বিধর্মীর বিদ্বেষ


 

প্রেক্ষিত ১, অন বোর্ড উইথ রয়াল ডাচ এয়ারলাইন্স

খাওয়া শেষে চা-কফি পরিবেশন করছে কেবিন ক্রু। আমার সারিতে বসা বাকী দু’জন যাত্রীকে চা-কফি অফার করলো মেয়েটি। তাদেরকে পরিবেশন করে চলেও গেল, আমাকে কিছু না বলেই। ভাবটা এমন যেন ওখানে ২ জন যাত্রী ছিল, ৩ জন নয়। আমার অস্তিত্ব যেন তার নজরেই পড়ল না। আমিতো বাকী যাত্রীদের মত পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেই প্লেনে চড়েছি। চাইলে এটাকে সাথে সাথেই ধরা যেত। ধরিনি কারন, ক্লান্ত ছিলাম, চা-কফি খাবার ইচ্ছে এমনি ছিল না, আর আল্লাহ পাকের কাছে নালিশ দিয়ে রাখার অপশনতো রয়েছেই।

 

প্রেক্ষিত ২, অন বোর্ড উইথ এয়ার ফ্রান্স

আমার হাতের ক্যারি-অনটা বেশ ভারী। এটাকে ওপরে তুলতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ন মনে হচ্ছিল। পাশেই দেখি এক শক্ত সামর্থ্য কেবিন ক্রু। তাকে অনুরোধ করলাম আমার ব্যাগটা তুলে দিতে। সে সাফ জানিয়ে দিল, যার ব্যাগ তাকেই তুলতে হবে। কথাটা অদ্ভূত ঠেকলেও কিছু বললাম না তাকে। নিজেই উঠালাম ব্যাগ। কিছুক্ষন পর এক আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলা উঠল। তার হাতে ঢাউস ব্যাগ। সেই ক্রুটি দৌঁড়ে এসে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, মে আই হেল্প ইউ ম্যাম? অতপরঃ তার ব্যাগটি ওপরে তুলে দিল।

 

প্রেক্ষিত ৩, স্টকহোম

বাসে উঠেছি। একবার ব্যাবহারেই আমার এসএল (বাস ট্রেনের টিকিট) থেকে ৫০ ক্রোনা উধাও। ২৫ ক্রোনা যাবার কথা ছিল। এই বাস থেকে নেমে অন্য বাসে উঠতে হবে আমাকে। সেখানে ট্রান্সফার পাবার কথা। কিন্তু কথা থাকলেও এই ট্রান্সফার জিনিষটা স্টকহোমে কোনদিন পাইনি। ট্রান্সফার পেলে ১২.৫০ ক্রোনা দিতে হয়, ২৫ ক্রোনা দেয়া লাগে না। যেহেতু আগে কোনদিন ট্রান্সফার পাইনি, তার ওপর ৫০ ক্রোনা কেটে নিয়েছে মেশিন- চিন্তা করলাম পরের বাসে উঠে ড্রাইভারকে বলব ব্যাপারটা। তাতে করে আমার কার্ড আর রিডারে ছোঁয়াতে হবে না, তাই আরেক দফা পয়সাও যাবে না। বাসে উঠে তাকে জানালাম, আমার ট্রান্সফার পাবার কথা এবং আগের বাসটি ডবল পয়সা কেটে নিয়েছে। তাই আমি কার্ড ব্যাবহার করতে চাই না। সে রাজী হলো না। ভাঙা ইংরেজীতে কোনমতে জানিয়ে দিল, বাসে যেতে হলে আমাকে কার্ডটি রিডারে দিতেই হবে। তখন আমি তাকে বললাম কার্ড হিস্ট্রি বের করতে। সেটা বের করলে পাওয়া যাবে আমি কার্ডটি কতক্ষন আগে, কোথায় ব্যাবহার করেছি এবং কত ক্রোনা কেটে নিয়েছে। এটি করতেও রাজী নয় সে। অগত্যা আবারো ২৫ ক্রোনা গচ্চা দিতে হলো। অথচ ইচ্ছে করলে সে আমাকে যেতে দিতে পারত। পে পার রাইড ভিত্তিতে এই প্লাস্টিক কার্ডটি চালু হয়েছে সম্প্রতি। এর আগে কাগজের স্লিপের মত টিকিট ছিল। সে টিকিটেও ট্রান্সফার ব্যাবস্থা ছিল। সে টিকিট ব্যাবহার করে আমি বহুবার বাসে চড়েছি। ট্রান্সফার নেবার উদ্দেশ্যে টিকিট বের করলেই ভেতরে যেতে বলেছেন সোমালিয়ান আর ইরানী ড্রাইভার ভাইয়েরা, টিকিটের দিকে চেয়েও দেখেননি। কারন, তারা জানের তাদের বোন মিথ্যে বলে বাসে চড়বে না। কিন্তু আজকের ড্রাইভারতো মুসলমান নয়, আমার পকেট থেকে দু’পয়সা খোয়া গেলেই ওর আনন্দ। এটি ছিল মুশরেকের দেশের বালাওয়ালা (শিখ)।

 

প্রেক্ষিত ৪, নিউ ইয়র্ক

আমার মেট্রোকার্ডের (বাস ট্রেনের টিকিট) ব্যালান্স শেষ। বুথে গেলাম রিফিল করতে। কার্ডে ব্যালান্স লোড হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সে কারন কর্মচারীটি ব্যাখ্যা করতে পারছে না। আমি তখন বললাম আমার কার্ডটির মেয়াদ অল্পদিন আছে। তুমি আমাকে এটার বদলে নতুন একটি কার্ড দিয়ে সেখানে ব্যালান্স লোড করে দাও। সে জানালো এমন দেয়া যাবে না। (কিন্তু আমি জানি দেয়া যাবে। আমার আগের কার্ডটি মেয়াদউত্তীর্ন হবার অল্পদিন আগে রিফিল করতে গিয়েছিলাম। সেদিন বুথের মহিলা নিজ থেকেই আমাকে বলেছিল যে, আমার কার্ডটি শীঘ্রই অচল হবে। তাই সে পুরনোটি বদলে নতুন মেয়াদযুক্ত একটি কার্ড আমাকে দিতে চায়। আমি রাজী হলে সে আমাকে নতুন কার্ড দিয়েছিল বাড়তি ফি ছাড়াই।) আমি লোকটিকে বললাম, আমার কার্ডে ব্যালান্স দাও, নয়তো নতুন কার্ড দিয়ে সেখানে দাও। সে কোনটাই দিবে না। আমি আর কথা না বাড়িয়ে একটা নতুন কার্ড কিনে নিলাম। নতুনটি কিনতে আমার খরচ হলো ১ ডলার। আর আমার পুরনো কার্ডে ছিল ৫০ সেন্টস (পয়সা)। তখনকার মত দেড় ডলার গচ্চা দিয়ে বিদায় হলাম। কিন্তু কার্ডটি ব্যাবহার করতে গিয়ে দেখি সেটির মেয়াদ এতই কম যে পরের মাসে আমার আর একটি কিনতে হবে। এত কম মেয়াদসম্পন্ন কার্ড আমার নিউ ইয়র্ক জীবনে কোনদিন দেখিনি। এই কাজটিও সে ইচ্ছে করে করেছে। এখানে আমার সর্বমোট ক্ষতির পরিমান ২.৫০ ডলার। বলে রাখি, কর্মচারীটি মুশরেকের দেশের মালু ছিল।

 

প্রেক্ষিত ৫, নরওয়েজিয়ান এয়ারলাইন্স

রাউন্ড ট্রিপের টিকিট কিনতে গিয়ে দেখি খাবার প্রি-অর্ডার করার অপশন আছে। মেনু ঘেটে দেখি “হালাল মেনু” বলে একটি মেনু আছে। অতি উৎসাহে অর্ডার দিয়ে ফেললাম। ভাবলাম, ওরা কত ভালো! মুসলিম যাত্রীদের কথা চিন্তা করেছে! সেদিনের মত অন্য কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরলাম। হঠাৎ মনে হলো আমি কাদের ওপর সু-ধারনা পোষন করেছি? হালাল মেনু নাম দিয়েছে বলেই যে আমার জন্য হালাল খাবার খুঁজে এনে দিবে এমনতো বিশ্বাস করা উচিত নয়। সাথে সাথে অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে হালালটাকে ভেজিটারিয়ান দিয়ে রিপ্লেস করে নিলাম।

 

আচ্ছা পাঠক, আমার প্রতি ওদের এই বৈষম্যমূলক আচরনের কারন অনুমান করতে পারছেন? পারার কথা। তবুও বলে দিচ্ছি, আমার পরিচ্ছদ সগৌরবে আমার ধর্মীয় পরিচয় জানান দেয়। সেখানেই ওদের সমস্ত অসুবিধা। আল্লাহ সুবহানাতা’য়ালাতো সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, ইহুদী-মুশরেক তথা তাবৎ বিধর্মীরা আমাদের শত্রু। সাধ্যের মধ্যে থাকা সবটুকু ক্ষতি তারা করতেই চাইবে। খেয়াল করে দেখুন, আমার সাথে বিরূপ আচরণ আর কিছুক্ষেত্রে সামান্য আর্থিক ক্ষতি ছাড়া কিছুই করেনি ওরা। করেনি কারন, সাধ্যে কুলোয়নি। সাধ্যে থাকলে নিশ্চয়ই আমাকে এত অল্পে ছেড়ে দিত না। সুতরাং, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে স্মরন রাখতে হবে কালামুল্লাহ শরীফ উনার মাঝে বিবৃত সতর্কবানী।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে