বোরকা পরায় ছাত্রীকে কলেজ থেকে বের করে দিল রাজউক অধ্যক্ষ


শুধু বোরকা পরার কারণে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার গোলাম হোসেন সরকার কলেজ অঙ্গন থেকে বের করে দিলেন দীর্ঘ দিন ধরে পরে আসা কলেজের এক ছাত্রীকে। বোরকা পরা বাকিদেরও সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। এ ঘটনার পর গতকাল নয়া দিগন-কে অধ্যক্ষ বলেন, ‘স্কুলের একটা ড্রেস কোড আছে। এটা সবাইকে মানতে হবে। এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বোরকা অ্যালাউ করা সম্ভব নয়।’

সে লম্বা বোরকাকে ‘অড’ বা দৃষ্টিকটু ড্রেস হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, ‘একটি মেয়ে এ বিষয়ে জোরালো আপত্তি করেছে, সে পায়ের নখ পর্যন- বোরকা পরে এসেছে, এটি দৃষ্টিকটু। তার বোন এসেছিল সাথে- খুব গোঁড়া। সে বলছে, তার বোন বোরকা পরে আসবে। আমরা এটি অ্যালাউ করতে পারি না। তাই তাকে ক্লাসে ঢুকতে দেয়া হয়নি।’
রাজউক কলেজে বোরকা পরে আসতে অধ্যক্ষ ছাত্রীদের গত মঙ্গলবার সকালেই ডেকে নিয়ে বারণ করেছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, বোরকা ছাড়াই রাজউকে ক্লাস করতে হবে; নইলে যেন তাদের কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেয়া হয়, সে জন্য কলেজ গার্ডদের ডেকে নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ।
খবরটি অভিভাবকদের পক্ষ থেকে জানানো হলে গতকাল সকাল ৭টায় গিয়ে দেখা যায়, স্কুল গেট দিয়ে সবাই ঢুকছেন, এমনকি বোরকা পরা পাঁচ ছাত্রীও ঢুকেছিলেন। তবে কলেজের মেইন বিল্ডিংয়ে ঢোকার আগে তাদের থামিয়ে দেন কয়েকজন শিক্ষক। বোরকা পরা ছাত্রীদের সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন নয়া দিগন্তের সিনিয়র আলোকচিত্রী নাসিম শিকদার।
তিনি কেন ছবি তুলেছেন- সে জন্য তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় সেখানে। পরে তিনি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে আসেন। ভেতরে থাকা অভিভাবকেরা জানান, ঘণ্টাখানেক ছাত্রীদের সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, পরে অধ্যক্ষ জানতে পারেন কলেজে সাংবাদিক এসেছেন। তাই তিনি কিছুটা নমনীয় হন। যারা কোটের মতো হাফ বোরকা পরে এসেছেন তাদের ক্লাসের অনুমতি দেয়া হয়। পরে অবশ্য অধ্যক্ষ নিজেও নয়া দিগন্তকে তাই জানান। শর্ত দেয়া হয়েছে, তাদের বোরকার রঙ যেন কলেজের কামিজের রঙের হয়। সে শর্ত মেনে নিয়েই ওই ছাত্রীরা ক্লাসে যান।
অন্য একজন অভিভাবক নয়া দিগন-কে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে এটি মেনেই এসেছি যে, যদি কলেজ অধ্যক্ষ বোরকা অ্যালাউ না করেন তাহলে আমরা টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) নিয়ে যাব।’
তিনি বলেন, ‘ভর্তির সময় এ রকম বিধান থাকলে তিনি তার পোষ্যকে এখানে ভর্তি করাতেন না। এখন হঠাৎ করে এমন একটি নিয়ম করায় তারা বিপাকেই পড়েছেন।’
অন্য একজন অভিভাবক বলেন, ‘তার মেয়ে বোরকা পরে এ কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছে কৃতিত্বের সাথে। এর মধ্যে দুইজন এ কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের অনুমতি নিয়েই মেয়েটি পাঁচ বছর এই স্কুল ও কলেজে বোরকা নিয়েই পড়েছে। হঠাৎ করে বর্তমান অধ্যক্ষ স্পর্শকাতর একটি ধর্মীয় বিধান অনুসরণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাইছেন। রাজউক কলেজ বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছতে অতীতের যেসব অধ্যক্ষের অনন্য অবদান রয়েছে তারা যা করেননি বর্তমান অধ্যক্ষ তা করে সরকারের জন্যই বিব্রত অবস’া সৃষ্টি করতে চাইছেন।’
কলেজ অধ্যক্ষের শর্তে রাজি না হয়ে ক্লাসে ঢুকতে পারেননি সুমাইয়া ইসলাম। সুমাইয়া তার বোন নাসরিন ইসলামের সাথে বের হয়ে আসেন। কলেজের মেইন গেটের বাইরে তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘এটি মেনে নেয়া যায় না। এত দিন ধরে ক্লাস করে আসছি কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। এখন হঠাৎ করে কেন এমন সমস্যা হতে যাবে?’
তার এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই অধ্যক্ষের কাছেও। তবে সামনের ভর্তি মওসুমে তারা বোরকা পরে কলেজে আসা যাবে না এমন শর্তারোপ করে নির্দেশনা জারি করবেন বলে জানান।
অধ্যক্ষের সাথে সুমাইয়ার বড় বোন নাসরিনের কথা হয়েছে। নাসরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী। তিনি নয়া দিগন-কে বলেন, ‘আমরা কার আদেশ মানব? আল্লাহর নাকি প্রিন্সিপালের? আল্লাহ মেয়েদের পর্দা করতে বলেছেন, অধ্যক্ষ বলছেন তা অ্যালাউ করা হবে না। এখানে আগে এসব বাড়াবাড়ির কিছুই ছিল না। এখন নতুন করে এসব বিধান করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইসলাম নিছক ধর্ম নয়, এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের একটা ব্যবস’া। আল্লাহ যেভাবে চলতে বলেছেন, আরেকজন তাতে বাধা দিলে কেন তা মানতে হবে? আমরা কোনো রকমের আপসে যেতে চাইনি। প্রয়োজনে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) নিয়ে নেব। তবুও এ অন্যায় আদেশ আমরা মানব না।’
অধ্যক্ষ নয়া দিগন-কে বলেন, ‘হ্যাঁ এটি ঠিক যে আমরা ভর্তির সময় এটি বলিনি। তবে এটি তো মানবেন যে শিক্ষার্থীদের ড্রেস কোড মেনে চলতে হবে। আমরা শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট মাপের বোরকার অনুমতি দিয়েছি। পায়ের নখ পর্যন্ত বোরকার অনুমতি দেয়া সম্ভব নয়। এখানে তারা পিটি প্যারেড করে, সবাই এক রকম ড্রেস পরে থাকে আর বাকি কয়েকজন ভিন্ন ড্রেস পরবে, এটি দৃষ্টিকটু। আমরা তাই এটি গ্রহণ করছি না।’
অধ্যক্ষের বক্তব্য প্রসঙ্গে একজন অভিভাবক বলেন, ধর্মীয় নিয়ম ও অনুভূতির প্রতি সম্মান সব দেশে করা হয়। শিখরা ভারতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সে দেশের সেনাবাহিনীতেও ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী পাগড়ি পরতে তাদের বাধা দেয়া হয় না। বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভান্তেরা তাদের ধর্মীয় পোশাক পরেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। রাজউক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বোরকা পরায় কোনো ছাত্রীকে বের করে দেয়ার দৃষ্টান্ত নেই। আগের অধ্যক্ষেরা যা করেননি বর্তমান অধ্যক্ষ তেমন একটি দৃষ্টান্ত কাকে খুশি করার জন্য স’াপন করতে এত আগ্রহী হয়ে উঠলেন তা সেই ভালো বলতে পারবেন।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+