ভ্রান্ত ওহাবী (সালাফী-লা’মাযহাবী-তথাকথিত আহলে হাদীছ) মতবাদ প্রচারের নেপথ্যে–—– পর্ব-৪


(শয়তান যে মানুষকে নেক সুরতে ধোঁকা দেয়, এ বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করেছিল শয়তানের অনুচর ইহুদী এবং খ্রিস্টানরা। মুসলমানদের সোনালী যুগ এসেছিল শুধু ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের ফলে শয়তানের চর ইহুদী খ্রিস্টানরা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, সংঘাত সৃষ্টি করতে পারলেই ইসলামের জাগরন এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে মুসলমানদের উত্থান ঠেকানো যাবে। আর তা করতে হবে ইসলামের মধ্যে ইসলামের নামে নতুন মতবাদ প্রবেশ করিয়ে। শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যার মূলে থাকে খ্রিস্টীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। জন্ম হয় ওহাবী মতবাদের। ওহাবী মতবাদ সৃষ্টির মূলে থাকে একজন ব্রিটিশ গুপ্তচর- হেমপার। সে মিসর, ইরাক, ইরান, হেজাজ ও তুরস্কে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য। ভ্রান্ত ওহাবী মতবাদের উপর তুর্কি ভাষায় রচিত হযরত মুহম্মদ আইয়ূব সাবরী পাশা রহমতুল্লাহী আলাইহি-এর “মিরাত আল হারামাইন” কিতাবের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ধারাবাহিকভাবে ভাষান্তর করা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।)

(ধারাবাহিক)

এটা নিশ্চিত যে, প্রত্যেক মুসলমান বিশ্বাস করেন আল্লাহ পাক সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া আর কেউ কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না। ‍যদি কোন ‍মুসলমান বলে, আমি এখন নামায পড়বো না, এতে বোঝা যাবে যে তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন তিনি ঐ সময় বা ঐ স্থানে নামায পড়বেন না অথবা তিনি ইতোমধ্যেই নামায আদায় করেছেন।

কেউ তাকে দোষারোপ করতে পারবে না, অপবাদ দিতে পারবে না যে, তিনি আসলে নামায পড়তে চান না। ঐ ব্যক্তিকে যেমনি কাফির, মুশরিক বলা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকতে হবে তেমনি যারা মাযার শরীফ জিয়ারত করেন এবং ওফাতপ্রাপ্ত আওলিয়ায়ে কিরামগণের কাছে সুপারিশের জন্য দু’য়া চান এবং “আমার ঐ দু’য়াগুলো যেন কবুল হয়” বা বলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার জন্য সুপারিশ করুন।” এতে বোঝা যায় মুসলমানগণের এরকম শব্দ ব্যবহার করা শরীয়তসম্মত সৎ নিয়তযুক্ত।

ওহাবী নজদীর বিশ্বার এর প্রচারণাসমূহ সমূলে উৎপাটন করা হবে পূর্ণ ইলম এবং প্রজ্ঞার দ্বারা। বহু কিতাব রচিত হয়েছে যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে ওহাবী নজদী ভুল পথে ছিল এবং মুসলমানদের অপবাদ দিয়েছিল। এছাড়াও ইসলামের মধ্যে থেকেই ইসলামের ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করেছিল। ইয়েমেনের একজন প্রখ্যাত মুফতী সাইয়্যিদ আব্দুর রহমান (রহমতু্ল্লাহি আলাইহি) লিখেন যে, একটি হাদীছ শরীফ-এর উদ্ধৃতিই যথার্থ হবে যা প্রমাণ করে ওহাবী নজদী ভুল পথে ছিল। “আরবের পূর্ব দেশ থেকে একটি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে, তারা কুরআন শরীফ পড়বে যা তার গলার নীচে নামবে না। তারা ইসলামকে ত্যাগ করবে, যেমনি ধনুক থেকে তীর ছুটে যায়। তারা দাড়ি মুন্ডাবে।” তাদের মুন্ডিত চেহারাগুলো স্পষ্ট প্রকাশ করবে যে এরা ওহাবী নজদীর অনুসারী এবং ভুল পথে চালিত। এই হাদীছ শরীফ জানার পর আর অন্য কোন কিতাব পড়ারও প্রয়োজন পরে না। ওহাবী নজদীর কিতাবে নির্দেশ দেয়া আছে যে, তার অনুসারীরা মাথা এবং মুখের অংশবিশেষ মুন্ডাবে। এরকম নির্দেশ ৭২ ফিরকার অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে নেই।

ওহাবী নজদী মহিলাদের মাথা মুন্ডনের নির্দেশ দিয়েছিল। একজন মহিলা জবাব দিয়েছিল, “পুরুষের দাড়ির মত মহিলাদের মাথার চুল তাদের অলঙ্কার। আল্লাহ পাক যে অলঙ্কার দিয়ে মানুষকে ভূষিত করেছেন মানুষের পক্ষে তা ত্যাগ করা কি উচিত হবে?” ওহাবী নজদী এর কোন প্রতি উত্তর দিতে পারেনি। যদিও আব্দল ওহাব নজদীর অসংখ্য বাতিল আক্বীদা রয়েছে তবে তার মধ্যে তিনটি প্রধান-

১। সে শিখিয়েছিল, আমল ঈমানের অংশ এবং যদি কেউ কোন ফরযকে বাদ দেয়, যেমন কেউ যদি কখনো অলসতার কারণে নামায আদায় না করে অথবা কোন বছর কৃপণতা করে যাকাত আদায় না করে, যদিও সে বিশ্বাস করে নামায আদায় এবং যাকাত দেয়া ফরয, তথাপি সে কাফির হবে। সে ব্যক্তিকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে এবং তাদের সম্পত্তি ওহাবীদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে।

২। ওহাবীরা বিশ্বাস করে, নবী আলাইহিমুস সালাম এবং আওলিয়ায়ে কিরামগণের ওসীলা দিয়ে দু’য়া করা শিরক। কোন বিপদ থেকে রক্ষা বা কোন ইচ্ছা পূরণের জন্য নবী আলাইহিমুস সালাম এবং আওলিয়ায়ে কিরামগণের কাছে চাওয়াও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। তারা বলে, ‘দালায়েল আল খায়রাত’ বইটি পড়া নিষিদ্ধ।

৩। তারা আরও বিশ্বাস করে কোন কবরের গম্বুজ নির্মাণ করা এবং সেখানে যারা গিয়ে দু’য়া কালাম পড়ে বা খিদমত করে তাদের উদ্দেশ্যে বাতি জ্বালানোও শিরক। ছওয়াব রেছানীর উদ্দেশ্যে কোন হালাল পশু কুরবানী করাও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। তাদের দৃষ্টিতে এরকম কাজ করা হচ্ছে আল্লাহ পাক ভিন্ন অন্য মানুষের ইবাদত করা। যখন সউদ বিন আব্দুল আযীয মক্কা শরীফ এবং মদীনা শরীফ-এ প্রবেশ করে তখন নবীদের নবী, রসূলদের রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক ব্যতীত সকল ছাহাবা আজমাঈন ও আহলে বাইত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং সকল শহীদগণ-এর মাযার শরীফ-এর উপর যত গম্বুজ ছিল তা সব ধ্বংস করে দিয়েছিল। (নাউযুবিল্লাহ)

মাযার শরীফগুলো তখন চিহ্নহীন হয়ে পড়ে। যদিও তারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক-এর গম্বুজও নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু যারাই কুরাল হাতে নিয়েছিল তাদের কেউ পাগল হয়ে যায়, কারো শরীর অবশ হয়ে যায় এবং পরবর্তিতে কেউ আর সেই ঘৃণিত অপরাধ করতে সক্ষম হয়নি। ওহাবীরা যখন মদীনা শরীফ-এর অবস্থান নেয় তখন ইবনে সউদ মুসলমানদের জড়ো করে তাদের অপবাদ দেয় এবং বলে, তোমাদের ধর্ম আজকে থেকে ওহাবী মতবাদ দ্বারা পূর্ণ করা হলো এবং আল্লাহ পাক তোমাদের উপর সন্তুষ্ট। তোমাদের পিতারা ছিল কাফির এবং মুশরিক। তাদের ধর্ম অনুসরণ করো না। প্রত্যেকে বলো যে, তোমাদের পূর্ব পুরুষরা কাফির ছিল। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক-এর সামনে দাঁড়িনো এবং উনার কাছে কিছু আরজু করাকে নিষিদ্ধ বলে ওহাবীরা ফতওয়া দেয়। (নাউযুবিল্লাহ) ওহাবীরা আরও বলে, শুধু রওজা মুবারক-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতে হবে, ‘সালাম ইয়া মুহম্মদ’ সুপারিশ করার তিনি কেউ নন। (নাউযুবিল্লাহ)

প্রথম ওহাবী মিশনঃ
আব্দুল আযিয নিষ্ঠুরভাবে মুসলমানদের হত্যা করে শুধু ওহাবী মতবাদ প্রচারের লক্ষ্যে। সে ১২১০ সালে (১৭৯৫) মক্কা শরীফ-এ তিনজন ওহাবীকে পাঠায়। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের উলামাগণ কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফ-এর মাধ্যমে উত্তর প্রদান করেন। পক্ষান্তরে ওহাবীরা কোন উত্তর দিতে সক্ষম হয়নি। ওহাবীরা সত্য স্বীকার করা ভিন্ন অন্য কোন পথ খুঁজে পায়নি। তারা একটি দীর্ঘ ঘোষণা দেয় এবং স্বাক্ষর করে যে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত-এর পথটি সঠিক এবং তারা ভুলের মধ্যে রয়েছে, যে পথ স্বাভাবিক নয়। কিন্তু আব্দুল আযীয তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। কারণ সে তখন একটি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের পেছনে দৌড়াচ্ছিল এবং নেতা হবার স্বপ্নে হৃদয়কে পূর্ণ করেছিল। ধর্মের আড়ালে সে মুসলমানদের উপর জুলুম বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তিন ওহাবী মক্কা শরীফ-এর মুসলমানদের বুঝাবার লক্ষ্যে ২০টি বিষয় উপস্থাপন করে। (সেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উপরের তিনটি বিষয়ের মধ্যে স্থান পায়) ওহাবী নজদী বলে বেড়াতো যে, হাম্বলী মাযহাবের ইমাম, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইজতিহাদ হচ্ছে, ইবাদত ঈমানের একটি শাখা। কিন্তু ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সকল ইজতিহাদ লিপিবদ্ধ ছিল এবং মক্কা শরীফ-এর উলামাদের তা বিস্তারিত জানা ছিল। সুতরাং উনারা সহজেই ঐ তিনজন ওহাবীকে বুঝাতে সক্ষম হন যে ওহাবীদের এ ধরণের অপবাদ মিথ্যা।

ঐ তিন ওহাবী সত্যকে উপেক্ষা করে তাদের ধারণায় বদ্ধমূল থেকে বলতো তাদের ওহাবী আক্বীদাই সত্য। তারা আরও বলতে থাকে, মক্কা শরীফ-এর মুসলমানগণ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত মাহযূব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মাযার শরীফ যিয়ারত করেন এবং বলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ও ইবনে আব্বাস ও মাহযূব (মাহযূব হচ্ছেন সাইয়্যিদ আব্দুর রহমান যিনি সেই সময়ের প্রখ্যাত আলিম ছিলেন। ১২০৪ (১৭৯০) সালে তিনি ইন্তিকাল করেন এবং মুয়ালা কবরস্থানে শায়িত আছেন।) ওহাবীরা আরও বলে, “আমাদের ইমাম ওহাবী নজদীর ইজতিহাদ অনুযায়ী যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসূলাল্লাহ’ বলেন কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করেন তবে তারা কাফির হয়ে যান। এক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা এবং তাদের সম্পদ লুন্ঠন করা শরীয়তসম্মত।” আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতে উলামারা তার প্রতি উত্তরে বলেন, আল্লাহ পাক-এর মাহবুব বান্দাগণের মাযার শরীফ যিয়ারত করা, উনাদের ওসীলা দিয়ে দু’য়া করার অর্থ উনাদের ইবাদত করা নয়। যিয়ারতকারীরা তাদের ইবাদত করার উদ্দেশ্য নিয়ে যিয়ারত করে না বরং তাদের ওসীলা করে আল্লাহ পাক-এর কাছে দু’য়া করেন। তারা দলীল দিয়ে প্রমাণ করেন যে, এটি শরীয়তসম্মত এমনকি প্রয়োজনীয়ও বটে।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে