মসজিদ আল-আকসা ও ডোম অফ দ্য রক


মসজিদ আল-আকসা ও কুব্বাত আস-সাখরাহ:

 

৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা বাইজেন্টাইন অধীনস্থ জেরুজালেম নগরী জয় করে। ইসলামের প্রথম কিবলা এবং মি’রাজের সাথে সম্পর্কিত জেরুজালেম (আরবী নাম আল-কুদস القدس al-Quds – The Holy One) ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। পুরনো জেরুজালেমে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ডোম অফ দ্য রক’ (কুব্বাত আস-সাখরাহ) এবং ‘মসজিদ আল আকসা’ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে কিছু বিভ্রান্তি আছে যা নিয়ে এ লেখাটির অবতারণা।

 

ডোম অফ দ্য রক – Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah):

 

 

Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah)

Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah)

 

Dome of the Rock (Qubbat as-Sakhra)

Dome of the Rock (Qubbat as-Sakhra)

 

উপরের স্থাপনাটি মুসলিম বিশ্বে সচরাচর আল আকসা মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও এ স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট আরবী নাম-  قبة الصخرة‎ (Qubbat As-Sakhrah), ইংরেজিতে Dome of the Rock, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘পাথরের (উপর নির্মিত) গম্বুজ’। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ববাহী বিবিধ কারণে পুরনো জেরুজালেমের পবিত্র ‘টেম্পল মাউন্ট’ (Temple Mount – আরবী الحرم الشريف al Haram ash-Sharif – The Noble Sanctuary) চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত অষ্টভুজাকৃতির এই স্থাপনাটির নকশা ও অলংকরণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং উদীয়মান স্বতন্ত্র ইসলামিক ট্র্যাডিশনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় যাতে টেক্সচুয়াল ও আর্কিটেকচারাল ন্যারেটিভ একে অপরকে জোরদার করে।

 

এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে- এই স্থাপনাটি মূলত: মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়নি (মূল অংশে কোন মিম্বর নেই), বরং মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী হাদিসে বিশদভাবে বর্ণিত যে পবিত্র পাথরের উপর থেকে রাসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মি’রাজে (Ascension to Heaven) শরীফে গমন করেছিলেন বলে কোনো কোনো মতে বর্ণিত আছে। জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরের কেন্দ্রস্থিত সেই Foundation Stone বা ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে একটি shrine (মাজার শরীফ) হিসেবে এই স্থাপনাটি নির্মিত। কোনো কোনো মত অনুযায়ী এই সেই স্থান যেখানে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনি তাঁর সন্তানকে উৎসর্গ  (কুরবানী) করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন এবং যেখানে পরবর্তীতে হযরত সোলায়মান  আলাইহিস সালাম-এর টেম্পল ছিল। স্থানটির দ্বীনী তাৎপর্যের স্মারকচিহ্ন হিসেবে স্থাপনাটি নির্মিত, যা তার আভ্যন্তরীণ নকশা দেখলে বোঝা যায় –

 

 

Dome of the Rock interior

Dome of the Rock interior

 

গম্বুজের ঠিক নিচে স্থাপনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পবিত্র পাথর (Foundation Stone), যা পারিপার্শ্বিকতার অংশ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে ৯০ মিলিয়ন বছরের পুরনো (Upper Turonian Stage, Late Cretaceous karsted limestone) –

 

 

The Holy Rock at the center of the interior

The Holy Rock at the center of the interior

 

পাথরটি পুরোপুরি নিরেট নয়, বরং এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি গর্ত আছে যা দিয়ে পাথরের নিচে অবস্থিত আংশিক প্রাকৃতিক ও আংশিক মানবসৃষ্ট একটি গুহায় (cavern) প্রবেশ করা যায়। Well of Souls (আত্মার কূপ) নামে পরিচিত এই গুহার অভ্যন্তরে রয়েছে নামাজের জায়গা –

 

Prayer area inside the cave under the Holy Rock

Prayer area inside the cave under the Holy Rock

 

বাহ্যিক নকশা (Exterior Design):

অটোমান সম্রাট সুলেমান (Suleiman the Magnificent)-এর শাসনামলে ডোম অফ দ্য রকের বাইরের দেয়াল সুদৃশ্য টাইল দিয়ে আচ্ছাদিত হয়। ১৯৫৫ সালে জর্ডানের সরকার অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ও তুরস্কের সহায়তায় প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির মেরামত কাজ শুরু করে। এই পুনরুদ্ধার কাজের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে এর সীসা (Lead) আচ্ছাদিত গম্বুজটি ইটালিতে তৈরি অ্যালুমিনাম-ব্রোঞ্জ সংকর ধাতু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন প্রদত্ত ৮.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৮০ কিলোগ্রাম (২ মণ) স্বর্ণ দিয়ে গম্বুজটি পুরোপুরি আচ্ছাদন করা হয়। জেরুজালেমের যেকোনো প্রান্ত থেকে ডোম অফ দ্য রকের উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজটি চোখে পড়ে।

 

Dome of the Rock: The golden dome exterior

Dome of the Rock: The golden dome exterior

 

 

Dome of the Rock: Mosaic, tile, and inscription on exterior walls

Dome of the Rock: Mosaic, tile, and inscription on exterior walls

 

 

Dome of the Rock: Mosaic

Dome of the Rock: Mosaic

 

আভ্যন্তরীণ নকশা (Interior Design):

স্থাপনাটির অভ্যন্তরে রয়েছে মোজাইক, মার্বেল, ও চীনেমাটির সুদৃশ্য অলংকরণ যা বিভিন্ন শাসনামলে নতুন করে যোগ করা হয়েছে।

 

 

Dome interior

Dome interior

 

Dome of the Rock: Interior design

 

Dome of the Rock: Interior decoration

Dome of the Rock: Interior decoration

 

Dome of the Rock: Intricate interior design

Dome of the Rock: Intricate interior decoration

Dome of the Rock: Intricate interior decoration

 

স্থাপনাটির ভেতরের এবং বাইরের দেয়ালে রয়েছে এর রাষ্ট্রীয় ও দ্বীনী অবস্থানের সাথে সঙ্গতি ও তাৎপর্যপূর্ণ  পবিত্র সুরা ইয়াসিন, সুরা মারিয়াম ও সুরা ইসরা’সহ পবিত্র কুর’আন শরীফের বিভিন্ন পবিত্র আয়াত শরীফের কারুকার্যময় ক্যালিগ্রাফি –

 

Inscription, mosaic, and tile work

Inscription, mosaic, and tile work

 

মসজিদ আল আকসা:

 

Masjid al-Aqsa

Masjid al-Aqsa

 

Masjid al-Aqsa

Masjid al-Aqsa

জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরে উপরোল্লিখিত ‘ডোম অফ দ্য রক’ স্থাপনাটির ২০০ মিটার দক্ষিণে রয়েছে ধূসর সীসায় (lead) আচ্ছাদিত গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ, যা সুনির্দিষ্টভাবে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারূক আলাইহিস সালাম তিনি ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম বিজয়ের পর পবিত্র পাথরের (কুব্বাত আস-সাখরাহ) দক্ষিণে একটি  মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক এই মসজিদটির পুনঃনির্মাণ ও পরিবর্ধন করেন; যার কাজ শেষ হয় ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তার ছেলে আল-ওয়ালিদের শাসনামলে। কালের পরিক্রমায় বহুবার মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয় – যোগ করা হয় গম্বুজ, মিম্বর, মিনারত।

Masjid al-Aqsa: al-Fakhariyya Minaret

Masjid al-Aqsa: al-Fakhariyya Minaret

 

 

Masjid al-Aqsa: Entrance

Masjid al-Aqsa: hypostyle prayer hall

Masjid al-Aqsa: hypostyle prayer hall

 

Al Aqsa: Interior

Masjid al-Aqsa: Interior

Masjid al-Aqsa: Interior

 

 

১০৯৯ সালে হানাদার যালিম ক্রুসেডাররা জেরুজালেম অপদখল করার পর মসজিদটি একটি প্যালেস এবং চার্চ হিসেবে ব্যবহার করে ও অবমাননা করে। অবশেষে হযরত গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন এবং পুনরায় স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। হযরত গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহির পূর্বসূরি সেলজুক আমির হযরত নূরউদ্দীন জঙ্গি  রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ১১৬৮ সালে মসজিদটির জন্য সিরিয়া থেকে আইভরি (হাতির দাঁত) ও কাঠের কারুকাজ করা একটি সুদৃশ্য মিম্বর তৈরির নির্দেশ দেন; যার কাজ শেষ হয় তাঁর বিছাল শরীফ (ইন্তেকাল করার) গ্রহণের পর। হানাদার যালিম ক্রুসেডারদের অপদখল থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পর ১১৮৭ সালে হযরত গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মিম্বরটি স্থাপন করেন। ১৯৬৯ সালে একজন অস্ট্রেলীয় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী খৃস্টান পর্যটকের ছদ্মবেশে নাশকতামূলক অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব অংশসহ ঈসায়ী দ্বাদশ শতাব্দীর কারুকার্যপূর্ণ মিম্বরটি পুড়িয়ে দেয়, তার জায়গায় এখন রয়েছে একটি Replica বা অনুকৃতি।

 

Masjid al-Aqsa: Original Saladin Minbar: Photo Credit: Matson collection 1914

Masjid al-Aqsa: Original Saladin Minbar: Photo Credit: Matson collection 1914

 

 

নামের বিভ্রান্তি:

 

মুসলিম বিশ্বে আলোচ্য স্থাপনা দুটির নাম ও উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তি ও Conspiracy Theory প্রচলিত আছে। নিচের ছবিতে জেরুজালেমের হারাম শরীফে স্থাপনা দুটির তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে, যা এদের ভিন্নতা বুঝতে সহায়ক হবে।

 

Dome of the Rock and Masjid al-Aqsa in al-Haram ash-Sharif

Dome of the Rock and Masjid al-Aqsa in al-Haram ash-Sharif

 

এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কুর’আন শরীফে পবিত্র সুরা ইসরায় (বনী ইসরাঈল) পবিত্র মক্কা শরীফের ‘মসজিদ আল হারাম’ থেকে ‘মসজিদ আল আকসা’ পর্যন্ত রাসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইসরা বা রাত্রিকালীন ভ্রমণের (The Night Journey) বিষয়টি  নাজিল হয়। জেরুজালেম সেসময় রোমান খৃস্টানদের দখলে ছিল।

 

“সকল মহিমা তাঁর যিনি স্বীয় প্রিয় বান্দাকে (রসূলকে) রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম (পবিত্র মসজিদ) থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি; যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (পবিত্র কুর’আন শরীফ– ১৭ঃ১)

 

“Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the All-Hearing, the All-Seeing.” Al Qur’an – 17:1

 

রাসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিছাল শরীফের পর ৬৩৭/৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারূক আলাইহিস সালাম-এর খিলাফতের সময় মুসলিমরা জেরুজালেম  বিজয় করেন। এরপর পবিত্র হাদিসের বিশদ বর্ণনা অনুসারে টেম্পল মাউন্টের কেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র পাথরটিকে রাসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর  পবিত্র মি’রাজ শরীফে গমনের স্থান হিসেবে নিরূপণ করা হয় এবং এর কিছু দক্ষিণে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। পরবর্তী বহু শতাব্দী পর্যন্ত পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত মসজিদ ভবন এবং ডোম অফ দ্য রক স্থাপনা’সহ পারিপার্শ্বিক পুরো টেম্পল মাউন্ট এলাকাটিই মুসলিমদের কাছে কুর’আনে বর্ণিত ‘মসজিদ আল আকসা’ নামে এবং মসজিদ ভবনটি ‘আল-জামই আল-আকসা’ নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতকে অটোমান শাসনামলে মসজিদের লাগোয়া টেম্পল মাউন্ট চত্বরটির ব্যাপক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সাধন করে এলাকাটিকে আল-হারাম আশ-শরীফ (the Noble Sanctuary) নামকরণ করা হয়। অন্যদিকে মসজিদ ভবনটি তখন থেকে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত হয়। অধুনা এই পরিচয়টিই বহুল ব্যবহৃত। সামগ্রিকভাবে একই চত্বরে অবস্থিত Qubbat as-Sakhra বা ডোম অফ দ্য রক নামে পরিচিত স্থাপনাটি ঠিক মসজিদ হিসেবে নির্মিত নয়, যদিও এর ভেতরেও নামাজ পড়া হয়। জুমুয়াবারে জুম্মার নামাজে ইমাম মসজিদ আল-আকসাতে দাঁড়ান, ডোম অফ দ্য রকের অভ্যন্তরে তুলনামূলক স্বল্প-পরিসর স্থানে এসময় মুসল্লীরা নামাজ আদায় করেন। স্বতন্ত্র হলেও এটা জানা জরুরী যে- প্রায় ১৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য সম্বলিত গুরুত্বপূর্ণ এ দু’টি স্থাপনাই মুসলিমদের তৈরি এবং পুরো এলাকাটিই তাদের জন্য পবিত্র স্থান (الحرم الشريف – the Noble Sanctuary) হিসেবে গণ্য।

 

Jerusalem: Old City

Jerusalem: Old City

Views All Time
2
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে