বিকেন্দ্রীকরণই একমাত্র সমাধান 


ঢাকায় চাকার গতি ১০ বছর আগে ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার, আর বর্তমানে তা প্রায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসছে। মানুষের হাঁটার গতির মান ঘণ্টায় গড়ে পাঁচ কিলোমিটারের মতো। এর মানে কী? গাড়িগুলো কি হেঁটে যাচ্ছে। ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ দশাই কি হলো আমাদের। অথচ বাংলাদেশে রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভারের নির্মাণ খরচ এখন পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন? মূলত ফ্লাইওভারের নামে লুটপাট হচ্ছে।
বিকেন্দ্রীয়করণের অভাবে বায়ুদূষণ বাড়ছে। বুড়িগঙ্গায় তো বিশুদ্ধ পানিই নেই। শীতলক্ষ্যার অবস্থাও প্রায় একই। শব্দদূষণ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। বলা হয়ে থাকে, ৪৫ ডেসিবল শব্দে গড়পড়তা মানুষ ঘুমাতে পারে না। বলা হচ্ছে, ৬০ ডেসিবল শব্দে মানুষ অস্থায়ীভাবে বধির হতে পারে, আর ১০০ ডেসিবল শব্দের কারণে মানুষ স্থায়ীভাবে বধির হয়ে যেতে পারে। ঢাকা শহরের শব্দের মাত্রা বহুদিন আগেই সহনীয় পর্যায় অতিক্রম করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের ঢাকার জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে কেন? এর উত্তর খোঁজার জন্য আপনাকে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পক্ষপাতিত্বমূলকভাবে অনেক বেশি। ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত এখানে ভিড় করছে জীবনের তাগিদে। বেশিরভাগ অফিস-আদালতের হেডকোয়ার্টার ঢাকায় হওয়ায় মানুষের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশে যেটুকু শিল্পায়ন হয়েছে, যতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে বা হচ্ছে, তার প্রায় পুরোটাই ঢাকা, চট্টগ্রাম বা ঢাকার আশপাশের এলাকাকেন্দ্রিক। পোশাক শিল্প-কারখানার দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারা যায়। ঢাকা বা তার আশপাশের এলাকায় বিনিয়োগ তথা শিল্পায়ন বেশি হচ্ছে বলে এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি তৈরি হচ্ছে। কর্মের খোঁজে, শ্রম বিক্রির খোঁজে গরিব মানুষগুলো এসব শিল্পঘন এলাকায় ভিড় করছে। শ্রমের অভিবাসন হচ্ছে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শ্রমশক্তির অভিবাসন অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শ্রমের মূল্য বেড়ে যেতে পারে। শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্য বিনিয়োগ দরকার। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে না। আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ শুধু ঢাকা বা আশপাশের এলাকায় তৈরি করে দিলে হবে না। টেকসই প্রবৃদ্ধির স্বার্থেই বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারলে ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমে আসবে। দেশের অনুন্নত অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ উৎপাদনের জরুরি উপকরণের সহজলভ্যতা কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ঢাকা বা তার আশপাশের শ্রমিক যে দরে তাদের শ্রম বিক্রি করছেন, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী বা কুষ্টিয়ার শ্রমিক সে দরে শ্রম বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে দেশের অভ্যন্তরে আয়বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। রাজধানীর আশপাশের কৃষক ফসল উৎপাদন করে যে মূল্য পাচ্ছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক একই ফসল উৎপাদন করে সে পরিমাণ মূল্য পাচ্ছেন না। যদিও এ দুই প্রান্তের কৃষকের শ্রমের মূল্য ছাড়া উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের মূল্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকেনি। তারা একই দরে ইউরিয়া, পটাশ বা কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে শস্য উৎপাদন করেছেন।

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে