ভারতে গরুর গোশত খাওয়ার অপবাদে খুন: গ্রাম ছাড়ছে মুসলিম পরিবারগুলো


ভারতের উত্তর প্রদেশের গ্রেটার নয়ডার দাদরি এলাকার বিসাহড়া গ্রামে গরুর গোশত খাওয়া এবং তা বাসায় রাখার অপবাদ দিয়ে এক মুসলিম বৃদ্ধকে পাথর দিয়ে মাথা থেতলিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার পর এখন আতঙ্কে অনেক মুসলিম পরিবার ওই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এরইমধ্যে ৮টি মুসলিম পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা গত ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযিম (সোমবার) রাতে গরুর গোশত খাওয়া এবং তা বাসায় রেখে দেয়ার অপবাদ দিয়ে মুহাম্মদ আখলাক (৫৮) নামে এক ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। তার ২২ বছর বয়সী ছেলে দানিশকেও আধমরা করে ফেলে রেখে যায় তারা। বর্তমানে ওই যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।

উগ্র ওই দুর্বৃত্তরা বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাড়ির মহিলা এবং মেয়েদেরকেও মারধর করে। এ ঘটনার পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার মুসলিমদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়ায় তারা গ্রাম ছাড়তে শুরু করেছে। নিহত আখলাকের পরিবারও ওই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই গ্রামে অবশ্য পুলিশ, পিএসি এবং আরআরএফ জওয়ান মোতায়েন থাকলেও তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না সেখানকার মুসলিম পরিবার। প্রশাসন অবশ্য সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সমস্ত অপরাধীদের গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছে।
নিহত মুহম্মদ আখলাকের ৭০ বছর বয়সী মা আসগারী জানায়, ‘আমার ছেলে মারা গেছে। আমরা বড় নাতি হাসপাতালে বাঁচার লড়াই করছে। পুলিশ কিছু সময়ের জন্য আমাদের নিরাপত্তা দিলেও গ্রামে সব সময়ের জন্য তারা থাকতে পারবে না। আমাদের খুব ভয় করছে। মনে হচ্ছে এরকম হামলা আবারো হবে। আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং এই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও নিরাপদ জায়গায় চেষ্টা করছি।’
ওই গ্রামের বাসিন্দা ইলিয়াস জানান, ‘এই গ্রাম আমাদের বাড়ি। কিন্তু এখন আমরা নিজেদের বাড়িতেই ভয়ের মধ্যে রয়েছি। আমরা এত আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে পারব না। কিছু মুসলিম পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলেও গেছে। কেউ আমাদের বাসায় আসতে চাচ্ছে না এবং আমাদের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগামী দিনে এই গ্রামে শান্তি এবং সম্প্রীতি ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম বলেই মনে হচ্ছে।’
বিসাহড়া গ্রামের রহীসউদ্দিন, সাত্তার, মুস্তাক, নিসার, সেলিম খাঁ, সিরাজউদ্দিন, গফফার প্রমুখরা এরইমধ্যে বাসায় তালা লাগিয়ে সপরিবারে অন্যত্র চলে গেছেন।
জেলা প্রশাসক রাজেশ যাদব বলেছে, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য রাজ্য সরকারের সমবেদনা রয়েছে। আমরা তাদের আশ্বাস দিয়েছি ভয় পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ওদের বাড়ির পাশেই পুলিশ মোতায়েন করা হবে। আমি আমার ব্যক্তিগত নম্বর দিয়েছি যাতে কোনো অসুবিধা হওয়া মাত্রই তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।’
এদিকে, এ ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর প্রদেশের শহর উন্নয়ন মন্ত্রী আজম খান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করে বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তার কর্মীদের থামানো উচিত।’
আজম খান বলেন, ‘জীবন, রাজনীতি এবং পদের ক্ষমতা সব সময় থাকে না। কিন্তু দুর্নাম সব সময় থেকে যায়। এখনো আপনার গায়ে ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার দাগ রয়েছে এবং এই দাগ থেকেই যাবে। আপনি আপনার কর্মীদের এ রকম কাজ থেকে বিরত করুন।’
কংগ্রেস মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলেছে, ‘এ ধরণের রাজনীতির ফলে ঘৃণার আবহ তৈরি হচ্ছে। বিহার নির্বাচনের আগে ঘৃণার রাজনীতি আরো বাড়বে। কেন্দ্র এখনো চুপ কেন?’
সিপিএম-এর পলিটব্যুরোর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যারা এ ধরণের পরিকল্পিত হামলার সঙ্গে যুক্ত তাদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
পলিটব্যুরো বলেছে, ‘গরু জবাই এবং গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো একনাগাড়ে যে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এই ভয়ংকর ঘটনা তারই পরিণতি।’
দলটি বলছে, এই ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির ‘আচ্ছে দিন’-এ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কিভাবে লাগাতর অসহিষ্ণুতা বাড়াচ্ছে। এক ব্যক্তি, পরিবার বা একটি জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে উত্তেজনা এবং সহিংসতা ছড়ানো হচ্ছে। বহুল প্রচারিত ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে পুলিশ গোশতের বাটি নিয়ে যাচ্ছে ফারেন্সিক পরীক্ষার জন্য!
এদিকে, নিহত আখলাকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা এবং আখলাকের আহত ছেলে দানীশের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা সাহায্য দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+