ভূগোল বিজ্ঞানে মুসলিম ভূগোলবিদদের অবদান (১ম অংশ)


৭৩২ হিজরী (১৩৩২ ঈসায়ী) সালে ঐতিহাসিক আবুল খিদার তার কিতাবে উল্লেখ করেন যে, আল বিরুনী সর্বপ্রথম বেরিং প্রণালী আবিষ্কার করেন। তিনি ৪র্থ হিজরী শতকে ভারত ভ্রমন করেছিলেন। তিনি সেখানে অনেক বছর অবস্থান করেন এবং সাংস্কৃতি ভাষা শিখেন। তার ভারত নিয়ে রচিত “করঃধন-ধষ-ঐরঢ়ষপষ” এর জন্য তাকে ভু-গণিত বিদ্যার জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি সূর্যের উচ্চতার মাধ্যমে খোয়াজাম এলাকা অক্ষাংশ নির্ণয় করেন। তিনি দক্ষিন ও উত্তর দিক নির্ণয়ের ৭টি উপায় বের করেন। তিনি গাণিতিক কৌশল প্রয়োগ করে ঋতু শুরুর প্রকৃত সময় নির্ণয় করেন। তিনি অ্যাস্ট্রোলোব ও সমুদ্রের পাড়ের পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবী পরিধি নির্ণয় করেন। তার জটিল ভু-গানিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন ৬৩৩৯.৯ কিমি আর আধুনিক পরিধি হচ্ছে ৬৩৫৬.৭ কিমি। এই পদ্ধতি বর্তমানে আল বিরুনী ল’ নামে পরিচিত।

আল বাকরী (হিজরী ৪০৪-৪৮৭, ঈসায়ী ১০১৪-১০৯৪):
তিনি ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপ সম্পর্কে বর্ণনা করেন। তার রচিত “মুজাম মা ইস্তাজাম” নামক কিতাবে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন স্থানের নামের তালিকা রয়েছে।তার অন্য কিতাব “কিতাব আল মাসালিক ওয়াল মামালিক” ৪৬০ হিজরী (১০৬৮ ঈসায়ী) সালে প্রকাশিত হয়।

ইবনে জুবায়ের (হিজরী ৫৩৯-৬১৩, ঈসায়ী ১১৪৫-১২১৭):
তিনি স্পেনিশ মুসলিম নাবিক। তিনি ৫৮৮ হিজরী (ঈসায়ী ১১৯২) সালে মক্কা শরীফ ও ইরাক ভ্রমন করেন। তিনি একটি ভ্রমন কাহিনী লিখেন যার নাম “রিহলাত-উল-কিনানী।

আল কাযউইনী (হিজরী ৫৯৯-৬৮১, ঈসায়ী ১২০৩-১২৮৩):
তিনি “আযাইবুল মাখলুক্বাত ওয়াল ঘারাইব-উল-মাওজুদাত” নামক কিতাব রচনা করেন যাতে ংুংঃবসধঃরপ পড়ংসড়মৎধঢ়যরপধষ কাজ রয়েছে। তিনি “আতিযাব-উল-বিলাদ-ওয়া-দখবার-উলবাদ” (অ ঃরুধা-ঁষ-ইরষধফ- ধি-ফশযনধৎ-ঁষওনধফ) কিতাবে পৃথিবীকে সাতটি পষরসধঃরপ অঞ্চলে ভাগ করেন। তার এই বইতে পষরসধঃরপ অঞ্চল, দৈহিক গঠন, জীবন ব্যবস্থা এবং ইতিহাস বর্ণিত আছে। তিনি “আথার আল বিলাদ ওয়া আকবার আল ইবাদ” নামে একটি ভূগোল বিষয়ক ডিকশনারী লিখেন।

আল কাযউইনী অংকিত পৃথিবীর মানচিত্র

আল কাযউইনী অংকিত পৃথিবীর মানচিত্র যার দক্ষিণ ভাগ উপরে অবস্থিত

ইবনে বতুতা (হিজরী ৭০৩-৭৭০, ঈসায়ী ১৩০৪-১৩৬৯):
তিনি ৮ম হিজরী (১৪দশ ঈসায়ী) শতকে ২০ বছর বয়সে ভ্রমনে বের হয়ে ৫১ বছর বয়সে মোট ৩১ বছর ভ্রমন করেন। তিনি ৭৫০০০ মাইল ভ্রমন করে যা পৃথিবীকে ৩ বার ভ্রমনের সমান দুরুত্ব। তিনি টেংলারস থেকে ভ্রমন শুরু করে মিশর, আবিসিনিয়া, উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা ভ্রমন করেন। তিনি সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করে ঞরসনঁশঃড়ড় পৌছেন। তিনি ইউরোপের স্পেন, রোম রাজ্য, দক্ষিন রাশিয়া, গবফরঃবৎৎধহবধহ এবং মৃত সাগর ভ্রমন করেন। তিনি জীবনে চার বার হজ্ব করেছেন। তিনি পার্শিয়া, তুর্কিস্থান, আফগানিস্থান, ভারত, মালদ্বীপ, সিলোন, পূর্ব ভারত, ইন্দো-চীন এবং চীন ভ্রমন করেন। তিনি সাইবেরিয়ার ংযড়ৎঃহবংং ড়ভ ংঁসসবৎ হরমযঃং দেখতে যান এবং অন্ধকারচ্ছন্ন এলাকার বর্ণনা করেন। তাঁর ৭৫০০০ মাইল পৃথিবী পরিভ্রমনে যে সব স্থানে গিয়েছিলেন তার তালিকা-
(১) মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনেশিয়া
(২) লিবিয়া (ত্রিপলী)
(৩) মামলুক রাজ্য: মিশর, আলজান্দ্রিয়া, জেরুজালেম, বেথেলহাম, হেবরন, দামেস্ক, লাটাকিয়া, সিরিয়া
(৪) আরবীয় উপদ্বীপ: মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ, জেদ্দা, বাবিগ, ওমান, দোহার, বাহরাইন, আল হাসা, হরমুজ, ইয়েমেন, কাতিফ।
(৫) স্পেন: গ্রানাডা ও ভেলেনচিয়া
(৬) বাইজেন্টাইন রাজ্য ও পূর্ব ইউরোপ: কনওয়া (তুরস্কের শহর), এন্টালা (তুরস্কের শহর), বুলগেরিয়া, আযব (রাশিয়ান শহর), কাযান (রাশিয়ান শহর), ভল্গা নদী, কনস্টেন্টিনেপল।
(৭)মধ্য এশিয়া: খোয়ারজম ও খোরাসান (বর্তমান উজবেকিস্থান, তাজাকিস্থান, বেলুচিস্থান রাজ্য এবং আফগানিস্থান), বুখারা সামারখন্দ, পস্তুন।
(৮) দক্ষিন এশিয়া: পঞ্জাব, সিন্ধু, মুলতান, দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, হান্সী, কনকান বন্দর, মালাবার, বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ, ও পশ্চিম বঙ্গ), বহ্মপুত্র নদ, মেঘনা নদী, সিলেট।
(৯) চীন, বার্মা (বর্তমান মায়েনমার), মালদ্বীপ, শ্রীলংকা (তৎকালীন শ্রীদ্বীপ), সুমাত্রা (ইন্দোনেশিয়া), মালয় উপদ্বীপ, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, সোহালী বন্দর, মালী (পশ্চিম আফ্রিকা), মৌরিতানিয়া।

ইবনে খালদুন (হিজরী ৭৩২-৮০৮, ঈসায়ী ১৩৩২-১৪০৬):
তিনি লোহিত সাগর দৈর্ঘ্য ১৪০০ মাইল হিসেবে বর্ণনা করেন। বর্তমান মানচিত্রে তা ১৩১০ মাইল হিসেবে উল্লেখ আছে। (সিভিলাইজেশন অব এরাবিয়াঃ মসিয়েঁ লেপে। সুত্র, আরব নৌবহর, পৃষ্ঠা-৩৫-৩৬)
পিরি রেইস (ইন্তেকাল হিজরী ৯৬০, ঈসায়ী ১৫৫৩):
তিনি তার রচিত “কিতাব-ই-বাহরিয়্যা” নামক কিতাবে ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শহরের নির্ভূল বর্ণনা করেছেন। তার প্রথম মানচিত্র ৯১৮ হিজরী (১৫১২ ঈসায়ী) সালে তৈরী করা যা ১৩৪৭ হিজরী (১৯২৮ ঈসায়ী) সালে ইস্তাম্বুলে আবিষ্কৃত হয়। হিজরী ৯৩৪ (ঈসায়ী ১৫২৮) সালে তিনি দ্বিতীয় মানচিত্র অংকন করেন যাতে গ্রীন ল্যান্ড ও পশিম আমেরিকার কিছু অঞ্চল রয়েছে।

৯১৯ হিজরীর মুহররম মাস (১৫১৩ ঈসায়ী) সালে পীরী রেইজের গেজেলের চামড়ায় অংকিত প্রথম মানচিত্রের বাম অংশ যাতে আমেরিকা মহাদেশের মানচিত্র রয়েছে। বর্তমানে মানচিত্রটি ইস্তাম্বুলের টপকাপি যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
পীরী রেইজ অংকিত ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ আফ্রিকার মানচিত্র
১৫২৮ সালে অংকিত মানচিত্র যাতে গ্রীনল্যান্ড, দক্ষিণ আমেরিকার ফ্লোরিডা, কিউবা ও কেন্দ্রীয় আমেরিকার অংশ রয়েছে

পীরী রেইজ ও আধুনিক মানচিত্রের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার মানচিত্রের তুলনা

কিতাবী বাহরী” এ অংকিত কিরিতি (গ্রীসের একটি প্রদেশ) এর মানচিত্র
পীরী রেইজ অংকিত ভেনিসের মানচিত্র

সিসিলি (ভূমধ্য সাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ) –এর মানচিত্র

স্পেনের গ্রানাডা ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলের মানচিত্র

আলজির্য়াস ও তার সমুদ্র বন্দরের মানচিত্র
(২য় অংশে সমাপ্য)

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে