সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত। ব্লগের উন্নয়নের কাজ চলছে। অতিশীঘ্রই আমরা নতুনভাবে ব্লগকে উপস্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ।

বৈদেশীক মুদ্রা রিজার্ভ ২৭ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু সরকারের গর্বের ভিত্তি কতটুকু? শুধু ইতিবাচক দিকই নয়, রিজার্ভ বাড়ার নেতিবাচক দিকও রয়েছে। রিজার্ভ বাড়ার সুফল নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।


দেশে প্রথমবারের মতো বৈদেশীক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বৈদেশীক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ গত ১৭ আগস্ট-২০১৫ ঈসায়ী তারিখে ২৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে রিজার্ভ ছিল ২২ বিলিয়ন ডলারের মতো।
আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশীক মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশের আমদানির বর্তমান গতিধারা বলছে, এ রিজার্ভ দিয়ে অন্তত ৭ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও গর্ববোধ করে বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি এটি বাংলাদেশের জন্য গর্ব কিংবা স্বস্তির? যেখানে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটছে না, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বা ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়েনি, নেই অবকাঠামো সুবিধা। অভিজ্ঞমহল বলছে, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যয়ের সামর্থ্য না থাকায় রিজার্ভ বাড়ছে। এটি কখনোই সুখকর পরিস্থিতি নয়।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ একইসঙ্গে আশা এবং নিরাশার কারণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্ফীত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ অধিক মাত্রায় হলে তা অর্থনীতির জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু বিনিয়োগবিহীন রিজার্ভ অর্থনীতির জন্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। রিজার্ভ ২০০৪ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। শুধু অলস রিজার্ভ কোনো কাজে লাগে না। কারণ রিজার্ভের সুফল ঘরে তুলতে হলে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলে থাকে- মোট রিজার্ভের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু বর্তমান সরকার ১৬ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ পরিমাণ বিনিয়োগে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ১৬ শতাংশ বিনিয়োগে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব।
সঙ্গতকারণেই আমরা মনে করি, রিজার্ভ বেড়েছে বলে সরকারের গর্ব করার কিছু নেই। দেশে উৎপাদন বাড়াতে না পারলে এর কোনো মূল্য নেই। পুঁজি স্বল্পতার দেশে হঠাৎ করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমাদের ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গত পাঁচ বছরে দেশে রাস্তা-ঘাটের সৌন্দর্যবর্ধন হয়েছে কিন্তু শিল্পায়নের উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। বিনিয়োগের জন্য আজ পরিবেশ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গেল ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এ পরিমাণ রেমিট্যান্স আগের ২০১৩-১৪ অর্থবছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আর চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৩৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। এছাড়া ২৩ অক্টোবর-(২০১৫) পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৮২ কোটি ডলার।
রফতানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৭৭৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের রফতানী আয় দেশে এসেছে, যা গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। গেল ২০১৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানী আয় এসেছিল ৭৬৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এছাড়া গেল ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পুরো সময়ে দেশে রফতানী আয় এসেছিল ৩ হাজার ১১৯ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আমরা মনে করি, এ ধারাকে আরো এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করার বিকল্প নেই।
তবে শুধুমাত্র ইতিবাচক কারণেই রিজার্ভ বাড়েনি। এর পেছনে অনেকগুলো নেতিবাচক কারণও রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো- বিনিয়োগ কমে যাওয়া। গত কয়েক মাসে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কমে গেছে। এর ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে। বিনিয়োগ কমার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থার জটিলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের পর্যাপ্ততার অভাবকেই দায়ী করছে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছে, এ অস্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি ভাবতে পারছে না উদ্যোক্তারা। ফলে তারা এখনো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছে না। এছাড়া হলমার্ক কেলেঙ্কারির কারণে এখনো উদ্যোক্তাদের উপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না ব্যাংকাররা। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না অনেক উদ্যোক্তা। আবার অনেক বড় উদ্যোক্তাকে বিদেশী ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নেয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবেশ বাড়ছে। ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে নতুন উদ্যোক্তাও কম তৈরি হচ্ছে।
সঙ্গতকারণেই আমরা মনে করি, অলস অর্থ ফেলে রেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আমরা বলতে চাই, রিজার্ভ পরিস্থিতি ইতিবাচক হলে স্বভাবতই অর্থনীতিতে এর সুফল পড়ে। কিন্তু এর আগে রিজার্ভ বৃদ্ধির পরে এমনও লক্ষ্য করা গেছে যে, টাকার মূল্যমান বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেলেও বাজারে তথা ভোক্তা পর্যায়ে এর যথাযথ সুফল নিশ্চিত হয়নি। যেখানে টাকার মূল্যমান বৃদ্ধি পেলে আমদানি করা পণ্যের দাম কমে যাওয়ার কথা সেখানে দাম তো কমেইনি, বরং অনেক পণ্যের দামও বেড়ে গিয়েছিল। এবারে যখন রিজার্ভ ২৩ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, তখন আগের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকারকেই এই অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে।
আমরা সরকারকে বলতে চাই, এমন পদক্ষেপ নেয়া হোক, যেন দেশের রফতানীমুখী শিল্পের উন্নয়নসহ রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। একইসঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নতুন নতুন দেশে জনশক্তি রফতানীর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে- যেন দক্ষ শ্রমিক রফতানী হয়। এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এ বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হলে দেশের রিজার্ভ যেমন বাড়বে, তেমনি এর সুফলও ভোগ করবে জনগণ।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে