মাত্র দশ বছরের মধ্যেই অন্তত ৩৩ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ‘অবিচ্ছিন্ন ভূখন্ড পাওয়া যাবে


বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠছে আরেক বাংলাদেশ। উজানি নদীর পানিবাহিত পলি জমে নোয়াখালীর দক্ষিণে সাগরের বুকে জেগে উঠছে শতাধিক ছোট দ্বীপ। কোনোটি জোয়ারে ডুবে যায়, ভাটায় আবার ভেসে উঠে। কোনোটির কিছু অংশ জোয়ারেও ডোবে না। একটু পানির নিচে থাকা নতুন করে জেগে ওঠা এসব ভূমির পরিমাণ প্রায় ৩৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। সেই হিসেবে সব দ্বীপ ও সাগরের গর্ভে জমা পলিতে কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের সমপরিমাণ ভূমি সাগরের বুকে জেগে উঠবে বলে আশা করছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
নোয়াখালী জেলার দ্বীপ-উপজেলা হাতিয়ার দক্ষিণে জেগে ওঠা দ্বীপগুলোতে সমুদ্রের বুকে হাজার হাজার একর ভূমি জেগে উঠছে। নৌযানে হাতিয়ার দমারচর সাগরটিলা, নিঝুম দ্বীপ, কালামচরসহ একাধিক দ্বীপে দেখা গেছে, নোয়াখালীর দক্ষিণে বয়ারচর থেকে শুরু করে হাতিয়া উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ অংশে এসব চর জেগে উঠছে। এর মধ্যে অধিকাংশ দ্বীপের নামকরণ করা হয়নি এখনও। এখানকার বড় দ্বীপগুলোর মধ্যে রয়েছে বয়ারচর, নলারচর, চর প্রিয়া, চর নূর ইসলাম, সাহেব রানীরচর, ডেলিয়ারচর, ঢালচর, মৌলভীরচর, চর গিয়াসউদ্দিন, রহমানচর, চর কালাম এবং নিঝুম দ্বীপ। এর মধ্যে পাঁচটি চরে মানুষের বসতি রয়েছে। চরগুলোর সঙ্গে প্রতিবছর নতুন ভূমি জেগে উঠায় বেড়ে যাচ্ছে দ্বীপের আয়তন। সবচেয়ে বড় আয়তনের দ্বীপ জেগে উঠছে নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণে দমারচর সাগরটিলায়। হাতিয়া উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ অংশ দিয়ে বাড়ছে এ দ্বীপটি।
সাগরটিলায় দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধু জেগে উঠা চরের নতুন সবুজ ঘাস আর ঘাস। দ্বীপের বাসিন্দাদের মতে, দমারচর সাগরটিলার দক্ষিণ অংশের সাগরের দিকে প্রতিবছর নতুন ভূমি জেগে উঠছে। জ্যোৎসনায় সম্পূর্ণ চরটি জোয়ারে প্লাবিত হলেও ভাটায় চোখে পড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ একর ভূমি। দমারচর সাগরটিলার ভূমিহীন সমিতির সভাপতি আবুল কাশেমের মতে, দমারচরে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ছয় ঘণ্টা একটানা হেঁটেও চরের সীমানা পাওয়া যায়নি। আবার পূর্ব দিক থেকে রাতে তাকালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কারখানাগুলোর আলো দেখা যায়। চরটি ছোট ছোট খাল দ্বারা পাশের দ্বীপগুলো থেকে বিছিন্ন।
১৯৯৭ সালে মেঘনা মোহনা পর্যবেক্ষণ প্রকল্পÑ এমইএস এক সমীক্ষা চালায় নোয়াখালীর দক্ষিণে ২০০ কিলোমিটার সাগরগর্ভে। ওই সময় তাদের সমীক্ষায় ধরা পড়ে, নোয়াখালী থেকে দক্ষিণে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত সাগরের গভীরতা গড়ে মাত্র ১৫ ফুট। পূর্ব-পশ্চিমে গড়ে ৩০ কিলোমিটার এলাকায়ও সাগরের গভীরতা একই। ১৮০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আরও ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের প্রথম খাঁড়ি, গভীরতা ১২০ ফুট। ওই সমীক্ষার ফল থেকে ধারণা করা হয়, পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকায় নতুন ভূমি জেগে উঠবে। শুধু হাতিয়ার দক্ষিণেই জেগে উঠা ভূমির পরিমাণ হতে পারে ৬ থেকে ৭ লাখ একর। হাতিয়া উপজেলার বাসিন্দাদের মতে, সমীক্ষার পর যে ধারণা করা হয়েছিল তার অনেক আগেই চর জাগতে শুরু করেছে সাগরের বুকে। প্রতিবছর জেগে উঠছে হাজার হাজার একর ভূমি। এর ফলে অচিরেই দেশের মূল ভূখ- নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে সন্দ্বীপ। আর বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চর মিলে অচিরেই দেখা যাবে আরেক বাংলাদেশ।
নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ইডিপি’র এক জরিপ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত শুধু নোয়াখালী উপকূলেই সাড়ে ৯শ বর্গমাইল ভূমি জেগে উঠে। তবে ভাঙনসহ নানা দুর্যোগে এরমধ্যে প্রায় সাড়ে ৭শ বর্গমাইল ভূখ- টিকে আছে। উপকূলীয় জেলে-মাঝিদের নিকট হতে জানা গেছে, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায়ই তাদের নৌকাগুলো নতুন নতুন চরে আটকে যাচ্ছে। নিঝুম দ্বীপ থেকে ৩৫-৪০ মাইল দক্ষিণে ভাটার সময় বড় বড় চরভূমির অস্তিত্ব থাকার তথ্যও জানতে পেয়েছেন গবেষকরা। কিন্তু এই চরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে স্থায়িত্ব দিতে সরকারি উদ্যোগ-আয়োজন চলছে ঢিমেতালে। বিষয়টি শীর্ষপর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বও পাচ্ছে না। সমুদ্রবক্ষে সম্ভাবনার বিশাল স্বপ্ন-সম্ভার এসব নতুন ভূখ- পরিকল্পিত ব্যবহার, বনায়ন ও সংরক্ষণের সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হয়নি এখনো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে সফরের সময় মুহুরি প্রজেক্টে জেগে উঠা চরভূমির বিস্তারিত জেনে রীতিমতো আপ্লুত হন। সাগরে জেগে ওঠা ১৭ হাজার একর ভূমিতে তিনি শিল্প পার্ক নির্মাণেরও ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এ ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়ার সভাপতিত্বে এরই মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানা গেছে। আইডব্লিউএমের উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জহিরুল হক খান সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বলে, ‘নঙ্গলিয়া এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চরে গিয়ে মেঘনার মোহনা জুড়ে বড় বড় আয়তনের নতুন ভূখ- দেখা গেছে। সেসব চরের পরিণত জমিতে বনভূমি জš§ানোর অনুকূল তৈরি হয়েছে। সে জানিয়েছে, উডরিচর থেকে জাহাজের চর পর্যন্ত ক্রসবাঁধ নির্মাণ করে এ মুহূর্তেই ৫৫ হাজার হেক্টর ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব। হাতিয়া-নিঝুমদ্বীপ-ধামারচর এবং ধুলা-চরমোন্তাজ-চরকুকরি মুকরি ক্রসবাঁধের মাধ্যমে মূল স্থলভূমির সঙ্গে সংযুক্ত করার খুবই চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে মাত্র দশ বছরের মধ্যেই অন্তত ৩৩ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ‘অবিচ্ছিন্ন ভূখন্ড পাওয়া যাবে।
এদিকে চট্টগ্রামের মুহুরি প্রজেক্ট, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীর উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা সংলগ্ন সাগরেও বড় বড় চরভূমি জেগে ওঠার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে সুন্দরবন (পশ্চিম) বন বিভাগের কর্মকর্তা মান্দারবাড়িয়া অভয়ারণ্যের ৩/৪ মাইল দক্ষিণে বিশাল আয়তনের নতুন চর জেগে ওঠার তথ্য জানিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানায়, বিগত ৪০ বছরের ইতিহাসে পটুয়াখালী, ভোলা এবং বরগুনার নদী মোহনা-সাগরে চর জেগে সর্বাধিক ভূমি সৃজন হয়েছে। অপরদিকে সিইজিআইএসের স্যাটেলাইট ইমেজ-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালীর উপকূলেই সবচেয়ে বেশি ভূখ- জেগে উঠছে। ইতোমধ্যে ক্রসবাঁধ পদ্ধতিতেও বঙ্গোপসাগর থেকে লক্ষাধিক হেক্টর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার বর্গমাইল আয়তনের নতুন ভূখ- পাওয়া গেছে সেখানে। আরও কয়েকটি ক্রসবাঁধের মাধ্যমে নোয়াখালীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন সন্দ্বীপের সংযুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়েও এখন গবেষণা চলছে। এটা সম্ভব হলে শুরু হবে বাংলাদেশের সাথে আরো আরো বাংলাদেশের।
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ হয়েছে, ‘যতক্ষণ তোমরা পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদেরকে আঁকড়ে থাকবে ততক্ষণ উন্নতির শীর্ষে থাকবে। আর যখনই তা থেকে বিচ্যুত হবে তখনই লাঞ্ছিত ও পদদলিত হবে।’

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+