ্চলের সবজিচাষিরা


আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে সবজি চাষে মনোযোগী হয়েও লাভ হয়নি উত্তরাঞ্চলের চাষিদের। কারণ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মতো সবজি বাজারেও ধস নেমেছে। ফলে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে শীতের সবজি চাষ করে এবং বাম্পার ফলন পেয়েও তাদের মনে আনন্দ নেই। উপরন’ কত টাকা লোকসান গুনতে হবে- এ দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ভর করেছে তাদের চোখে মুখে।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে এবার ১০ লাখ কৃষক প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করেছেন। এতে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ টন সবজি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এসব সবজির বাজারমূল্য হওয়ার কথা ছিল কমপক্ষে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা। কিন’ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মত ঈদের পর থেকে সবজির বাজার পড়ে যাওয়ায় কৃষক এর বাজারমূল্য দুই-তিন হাজার কোটি টাকাও পাবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রতি কেজি সবজি ২০ টাকা হলে ৪০ লাখ টনের দাম দাঁড়ায় আট হাজার কোটি টাকা। এখন প্রতি কেজির মূল্য ১০ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি কেজি গড়ে সাত টাকা হলে ৪০ লাখ টনের দাম হবে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ লোকসান হবে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা।
গত শুক্র ও শনিবার বগুড়ার মহাস’ানগড় হাটে সবজির পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মুলা প্রতিমণ (৪০ কেজি) ২৫ থেকে ৪০ টাকা, আলু প্রতি বস-া (৮৬ কেজি) ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, বেগুন প্রতি মণ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, লালশাক, পালংশাক প্রতি মণ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, ফুলকপি প্রতি মণ ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা, বাঁধাকপি ১০০ টির মূল্য ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, লাউ ১০০ টি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, করলা প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এতে পাইকারি বাজারে কৃষক পাচ্ছেন প্রতি কেজি মুলা ৫০ পয়সা, বেগুন সাত টাকা, আলু সাত টাকা, লালশাক, পালংশাক চার-পাঁচ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১৫ টাকা, ফুলকপি ১৬ টাকা, বাঁধাকপি প্রতিটি পাঁচ-সাত টাকা, লাউ প্রতিটি পাঁচ-ছয় টাকা।
স’ানীয় কৃষকেরা জানান, এসব উৎপাদনে তাদের খরচ পড়েছে পাইকারি বিক্রি মূল্যের দ্বিগুণেরও অনেক বেশি। গত বছর একই সময়ে এসব সবজি উৎপাদন করে তারা প্রচুর টাকা লাভ করেছিলেন। মহাস’ানগড় হাটে মুলা বিক্রি করতে আসা করতকোলা গ্রামের আবিদুর রহমান জানান, এক বিঘা জমিতে মুলা চাষ করতে তার খরচ হয়েছে সাত হাজার টাকা, ওই জমির মুলা বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র দুই হাজার টাকা। মুলার ক্রেতা নেই। গত বছর একই জমির মুলা বিক্রি করে পেয়েছিলেন ২২ হাজার টাকা। বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি করতে আসা মহিষবাথান গ্রামের আব্দুর রহিম ও সেলিম জানান, গত বছর একই সময়ে বেগুন পাইকারি বিক্রি হয়েছে ২০-২৫ টাকা কেজি, ফুলকপি ৩০-৩৫ টাকা কেজি, বাঁধাকপি প্রতিটি ১০-১৫ টাকায়। এবার বেগুন বিক্রি করতে হচ্ছে সাত-আট টাকা, ফুলকপি ১৫-১৬ টাকা, বাঁধাকপি প্রতিটি পাঁচ-সাত টাকা। কিন’ এসব সবজির উৎপাদন খরচ পড়েছে তার দ্বিগুণের বেশি। এ ছাড়া এবার শ্রমিকের মজুরি দ্বিগুণ। জ্বালানি তেলের পর পর তিন বার দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচও অনেক বেড়েছে। ফলে কৃষকদের দ্বিগুণ লোকসান দিতে হচ্ছে।
কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ বগুড়া উপপরিচালকের অফিস জানিয়েছে, গত বছর রাজশাহী রংপুর বিভাগে এক লাখ ৩৭ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছিল। প্রতি হেক্টরে গড়ে ২১ টন হিসাবে প্রায় ২২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয়েছিল। এ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ কৃষক সবজি চাষ করেন।
কৃষি সমপ্রাসারণ বিভাগ এবার উত্তরাঞ্চলের সবজি চাষের জমির পরিমাণ সঠিক জানাতে না পারলেও ব্র্যাকের কৃষি বিভাগ সিনজেনটা, বায়ার, অটোক্রপ, কয়েকটি বালাই নাশক কোম্পানি এবং উত্তরাঞ্চলে কৃষি নিয়ে কাজ করেন এ রকম কয়েকটি এনজিও সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে কৃষক সবজি চাষ করেছেন।
গত বছর তিন লাখ ৩৪ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। আলুর দর না পাওয়ায় এবার আলু চাষ কমিয়ে কৃষক সবজি চাষে মনযোগী হয়েছেন। কিন’ তাতেও তাদের দশা আলু চাষের মতো হয়েছে।
শুধু বগুড়ার ছয় উপজেলায় ১০০টি সবজি গ্রামে আট হাজার হেক্টর জমির শীতকালীন সবজি এ পর্যন্ত বাজারে এসেছে বলে বগুড়া কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে। বগুড়ার প্রায় ৫০টি গ্রামে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সবজি ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেছেন।
কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ উপপরিচালকের অফিস জানায়, বগুড়ায় উৎপাদিত সবজি ২০ ভাগ দিয়ে স’ানীয় চাহিদা পূরণ হয়। ৮০ শতাংশ দেশের বিভিন্ন স’ানে সরবরাহ হয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন- এক হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে বেগুন, এক হাজার ৬৫০ হেক্টরে মুলা, ৬২০ হেক্টরে ফুলকপি, ৬৯০ হেক্টরে বাঁধাকপি, ৪৪৫ হেক্টরে লাউ, ৯২০ হেক্টরে শিম, ৩২০ হেক্টরে টমেটো, ৫২০ হেক্টরে লালশাক, ২৫০ হেক্টরে পালংশাক, ২৩৫ হেক্টরে ডাঁটা, ৪৫ হেক্টরে গাজর, ৪০০ হেক্টরে মিষ্টিকুমড়া, ১৬০ হেক্টরে শসা, ৪৩০ হেক্টরে করলা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শীতকালীন সব সবজি বাজারে এসেছে। বগুড়ায় এবার ১১ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষিবিভাগ।

 

সূত্র: নয়া দিগন্ত 09.02.2012

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+