মানুষের ঘরে খাবার নেই। খাবারের জন্য চলছে বিক্ষোভ, সরকারি ত্রাণে চলছে লুটপাট। জনগণের অসহায়ত্ব নিয়ে টালবাহানার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ।


সারাদেশে চলছে তথাকথিত লকডাউন। বাজার ঘাট বন্ধ, সব ধরণের পেশার উৎসও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ মানুষের ঘরেই নেই খাবার। ফলে লকডাউন ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে আসছে সাধারণ মানুষ। ক্ষুধায় কাতর হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে ত্রাণের আশায়। কোথাও ত্রাণের গাড়ি দেখলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ত্রাণের জন্য কাড়াকাড়িতে আহত এমনকি সংঘর্ষ পর্যন্ত হচ্ছে। সরকারি ত্রাণ লুটের মতো ঘটনাও ঘটছে।
সম্প্রতি বেসরকারি এক জরীপে সাধারণ মানুষের খাদ্য সঙ্কটের ভয়াবহতা উঠে এসেছে। জরীপ সুত্রে, দেশের চরম দারিদ্র্যের হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে। দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের ঘরে কোনো খাবার নেই। আগে যাদের গড় আয় ছিল ১৪ হাজার ৫৯৯ টাকা, লকডাউন পরিস্থিতির কারণে তাদের আয় কমে তিন হাজার ৭৪২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত দরিদ্রদের ৮৯ শতাংশ দারিদ্র্যরেখার নিম্নসীমার নিচে নেমে গেছে।
ক্ষুধার তাড়নায় জেলায় জেলায় বিক্ষোভ করছে ক্ষুধার্ত মানুষ। গত ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শত শত শ্রমজীবী। উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, দক্ষিণ বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, বাড্ডা ডিআইটি প্রকল্প, আফতাবনগর, নূরেরচালা বিভিন্ন এলাকার অভাবি মানুষ এ বিক্ষোভে যোগ দেন। এছাড়া খাবারের জন্য খুলনা, বরিশাল, টাঙ্গাইল, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ করেছে হতদরিদ্ররা। এরই মধ্যে মাদারীপুরে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছে খাবারের জন্য। তাদের একটাই দাবি বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু খাবার প্রয়োজন অন্তত তার ব্যবস্থা করুক সরকার। বিক্ষোভকারীরা বলেন, আমাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার কথা থাকলেও সেই খাবার কেউ দিচ্ছে না। আমাদের কাজ-কর্ম নেই, কাজে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দিচ্ছে, তাহলে আমারা কী করে খাবার আনব। বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ করেছে। কিন্তু আজ আমরা রাস্তায় বের হতে বাধ্য হয়েছি। একজন বিক্ষোভকারী জানান, ‘আমাদের ঘরে খাবার দেয়া হোক আর তা না হলে আমাদের বিষ দেন, আমরা সেটা খেয়ে মরে যাই। ক্ষুধার যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না।’ আরেকজন বিক্ষোভকারী জানান, কোনো কাজ-কামাই নাই। অভাবের সংসারোত হামাক শ্যাষ করি ফ্যালাইল। রিকশার চাকা না ঘুরলে হামরা খামো কি? সরকার ত্রাণ দ্যাওচে, কিন্তুক হামরা তো পাই না। হামাক ভাত দেউক, খাবার দেউক। হামরা ঘরোত থাকমো।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে অন্য এক বিক্ষোভকারী জানান, লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়ে আছি গত ১৬ মার্চ থেকে। ঘরে কোনো খাবার নেই। খাবার কেনার টাকাও নেই। এতদিনেও কোনো সাহায্য পায়নি। কোনো জনপ্রতিনিধি আমাদের ত্রাণ দেয়নি। এ জন্য কাউন্সিলর অফিসে ত্রাণের জন্য গেলে তাদের মারধর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের।
দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কে খাবারের সন্ধানে ঘুরছে অগণিত ক্ষুধার্ত মানুষ। অনেকে পরিবারের খাবার জোগাড় করতে রিকশা নিয়েও রাস্তায় নেমে পড়ছে। কিন্তু তাদের চাহিদা ও জোগানের মাঝে রয়ে যাচ্ছে বিস্তর ফারাক। সরকার থেকে নামমাত্র ত্রাণেই কিছুই হচ্ছেনা তাদের। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ত্রাণও পাচ্ছেনা তারা। নগরীর খিলগাঁও রেলগেট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শত শত মানুষ আশপাশের সড়কের পাশে বসে আছেন। তাদের সবারই প্রত্যাশা খাবার। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর কোনও ত্রাণ সহায়তার গাড়ি দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন তারা। তাছাড়া রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো হতদরিদ্র অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুরের খাবার অনেকে দিলেও রাত এবং সকালের খাবার জুটছে না। অনেকেই তিনবেলার মধ্যে মাত্র এক বা দুই বেলা খেয়ে কাটাচ্ছেন। অনেকে সারারাতই রাস্তার পাড়ে বসে থাকছেন ত্রাণের গাড়ির আশায়।
কিন্তু এত হাহাকার পরিস্থিতির পরও সরকার সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল আচরণ জনগন প্রত্যক্ষ করছেনা। উল্টো সরকারের কথিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই এমন সব মন্তব্য করছে যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষোভ উথলে উঠছে। গত জুমুয়াবার তথ্যমন্ত্রী বলেছে, ‘ভাড়া করা লোক দিয়ে ত্রাণের জন্য বিক্ষোভ করানো হচ্ছে’। অথচ তথ্যমন্ত্রীর দাবীর স্বপক্ষে কোনোই প্রমাণ সংশ্লিষ্ট মহল দেখাতে পারেনি। বরং ক্ষুধার্ত নি¤œ আয়ের মানুষেরাই রাস্তায় খাবারের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ছে সেটাই বাস্তবতা, সেটাই সত্য। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীলের এমন মন্তব্য তাদের অযোগ্যতার দিকেই আঙ্গুল তোলে। পাশাপাশি সরকার থেকে কোনো সহযোগীতা না করার পরও নি¤œ আয়ের মানুষের খাদ্যের জন্য বিক্ষোভ নিয়ে এমন মিথ্যাচাদর নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষুধা নিয়ে অমানবিকতা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সমতুল্য।
প্রসঙ্গত, যখন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিলো তখন এই নি¤œ আয়ের মানুষগুলোই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছিলো। কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার তাদের সকল অবদান ভুলে গিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছেনা। সংবিধানে সরকারের প্রতি জনগনের জন্য যে সকল নির্দেশনা ও কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে সেগুলো যে সরকারই প্রতিপালন করবে সে সরকারই সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগনের পেটের ক্ষুধার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে জনগনকে ঘরে ঢোকাতে ব্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে সরকারী নির্দেশনায় পুলিশ কর্তৃক লাঠিপেটারও শিকার হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষেরা। যার কোনো অধিকার সরকারের নেই। সমালোচক মহল মনে করেন, যে সরকার জনগনের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনা সে সরকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত সরকার নয়। সে সরকার জনগনের সরকার নয়। সে সরকার দেশবান্ধব সরকার নয়। যদিও সরকার সংশ্লিষ্টরা সারা বছরই নিজেদের জনগনের সরকার হিসেবে মুখে ফেনা তোলে।
সঙ্গতকারণেই আমরা মনে করি, করোনা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা তথা মিডিয়ার অপপ্রচার থেকেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে করোনা নিয়ে সকল প্রকার দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান লকডাউন খুলে দিয়ে সারাদেশে পবিত্র মিলাদ শরীফ পাঠ ও সুন্নতি খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে জনগনকে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আলোকে ছোঁয়াচে নামক বিভ্রান্তি থেকে সরে আসা। সেইসাথে সারাদেশের কোটি কোটি অনাহারী মানুষের খাদ্যের সংস্থান করা, বাজেট বরাদ্দ করে মাঠপর্যায়ে পৌছানো এবং তাদের জীবিকা অর্জনের পথকে সুগম করার ব্যবস্থা করা। দেশে নাগরিকের জীবন সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও গতিশীল করা। মহামহিম, রহমানুর রাহীম, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সহায় হউন। আমীন!

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে