ভারত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে এবং সংস্কৃতির নামে বিবস্ত্র দেহ-প্রদর্শনী করে চলছে।অতিসত্বর এর অবসান হওয়া দরকার।


দেশে একশ্রেণীর মানুষের হাতে কত টাকা আছে? গত বেশ কয়েকদিন ধরে একটি বিজ্ঞাপন বড় আকারে পত্রিকাগুলোর দর্শনীয় স্থান দখল করে নিচ্ছে। বলা হচ্ছে কনসার্টের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে টিকিটের মূল্য প্লাটিনাম- বিশ হাজার টাকা, গোল্ড- পাঁচ হাজার টাকা, সিলভার- তিন হাজার টাকা ও গ্যালারী- দুই হাজার টাকা।
গতকালের পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ভাষাটি ছিল নিম্মরূপ: “ভারতীয় জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও উপমহাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে আজ সন্ধ্যায় ঢাকায় আসছে। সে আগামী ৯ মার্চ ঢাকায় একটি কনসার্টে গান গাইবে। আশা ভোঁসলেসহ ওই কনসার্টে আরও গান পরিবেশন করবে বিখ্যাত ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী সুদেশ ভোঁসলে। কনসার্টে উপমহাদেশের আরেক প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী রুনা লায়লা আশা ভোঁসলের সঙ্গে একটি গান পরিবেশন করবে। প্রথমবারের মতো ঢাকার মাটিতে এই দুই জীবন্ত কিংবদন্তি গায়িকা একই মঞ্চে গাইবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ম্যাকম’ এর আয়োজন করছে। ‘ইটার্নাল আশা লাইভ ইন ঢাকা’ শিরোনামে এ কনসার্টের আয়োজন হবে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে।”
বলাবাহুল্য যথারীতি এই আর্মি স্টেডিয়ামে পুরো হবে। সেখানে পাঁচ হাজার লোকেরও যদি সমাবেশ হয় তাহলে দুই হাজার টাকার টিকিটে ব্যয় হবে দশ কোটি টাকা। আর বিশ হাজার টিকিট প্লাটিনাম, পাঁচ হাজার টিকিট গোল্ডের দাম ধরলে এ খরচ আরো বেশী।
এসব খবর যা প্রতিভাত করছে সে একশ্রেণীর লোকের হাতে এত টাকা যে প্লাটিনাম নাম টিকিটের সুবাদে ঘণ্টায় বিশ হাজার টাকা ব্যয় করাও তাদের জন্য নস্যি। অথচ এই দেশেই পত্রিকার পাতায় প্রায়ই খবর উঠে যে মাত্র হাজার টাকার দেনায়ও অনেক অভাবী মানুষ আত্মহত্যা করে। ছয় হাজার টাকার দেনায় কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হয়, পাঁচ হাজার টাকার দেনায় এনজিও কর্মীরা ঘরের টিন খুলে নিয়ে যায় ইত্যাদি লক্ষ-কোটি জাজ্বল্য উদাহরণ। বিষয়টি প্রতিভাত করছে যে দেশের সিংহভাগ মানুষ প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পরও মাত্র হাজার টাকা বা পাঁচ হাজার টাকা যোগাড় করতে পারছে না। অপরদিকে ঘণ্টায় বিশ হাজার টাকা ব্যয় করতেও একশ্রেণীর লোক কুণ্ঠাবোধ করছে না। তাদের হাতে হাজার থেকে লক্ষ-কোটি টাকাও বিদ্যমান।
প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এ বিশাল বৈষম্য? ধনী গরিবে পাহাড় সম ফারাক! মানুষে-মানুষে চরম বিভেদ! ধনীদের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিত্তবিলাস আর গরিবদের বেলায় সরকারের নিরেট গাফলতি আর চরম উদাসীনতা!
রাষ্ট্রযন্ত্র এর দায়ভার এড়াতে পারে কীভাবে?
সরকার প্রধান এর জবাবদিহিতা অস্বীকার করে কিভাবে?
স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার মূল্য তাহলে থাকে কোথায়?
স্বাধীনতার সুফল মানুষ পায় কোথায়?
মূলত: সব কিছুর মূলে দুর্নীতি।
দুর্নীতি না হলে মানুষে মানুষে এভাবে বৈষম্য গড়ে উঠতে পারেনা।
ধনী-গরিবে বিস্তর বৈষম্য তৈরি হতে পারেনা।
আর এ দুর্নীতিকে দীর্ঘায়িত করছে সংস্কৃতির নামে দেহ-বাণিজ্য। এবং এই দেহ-বাণিজ্য ভারত একচেটিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের দেহ-বাণিজ্যের খপ্পরে পড়ছে বাংলাদেশসহ প্রায় সব মুসলিম দেশ। এমনকি ভারতেও এই দেহ-বাণিজ্যের জয়-জয়কার। ভারতে দেহ বাণিজ্য কত তুঙ্গে তার একটি উদাহরণ ইন্টারনেটের এক হেডিং-এ। এতে বলা হয়েছে “১০ মিনিটেই এক কোটি।”
খবরে বলা হয় : “অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে মাত্র ১০ মিনিট র‌্যাম্পে হাঁটার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে এক কোটি রুপির প্রস্তাব পেয়েছে ক্যাটরিনা কাইফ। কালক্ষেপণ না করে সেও প্রস্তাবটি লুফে নেয়। সম্প্রতি কোচির একটি ফ্যাশন শোতে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য অংশ নিতে অনুরোধ জানানো হয় হালের এই বলিউড সেনসেশনকে। এর বিনিময়ে ক্যাটরিনাকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দেয়ার ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ।”
মূলত: দেহ-প্রদর্শনী তথা দেহ-বাণিজ্য মানুষকে মনুষত্বের অনুভূতি থেকে ভোগবাদী পশুতে পরিণত করে। মানুষে মানুষে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতার বিপরীতে প্রত্যেকটা মানুষ তখন হয় একটা ভোগবাদী পশুতে। বাইরের খোলসটা থাকে সংস্কৃতির নামে। কিন্তু ভেতরে থাকে পশুবৎ প্রবণতা। নারী-দেহ তখন পণ্যের মতো বিক্রি হয়। নারী দেহ প্রদর্শনী তখন লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। (নাঊযুবিল্লাহ!)
ইদানীংকালে শাহরুখ খানসহ ভারতীয় নায়ক-নায়িকারা কনসার্টের নামে তাদের বিবস্ত্রপনা ও বেহায়াপনার মাধ্যমে এ বিষয়টিই স্পষ্ট করে তুলেছে।
মূলত: ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে তিন হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর প্রোফাইল ঘেটে জানা গেছে, যে দেশটি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য রক্ত দিয়েছে, সে দেশের নতুন প্রজন্মের প্রিয় সিনেমার তালিকায় হিন্দির আধিপত্য। একই সাথে প্রিয় টিভি শোয়ের জায়গায় দু’চারজন বাদে সবারই প্রিয় ভারতীয় টিভি চ্যানেলে সিরিয়াল ও রিয়্যালিটি শো। আর এর সুবাদে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ভারতীয় শিল্পীদের নিয়ে বাণিজ্য। তাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের।
দেশে বর্তমান সরকারের সময় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভারতীয় শিল্পী এসেছে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে যে কনসার্টের আয়োজন করা হয় সেখানেও ছিল ভারতীয় শিল্পীদের আধিপত্য। এর দুই মাসের মাথায় ভারতীয় শিল্পীদের এক দিনে দু’টি অনুষ্ঠান হয়েছে ঢাকায়। অতি সম্প্রতি বিপিএল-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, শুধু ২০০৯ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক ভারতীয় শিল্পী এসেছে। সে জন্য তাদের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ শত কোটি টাকা। এ অর্থের জোগান হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর এবং দর্শকদের কাছে টিকিট বিক্রি থেকে। সাধারণ দর্শকের জন্য এসব আয়োজনের বাইরেও নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সমিতি বিকেএমইএ, তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি বিজিএমইএ, টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলোতে ভারত থেকে শিল্পী নিয়ে আসে। এসব অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পর্যন্ত ভারত থেকে এসেছে। ভারতীয় মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোম্যাক্সের উদ্বোধন করতেও ঢাকায় এসেছিল একজন বলিউড অভিনেত্রী।
বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। অথচ তাদের প্রায় সব টিভি চ্যানেলই টাকা দিয়ে দেখে বাংলাদেশ। একই সাথে সে দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন। এর মধ্য দিয়ে এদেশে ভারতের একটি বড় বাজার তৈরি হচ্ছে।
ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে বাংলাদেশে টেলিভিশনের দর্শক ৯ কোটি ১২ লাখের মতো। এসব দর্শকের বয়স ১৫ বছরের উপরে, শিশুদের যাদের বয়স ১৪-এর নিচে তাদের হিসাব নিলে দর্শক সংখ্যা ১১ কোটির মতো হতে পারে। এ দর্শকরা তাদের সময় ব্যয় করে হিন্দি চ্যানেলের পেছনে।
এতে পে করতে হয় হাজার কোটি টাকা। দেশে ২৭২টির মতো চ্যানেল দেখা যায় বলে ক্যাবল টিভি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এসব চ্যানেলের প্রায় সবই ভারতীয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চ্যানেল এইচবিও এখন ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে এর জন্য পেমেন্টও সেখানে করতে হয়।
মূলত: কী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, কী রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অথবা দেশে ৯৭ ভাগ মুসলমানের অবস্থান কোনো প্রেক্ষিত থেকেই এদেশে এভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলতে পারেনা। চলতে পারেনা সংস্কৃতির নামে নারীদেহ প্রদর্শনী অথবা নারীদেহ ব্যবসা। চলতে পারেনা ভোগবাদীদের বিত্তবিলাস। থাকতে পারেনা ধনী-গরিবে বিশাল বৈষম্য। সুষম বণ্টনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুফল সবার হাতে তুলে দেয়াই রাষ্ট্রযন্ত্রের একান্ত কর্তব্য। মূলতঃ এসব অনুভূতি ও দায়িত্ববোধ আসে ইসলামী অনুভূতি ও প্রজ্ঞা থেকে।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+