বেগুনবাড়ি বস্তি থেকে হাতিরঝিল || পুরান ঢাকা থেকে কি হবে ?


‘হাতিরঝিলে গেলে মনে হয়, প্যারিস শহরের কোনো অংশে এসেছি। আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস মনে হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার দেখলে মনে হয় এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য।’ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জাদুকরি নেতৃত্বে দেশ বদলে গেছে মন্তব্য করে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। (https://bit.ly/2EtAeQp)

কথাটা ভুল না, সত্যিই আকাশ থেকে হাতিরঝিল দেখলে ফ্রান্সের প্যারিস মনে হতে পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর কাছে এই তথ্য থাকাও দরকার ছিলো হাতিরঝিল কিন্তু এক সময় এমন নান্দনিক ছিলো না, হাতিরঝিল এক সময় ছিলো দৃষ্টিকটু বেগুনবাড়ি বস্তি। যে বস্তিতে সামান্য টাকায় থাকতো হাজার হাজার স্বল্প আয়ের খেয়ে খাওয়া মানুষ। সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে আজকে তৈরী হয়েছে বিনোদন স্পট হাতিরঝিল প্রকল্প। তবে সেই উচ্ছেদের অনেকগুলো প্রক্রিয়া ছিলো। সবচেয়ে সহজ প্রক্রিয়া ছিলো অগ্নিকাণ্ড। হঠাৎ শর্ট সার্কিটে আগুন, অথবা গ্যাসের পাইপ লাইন ফেটে আগুন ছিলো বেগুন বাড়ির নিত্যনৈম্যত্তিক ঘটনা। একেকবার আগুন লাগলে ৫-৭শ’ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাইতো, মারা পড়তো অনেকে। টিভি-পত্রিকায় সবাইকে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিতো, কিন্তু দিন শেষে লাভবান তারা হইতো, যাদের প্ল্যান ছিলো সেই বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করার। স্বাভাবিকভাবে এদের উচ্ছেদ করতে, অনেক কষ্ট করতে হতো, কিন্তু একটা আগুনের অজুহাত দিয়ে পুরো এলাকা খুব সহজেই পরিষ্কার হয়ে গেলো।

২০১৭ সালে গুলশান মার্কেটের আগুনের কথা মনে আছে, কত ভয়াবহ আগুন হয়েছিলো সেটা। আগুন ধরার পর ব্যবসায়ীদের বক্তব্য প্রকাশ হয়েছিলো দৈনিক সমকালের ৪ঠা জানুয়ারী, ২০১৭ তারিখে: “রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। ওই মার্কেটে আগুন লাগার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, তাদের মার্কেট থেকে উচ্ছেদ করতে পরিকল্পিতভাবে মার্কেটে আগুন দেওয়া হয়েছে। এটি নাশকতা। একই দাবিতে অনড় রয়েছেন তারা। কোনও কোনও ব্যবসায়ীর দাবি, মাত্র আধাঘণ্টার আগুনে এভাবে ইট-পাথরের একটি ভবন সম্পূর্ণ বিধস্ত হতে পারে না। হাতে কোনো প্রমাণ না থাকলেও নানা সন্দেহজনক কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের বদ্ধমূল ধারণা, মার্কেট ভবনটি বিশেষ কারসাজিতে ধ্বংস করা হয়েছে। গুলশান-বনানী জোনের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলামের দুটি দোকানও পুড়েছে আগুনে। তিনি পুড়ে যাওয়া গুলশান ১ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বুধবার দুপুরে নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ১৯৮৩ সালে কাঁচা বাজারের ভবনটি তৈরি করা হয়। কোনো নাশকতা না থাকলে মাত্র আধাঘণ্টার আগুনে একটি মার্কেট ভবন এভাবে ধসে পড়তে পারে না। তিনি বলেন, মার্কেটের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে সিটি কর্পোরেশন ডেভলপার কোম্পানির কাছে মার্কেটটির জায়গা তুলে দিতেই এমন নাশকতা করতে পারে। পাকা মার্কেট দোকান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. বাবুলের দাবি, পরিকল্পিতভাইে তাদের শেষ করে দেওয়া হয়েছে। (https://bit.ly/2EsHT1b)

পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড কেন ?
আমার ধারণা, সরকার বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে একটি পর্যটন ও বিনোদন এলাকা তৈরী করতে চান, যা হবে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন। বিদেশীরা নদীর তীরে এইসব পর্যটন এলাকায় থাকবে আর বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য অবলোকন করবে। সরকার বিভিন্ন সময় বিদেশীদের কাছে লোন চায়, কিন্তু তাদের থাকার জন্য ভালো কোন এলাকা যদি তৈরী না করতে পারে, তবে কি হবে ? তাছাড়া এই পর্যটন এলাকা তৈরীর নাম করে বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ আনা যাবে এবং সেখানে থেকেও বগলদাবা করা যাবে অনেক টাকা।
এ বিষয়ে খুজতে খুজতে একটা প্রজক্টের নাম পেলাম, যার নাম “বুড়িগঙ্গা রিভার ডেভলপমেন্ট এন্ড এন্টারটেইনমেন্ট মেগা প্রজেক্ট”। এ সম্পর্কে দুটো আর্টিকেল আছে, পড়তে পারেন: https://bit.ly/2NlB707, https://bit.ly/2TcfJzG

