ভেজাল ঔষধ ??? চাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ…হবে কি???…….(2)


স্বাস্থ্য রক্ষা করাকে ইসলামে ফরয বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা খাছভাবে ফরয আর আমভাবে সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। তাই চিকিৎসা উপকরণ যেমন সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন তেমনি তা সঠিক হওয়াও একান্ত অনিবার্য। কিন’ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে দুটোই খুব দুরূহ।
রাজধানীসহ সারাদেশে বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জের হাটবাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নকল ওষুধ। এ নিয়ে প্রায়-ই পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও কোন প্রতিকার হচ্ছে না।
বাজার থেকে কমদামি ওষুধ কিনে, লেবেল পরিবর্তন করে দামি ওষুধে পরিণতকরণ, দেশীয় কোন নিম্নমানের ওষুধকে বিদেশী ব্র্যান্ডের ছাপানো প্যাকেটে ভরে চালিয়ে দেয়া হয়। কোন গুণ নেই এমন পাউডারকে বা পানীয় দ্রব্যকে কোন নামি-দামি কোম্পানির ওষুধের ব্র্যান্ডে বাজারজাত করা ইত্যাদি বহুবিধ প্রক্রিয়ায় নকল ওষুধ বাজারজাতকরণ হচ্ছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও লেবেল পাল্টিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এ ভেজাল ও নকল ওষুধে এখন দেশের বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছে এসব ওষুধ কিনে। রোগীকে তা সেবন করিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। উল্টো আরও জীবনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
বিদেশ থেকে চোরাই পথে নিম্নমানের ওষুধ আসছে অনেক। এক্ষেত্রে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি ক্রেতারাও ঠকছে। দেশের ওষুধের বাজারও হচ্ছে হুমকির সম্মুখীন।
কাগজে কলমে পরিবর্তন হলেও বাস্তবে কোন পরিবর্তন আসেনি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে। নতুন সাইনবোর্ড ও মহাপরিচালক নিয়েই অধিদফতরকে সন’ষ্ট থাকতে হচ্ছে। পরিদফতর থেকে অধিদফতরে পরিণত হওয়ার তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। ভেজাল ওষুধ খেয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। জনবলের অভাবে ৬ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পুরনো জনবলও কমতে কমতে একশ’ ত্রিশ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর পুরনো নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালার সংশোধন না হওয়ায় নতুন জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে রয়েছে। আগামী জুন মাস নাগাদ আরো কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। তখন জনবল সংখ্যা আরও হ্রাস পাবে।
দুর্নীতি আর অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে। দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যবসায়ীদের কাছে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ প্রশাসন অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (৯ এপ্রিল ২০০৭) ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ওষুধ প্রশাসনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে। ওই রিপোর্টে ২০০০ সালে ৮০টি, ২০০১ সালে ৩০টি, ২০০২ সালে ২৬টি, ২০০৩ সালে ২৮টি, ২০০৪ সালে ৪৫টি, ২০০৫ সালে ৮৯, ২০০৬ সালে ৬৭টি, ২০০৭ সালে ১১৩টি নিম্নমানের ওষুধ, সর্বমোট ৪৭৫টি ওষুধ নিম্নমানের ও ভেজাল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
রিপোর্টে আরো বলা হয় দেশে ২২৪টি অ্যালোপ্যাথিক, ২০৪টি আয়ুর্বেদিক, ২৯৫টি ইউনানী ও ৭৭টি হোমওপ্যাথিক কোম্পানির প্রসেসিং লাইসেন্স, মূল্য নির্ধারণ, লেভেল পারমিশন, ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু, ইনডেন্ট অনুমোদন, কাঁচামাল আমদানি, ব্লক লিস্ট অনুমোদনসহ প্রোজেক্ট প্রফাইলের তদারকি করে এই সিন্ডিকেট সদস্যরা কোটি কোটি টাকা আয় করে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয় ২৪৬টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে ১৭০টি ভুঁইফোড় কোম্পানি নিজেদের ইচ্ছামতো ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করে। এসব ওষুধের অধিকাংশ ভেজাল ও নিম্নমানের। তাছাড়া অসাধু কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় ওষুধ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্ধশত অসাধু ব্যবসায়ী নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ভুয়া ব্লকলিস্ট উপস্থাপন করে কাঁচামাল আমদানি করার মাধ্যমে খোলাবাজারে বিক্রি এবং বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে কম দামে বিক্রি করে অধিক মুনাফা অর্জন করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন কোম্পানির নিম্নমানের ৮টি ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বাজারে থাকা ওইসব ওষুধ তুলে নেয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। বলা নিষপ্রয়োজন যে, ওষুধ আর দশটা সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো নয়। ওষুধ আমরা সেবন করি আরোগ্য লাভের জন্য, জীবন রক্ষার জন্য। সেই ওষুধ যদি জীবন সংহারী হয়ে ওঠে, তখন এর চেয়ে ভয়াবহ আর কী হতে পারে! অথচ আমাদের দেশে তা-ই ঘটে চলেছে। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেখতে হয়েছে। কিছুদিন পরপরই আবিষ্কৃত হচ্ছে ভেজাল ওষুধ তৈরির কারখানা। এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা যথেষ্ট হলে এ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে হতো না। যাই হোক এখন তাদের টনক নড়লেই হলো।
বাজারে নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি সংক্রান্ত পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছিল মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। এর পরিপ্রক্ষিতে গত বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্ট বাজার থেকে ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ৪৮টি ওষুধের পরীক্ষা প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। তাতে ৮টি ওষুধ নিম্নমান ও ভেজাল হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সেগুলো উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করেন। গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ থেকে এ নির্দেশ আসে। হাইকোর্ট দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা শহর এবং চার সপ্তাহের মধ্যে সারা দেশের বাজার থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ওষুধসমূহ প্রত্যাহারের নির্দেশনা দিয়ে আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং র‌্যাবের মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন।
বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশে চলছে নকল ও ভেজালের মহোৎসব। এমন কোনো জিনিস নেই যা নকল হচ্ছে না বা যাতে ভেজাল দেয়া হচ্ছে না। নকল ও ভেজালের ভিড়ে আসল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সব ভেজালের ফল বা পরিণতিই খারাপ। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ নিশ্চয় খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল। কারণ এটা সরাসরি আমাদের জীবনধারণ ও বাঁচা-মরার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কাজেই এটাকে গড় পড়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়াই সঙ্গত। কিন’ এ দিকটা যে উপেক্ষিত তার প্রমাণ হিসেবে একাধিকবার আমরা দেখেছি মানহীন ওষুধ খেয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা। আরো কতো কতো মানহীন ও ভেজাল ওষুধ যে ক্রমাগত আমাদের মৃত্যু ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে না- তার নিশ্চয়তা কোথায়। যে মানহীন ও ভেজাল ওষুধগুলো শনাক্ত হয়েছে, সেগুলো তো এতোদিন বাজারে ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করে তা খেয়েছেন। তারা শুধু প্রতারিতই হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার মাত্রা হয়তো আমরা ধারণাও করতে পারছি না। এর দায় কে নেবে?
আমরা মনে করি, এ সমস্যাটি সরকারকে অতি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার এবং নকল ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং বাজারজাতকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা দরকার। এক্ষেত্রে ওষুধের দোকানগুলোতে এর কারখানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে যদি কারও দোকানে বা কারখানায় নকল বা বিদেশী চোরাই ওষুধ পাওয়া যায়, তাহলে ওইসব দোকানের বা কারখানার লাইসেন্স বাতিল ও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ওষুধের ক্ষেত্রে অনাচারের অর্থই হচ্ছে মানুষের জীবন নিয়ে বাণিজ্য। জীবন নিয়ে প্রতারণা। হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাস্‌সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়।” কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে- “মানুষকে হত্যা করা কুফরী।”
মূলত চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রতারণার দ্বারা উপরোক্ত দু’অপরাধ বা তদপেক্ষা বেশি অপরাধও প্রযোজ্য হয়। যে অপরাধবোধ ওষুধ প্রস্থতকারী মালিক, বিক্রয় প্রতিনিধি, বিক্রয়কারী এবং সংশ্লিষ্ট ডাক্তার তথা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কারো মধ্যেই নেই বললেই চলে।

Views All Time
2
Views Today
4
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+