ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে


ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে : ট্রেনে মুসলমানদের খুঁজে বের করে শহীদ করা হয় : ত্রাণশিবিরে ঈদ করলেন আসামের মুসলমানরা

ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আসামে মুসলিম নিধনের মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি আসামের মুসলমানদের বাংলাদেশী অভিবাসী আখ্যায়িত করে ভারতীয় সমাজের চাপা মুসলিম বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ সংলগ্ন আসাম রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা দিনদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গতকালও দক্ষিণ আসামের ধুবড়ি জেলার বাংলাদেশ সংলগ্ন কোকরাঝাড় এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী বোড়ো সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই মুসলিম নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। গত শনিবার হিন্দু সন্ত্রাসীরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসামগামী ট্রেনের বেশ কয়েকজন মুসলমান যাত্রীকে খুঁজে বের করে নির্যাতন চালায় এবং তাদের ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। এ সময় অন্তত চারজন মুসলমানকে শহীদ করা হয়।
২০০২ সালে ভারতের গুজরাট রাজ্যে অন্তত ৩ হাজার নিরীহ মুসলিম নর-নারীকে অকল্পনীয় পৈশাচিকতার সঙ্গে হত্যা করা হয়। এরপর গত কয়েক বছরে ভারতে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না ঘটলেও এবার আসামের পরিস্থিতিও সম্ভবত গুজরাটের মতোই বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। আসাম রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গায় সরকারি হিসাবেই অন্তত ৮০ জন নিহত এবং ৪ লাখেরও বেশি লোক উদ্বাস্তু হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। আক্রান্তদের বেশিরভাগই মুসলমান।

ট্রেনে মুসলমানদের খুঁজে বের করে মারা হয় : বিবিসি জানায়, শনিবার গভীর রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে বিশেষ ট্রেনে যাওয়ার সময় যে ১৪ জন মুসলমানের ওপরে হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ বা রেল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু না জানালেও আহত এক ব্যক্তির পরিবার বিবিসি বাংলাকে সেই ঘটনার বিবরণ জানিয়েছেন।
ব্যাঙ্গালোরে বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করতেন হাইলকান্দির বাসিন্দা ২২ বছরের শাহজাহান আহমেদ চৌধুরী। তার বড় ভাই জিলান আহমেদ চৌধুরী টেলিফোনে শাহজাহানের কাছ থেকে ঘটনার যে বিবরণ জানতে পেরেছেন সেটাই তিনি জানিয়ে বলেছেন, ‘ব্যাঙ্গালোর থেকে একই ট্রেনে আসছিল যারা-তারা খুঁজে খুঁজে মুসলমানদের বার করে।’
নিজের গ্রাম হাইলাকান্দি থেকে দেয়া এই সাক্ষাত্কারে জিলান আহমেদ চৌধুরী বলেন, ট্রেনে হামলাকারীরা প্রত্যেকের পরিচয়পত্র দেখতে চায়। তারপর বগির সব দরজা বন্ধ করে মুসলমান যাত্রীদের মারধর শুরু করে। মোবাইল ফোন, টাকাপয়সাসহ সব কেড়ে নেয়া হয়। যারা মারছিল, তারা সংখ্যায় প্রায় ৪০-৪৫ জন । লোহার রড দিয়ে মারা হয়, চাকুর কোপও দেয়া হয়।’
আসামের দাঙ্গার পর ভারতের অন্যান্য রাজ্যে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বী অসমিয়াদের ওপরে হামলা হতে পারে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাঙ্গালোর থেকে আসামগামী একটি বিশেষ ট্রেন থেকে আসামের হাইলাকান্দি অঞ্চলের চারজন মুসলমানকে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয় শনিবার গভীর রাতে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, মৃতদেহগুলো গ্রামে পৌঁছেছে, সেগুলোর মুখ-মাথাতেও একই রকমের কাটা দাগ রয়েছে। তার ভাইয়ের বরাত দিয়ে জনাব চৌধুরী বলেন, প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা ধরে অত্যাচার চালানোর পর এক এক করে ওই যাত্রীদের চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা জলপাইগুড়ির বেলাকোবা ও ফালাকাটা এলাকায় ওই চারজন ছাড়াও অন্তত ১০ জনকে গুরুতর আঘাত করার পরে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়। আসামের পুলিশ জানিয়েছে, এরা সবাই মুসলমান। শনিবারের ঘটনায় আহতদের পাঁচজনকে গৌহাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে অন্য তিনজনের অবস্থা সঙ্কটজনক বলে হাইলাকান্দির পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ব্রজেনজিত্ সিংহ জানিয়েছে।
ওদিকে ব্যাঙ্গালোর থেকে ট্রেনে আসছিলেন এ রকম এক যুবক এখনও নিখোঁজ বলে তার পরিবার জানিয়েছে। অন্য সহযাত্রীরা বলতে পারছেন না যে ট্রেনে মারধর শুরু হওয়ার পর জাকির হুসেন নামের ওই যুবকের কী হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আহত ও নিহতদের তালিকায় ওই যুবকের নাম নেই, তারাও খোঁজ চালাচ্ছে।

ত্রাণশিবিরে ঈদ করল আসামের মুসলমানরা : বিবিসি জানায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে সোমবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঈদ পালন করেছেন হাজার হাজার মুসলমান, যারা সাম্প্রতিক জাতিগত দাঙ্গার পর ত্রাণশিবিরগুলোয় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

মুম্বাই সহিংসতার দায় বাংলাদেশীদের—হিন্দুত্ববাদী নেতার মন্তব্য : ভারতের মুম্বাইয়ে ১১ আগস্টের সহিংসতার পেছনে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীরা দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন মহারাষ্ট্রের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন নবনির্মাণ সেনাপ্রধান রাজ ঠাকরে। মঙ্গলবার সে এ অভিযোগ করে বলে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে।
মিয়ানমার ও আসামে মুসলমানদের ওপর নৃশংসতার প্রতিবাদে ১১ আগস্ট ভারতের মুম্বাইয়ে মুসলিম সম্প্রদায় একটি সমাবেশ করে। সমাবেশের সময় পুলিশের সঙ্গে সহিংসতায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়। ওই কর্মসূচির পাল্টা জবাব হিসেবে রাজ ঠাকরে গতকাল মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দানে সমাবেশ করে।
অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ কেবল সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তবে রাজ ঠাকরে ৫০ হাজারেরও বেশি জনতাকে নিয়ে মিছিল করে মেরিন ড্রাইভ থেকে আজাদ ময়দানে যায়। পরে সেখানে তিনি সমাবেশ করেন। এ সময় দক্ষিণ মুম্বাই অচল হয়ে পড়ে।
সমাবেশে রাজ ঠাকরে জানায়, ১১ আগস্টের সহিংসতার পেছনে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সে আরও জানায়, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী মুম্বাইকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
মুসলমানদের সমাবেশের সময় সহিংসতার সমালোচনা করে রাজ ঠাকরে আরও জানায়, ‘সবকিছুর সীমা থাকা উচিত। সে সীমা কারোরই অতিক্রম করা উচিত নয়। পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের ওপর কোনো ধরনের শারীরিক হামলা করা উচিত নয়। এ ধরনের ঘটনা যখনই ঘটবে, আমার সমর্থন থাকবে পুলিশের পক্ষে। তার এ বক্তব্যের পর একজন পুলিশ সদস্য স্টেজে উঠে রাজ ঠাকরেকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানায়। (নাউযুবিল্লাহ)

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+