আমার ধারণা বর্তমানে বুড়িগঙ্গার তীরে যে অভিযান চলছে সেটা ঐ এন্টারটেইনমেন্ট জোন তৈরী করার জন্যই প্রাথমিক কাজ এবং গত কয়েকদিন আগে চকবাজারে যে অগ্নিকাণ্ড ঘটলো সেটাও সেই প্রজেক্টের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে আমরা যে বাণিজ্যিক পুরান ঢাকা চিনি, সেটা যদি থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশের পর্যটন এলাকা হবে না, তাই বিদেশীদের কথা চিন্তা করে পুরো পুরান ঢাকা এলাকাই পরিষ্কার করা হবে ধিরে ধিরে। আর সে কথা চিন্তা করে, পুরান ঢাকা এলাকার পণ্য সামগ্রির ‘কাচামাল’কে ‘কেমিকেল’ ট্যাগ দিয়ে সকল ব্যবসার কলিজার মধ্যে হাত দেয়া হয়েছে।

আমি আবার আপনাদের হিসেব মিলিয়ে দিচ্ছি-
১) প্রথম- আগের সপ্তাহে মঙ্গলবার দিন মেয়র সাঈদ খোকন বললো, আগামী সপ্তাহে কেমিকেল কারাখানায় অভিজান হবে। (https://bit.ly/2SV3nMZ)
২) সপ্তাহের শুরুতে কিছু কিছু দোকানে অভিজান চালাতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়লো সাঈদ খোকন। স্থগিত হলো অভিজান। (এটার জন্য নিউজ রেফারেন্স নাই, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী আমাকে জানিয়েছে)।
৩) বৃহস্পতিবার রাস্তায় প্রচুর মানুষ থাকবে এমন সময় বাইরে থেকে ঘটানো হলো বিষ্ফোরণ, এমন বাড়ির সামনে, যেখানে আছে কোন ধরনের কেমিকেল গোডাউন। উদ্দেশ্য যানজটে বিষ্ফোরণ হলে এমনি মানুষ মারা যাবে, কিন্তু যদি গোডাউনে আগুন লাগে তবে ভালো। আর যদি নাও হয়, অন্য পলিসি। বিষয়টা হলো পরীক্ষায় আসছে গরুর রচনা। কিন্তু নদীর রচনা পারি কিন্তু গরুর রচনা পারি না। সমস্যা সমাধানে গরুটাকে নদীতে নামায় দাও তাইলে হবে। বাইরে কিছু দিয়ে বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে মিডিয়ার মাধ্যমে ‘কেমিকেল’ শব্দটাতে হুজুগ তুলে দাও, ব্যস পরে টিভি ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পরো গোডাউনে। হয়ে যাবে কারবার।
৪) আমার ধারণা, পুরান ঢাকা দীর্ঘ সময় ধরে যে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠেছে, তা উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলো চক বাজারের অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যম দিয়ে। এত এত মানুষের রুটি রোজগার ধ্বংস হলে হোক, নদীর পাড়ে পর্যটন এলাকা গড়তে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে।
৫) পুরো ঘটনার সাথে মেয়র সাঈদ খোকন জড়িত, সাথে জড়িত সাবেক আইনমন্ত্রী কামরুলের ভাইয়ের টিভি সময়নিউজ, এটা আমি মোটামুটি নিশ্চিত। তবে সরকারের উর্ধ্বতন মহলের দিক নির্দেশনায় হওয়াটাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

হয়ত ভাবতে পারেন, পুরান ঢাকা যদি পর্যটন এলাকা হয় তবে তো ভালোই হয়। হা অবশ্যই ভালো হবে, সেটা যারা তৈরী করছে তাদের জন্য ভালো, কিন্তু সাধারণ জনগণের জন্য ভালো না। এ সম্পর্কে আজ থেকে ১ বছর আগে একটা লেখা লিখেছিলাম ব্রাজিলে কর্পোরেটোক্রেসির বাস্তবায়ন নিয়ে। বলেছিলাম ব্রাজিলে তৈরী হয়েছে অত্যাধুনিক সব স্থাপনা, রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, পর্যটন স্পট। বিদেশীরা সেখানে গিয়ে আলিশান ভঙ্গিতে থাকে, কিন্তু স্থানীয় মানুষ দু’বেলা খেতে পায় না, সামান্য খাদ্যের জন্য মেয়েরা শরীর বিকিয়ে দেয় (https://bit.ly/2VfHBAk)। পুরান ঢাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ হলে ভালো মানের পর্যটন এলাকা হবে নিশ্চিত, কিন্তু অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে, বেকার হয়ে পড়বে লক্ষ লক্ষ মানুষ।
Collected………….

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে