মাহে রমাদ্বান – ৮


রোযা অবস্থায় স্যালাইন, ইনজেকশন, ইনহেলার, ইনসুলিন ইত্যাদি নিলে
অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হবে – পর্ব-২
————————————-
 
# ইনজেকশন ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে “ইমদাদুল ফতওয়া”- এর বক্তব্য খন্ডন — ১ম পর্ব
 
আমরা এবার পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, ফিক্বাহ্ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রমাণ করবো যে, ইনজেকশন সম্পর্কে ইমদাদুল ফতওয়ার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল | যেমন ইমদাদুল ফতওয়ায় প্রথমেই বলা হয়েছে- (মূল ইবারত কমেন্টে স্ক্রীন শর্ট দ্রষ্টব্য)
 
“প্রশ্নঃ- উলামায়ে দ্বীন ও মাসয়ালা সম্পর্কে কি বলেন- বর্তমানে ইনজেকশনের দ্বারা শরীরের ভিতর যে ওষুধ প্রবেশ করানো হয়, তাতে রোযা হবে কি? শরীয়তের দলীল দ্বারা উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন |
জাওয়াবঃ- ডাক্তারদের সাথে তাহক্বীক ও গবেষণার পর এটাই সাব্যস্ত হয় যে, ইনজেকশনের দ্বারা ওষুধ جوف عروق অর্থাৎ শিরার ভিতরে পৌছান হয় এবং شراءين শারাঈন অর্থাৎ যে রগ দিয়ে রক্ত চলাচল করে | অথবা আভেরদাহ অর্থাৎ যে রগ দিয়ে রক্ত চলাচল করেনা, এসকল রগের ভিতর দিয়ে গিয়ে রক্তের সাথে মিশে যায় | ( دماغ ) মগজ অথবা ( بطن ) পেটের ভিতরে প্রবেশ করেনা | অথচ রোযা ভঙ্গ হওয়ার জন্য ওষুধ ইত্যাদি অথবা পেটের ভিতর প্রবেশ করা আবশ্যক |”
 
*******************************************
 
# আমাদের বক্তব্যঃ-
 
ইমদাদুল ফতওয়ার উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়-
 
(১) “ইনজেকশন মগজ অথবা পেটে প্রবেশ করেনা |”
 
(২) “ইনজেকশন রগের ভিতর দিয়ে গিয়ে রক্তের সাথে মিশে যায় |”
মূলতঃ ইনজেকশন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও জ্ঞান না থাকার কারণেই একথা বলা হয়েছে | তাই বন্ধুদেরকে ইনজেকশন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়ার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কিছু আলোচনা করবো |
 
# চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইনজেকশনঃ
 
রোগ নিরাময়ের জন্যে আমরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে ওষুধ সেবন করি | বিভিন্ন DOSAGE FROM- (ডোজেজ ফরম বলতে বোঝায়- ওষুধ গ্রহণের যত রকম পদ্ধতি আছে যেমন- ট্যাবলেট, ক্যাপসুল,
সাসপেনশন, সিরাপ, ইনজেকশন ইত্যাদি)-এর মধ্যে ইনজেকশনও একটি পদ্ধতি |
ইনজেকশন পদ্ধতিটি মূলতঃ Parenteral পদ্ধতির একটি অংশ |
 
Parenteral পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়- The term Parenteral (GK, Para enter on= beside the intestine) refers to the route of administration of drugs by injection under or through one or more layers of skin or mucous membrane. অর্থাৎ পেরেনটারাল পদ্ধতিটি হচ্ছে সেই পদ্ধতি, যেখানে এক অথবা বেশী সংখ্যক শরীরের ত্বকের স্তর অথবা মিউকাস মেমব্রেনের স্তরের মধ্য দিয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে ওষুধ প্রবেশ করানো হয় |
 
—> ইনজেকশনকে পাঁচটি সাধারণ শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে-
 
১. দ্রবণ জাতীয় ইনজেকশন (Solutions ready for injection)
 
২. শুস্ক দ্রব্য, কিন্তু শরীরে ইনজেকশন পদ্ধতিতে দেয়ার পূর্বে কোন দ্রবণে দ্রবীভূত করে নেয়া যায় | যেমন- Dry, soluble products ready to be combined with a solvent just prior to use)
 
৩. সাসপেনশন জাতীয় | (Suspensions ready for injection)
 
৪. শুস্ক অদ্রবণীয় দ্রব্য কিন্তু কোন Vehicle (মাধ্যম)-এ মিশিয়ে দেয়া হয় | (Dry insoluble products ready to be combined with a vehicle just prior to use)
 
৫. ইমালশান জাতীয় | (Emulsion type)
 
এই পাঁচ প্রকার ইনজেকশন আবার বিভিন্ন পথে শরীরে প্রবেশ করানো হয় এবং সাধারণতঃ ওষুধের গুণাগুনের ওপর | যেমন সাসপেনশন জাতীয় ইনজেকশন সরাসরি রক্তে দেয়া হয়না, কেননা সেখানে বড় বড় দানা Blood capillaries অর্থাৎ রক্ত জালিকা বন্ধ করে দিতে পারে | আবার Solution জাতীয় ইনজেকশন ত্বকের স্তর দিয়ে দিতে হলে Tonicity adjustment খুব গুরুত্বপূর্ণ | নতুবা ত্বকে irritation অর্থাৎ জ্বালা হতে পারে |
 
সে কারণেই Injection আবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে দেয়া হয় |
 
এর মধ্যে নিচের মাধ্যমগুলি উল্লেখযোগ্য-
 
১. Intravenous (ইন্ট্রাভেনাস)
 
২. Subcutaneous (সাবকিউটেনিয়াস)
 
৩. Intradermal (ইন্ট্রাডারমাল)
 
৪. Intramuscular (ইন্ট্রামাসকিউলার)
 
৫. Intrathcal (ইন্ট্রাথিকাল)
 
*******************************************
 
Intra areterial (ইন্ট্রা আরটারিয়াল)
 
—–>> Intravenous (ইন্ট্রাভেনাস): এ পদ্ধতিতে Vein (শিরা)-এর মাধ্যমে রক্তে ওষুধ প্রয়োগ করা হয় | এ পদ্ধতিতে ওষুধ সরাররি রক্তে মিশে যায় |
 
—–>> Subcutaneous (সাবকিউটেনিয়াস): শরীরে ত্বকের এবং মিউকাস মেমব্রেনের এক বা একাধিক স্তরের মধ্য দিয়ে এ পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগ করা হয় | তবে এ পদ্ধতিতেও ওষুধ রক্ত স্রোতে মিশে যায় |
 
—–>> Intramuscular (ইন্ট্রামাসকিউলার): এ পদ্ধতেতে ওষুধ শরীরের পেশীসমূহের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো হয় এবং কিছু সময় ওষুধ রক্ত স্রোতে গিয়ে মিশে |
 
—–>> Intrathcal (ইন্ট্রাথিকাল): অনেক সময় CNS (Central Nervous System) অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ওষুধ অন্যান্য পদ্ধতিতে প্রয়োগ করলে বিলম্বে পৌছে, আর সে কারণেই এখন এ পদ্ধতি ব্যবহার করলে ওষুধ সহজেই CNS-এ পৌছে |
 
এটা সহজেই বোঝা যায় যে, ইনজেকশনের যে কোন পদ্ধতিতেই শরীরে ওষুধ প্রয়োগ করা হোক না কেন শরীরে ওষুধের শোষনের কিছু সময় পরেই রক্ত স্রোতের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে | এ ব্যাপারে Goodman Gilman Pharmacology -তে বলা হয়েছে- “Heart, Liver, kidney brain and highly perfused organs receive most of the drug during the first few minutes after absorption.”
অর্থাৎ ওষুধের শোষনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই হৃৎপিন্ড, যকৃৎ, কিডনী, মগজ এবং অন্যান্য অঙ্গে বেশীরভাগ ওষুধ চলে যায় |
 
ওষুধ মূলতঃ রক্তস্রোতের মাধ্যমেই শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে, কেননা রক্তকে বলা হয় Connective tissue Blood-এর সংজ্ঞায় বলা হয়- Blood is vehicle for transport of food nutrients oxygen, Water and all others essentials to the tissue cells and their waste products are carried away. It (blood) is a special type of connective tissue.
অর্থাৎ রক্ত হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে খাদ্য, অক্সিজেন, পানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান টিস্যুসমূহে পৌছে এবং বর্জ দ্রব্যসমূহ বহন করে নিয়ে আসে | এটা এক ধরণের সংযোগ কলা (tissue) সুতরাং blood-এ পৌছে ওষুধ শরীরের সর্বাংশে ছড়ায়, মগজে পৌছে | তবে আমাদের আলোচনার প্রয়োজনে আমরা এবারে মগজে ওষুধ প্রবেশের পথটি বর্ণনা করবো, তবে তার পূর্বে মগজের গঠন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক |
 
# BRAIN- (মগজ)-
 
আমাদের মগজের উপর আছে তিনটি পর্দা-
 
১. Dura Mater (ডুরা মেটার)
 
২. Arachnoid (এ্যারাকনয়েড)
 
৩. Pia Meter (পায়া মেটার)
 
ডুরা মেটারর গঠন একটু পুরু এবং পায়া মেটার অত্যন্ত সুক্ষ্ম একটি পর্দা, যা কিনা BRAIN (মগজ) কে ঢেকে আছে | আর এ দুয়ের মাঝামাঝি হলো এ্যারাকনয়েড | blood venous (রক্ত নালী)-এ তিনটি পর্দা (Meninges) পার হয়ে মগজে বা BRAIN-এ পৌছেছে এবং জালিকার মত মগজের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে আছে |
 
# এ পর্যন্ত আলোচনায় তাহলে আমরা যে ধারণা পেলাম তা হচ্ছে-
১. ইনজেকশন কত প্রকার এবং কত রকম পদ্ধতিতে দেয়া হয়,
২. তা কিভাবে রক্ত স্রোতের মাধ্যমে শরীরের সর্বাংশে ছড়ায়,
৩. বিশেষত মগজের অভ্যন্তরে কি করে ইনজেকশনের পর ওষুধ প্রবেশ করে |
 
এখানে উল্লেখ্য যে, ইনজেকশন সাধারণতঃ দু’ধরণের হয়ে থাকে-
(১) ওষুধ ভিত্তিক ইনজেকশন,
(২) খাদ্য ভিত্তিক ইনজেকশন | উভয়টির একই হুকুম |
 
********************************************
 
আমাদের এতক্ষনের আলোচনায় এটাই দেখেছি যে, যত প্রকারের ইনজেকশন হোক না কেন, তা এক সময় রক্ত স্রোতে মিশবে এবং মগজে পৌছে যাবে |
 
অতএব চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যবহুল আলোচনা দ্বারা স্পষ্টই প্রমাণত হলো যে, ইনজেকশন ইত্যাদি মগজে পৌছে | সুতরাং রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে |
 
কারণ, ফিক্বাহের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে,
وما وصل الى الجوف اوالى الدماغ من مخارقة الاصلية كالانف والاذن والدبر ……… فسدصومه
অর্থাঃ- “যা নাক, কান, পায়খানার রাস্তা ইত্যাদি দ্বারা মগজ অথবা পেটে পৌছবে, তাতে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে | (বাদায়ে)
 
এ প্রসঙ্গে কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়ে যে,
وما وصل الى جوف الرأس والبطن من الاذن والانف وألدبر فهو مفطر بالاجماع
অর্থাঃ- “কান, নাক ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে ওষুধ ইত্যাদি মগজ অথবা পেটে পৌছা সকলের নিকটেই রোযা ভঙ্গের কারণ |”
(খোলাসাতুল ফতওয়া) অনুরূপ হেদায়া, আইনুল হেদায়া, মাবসূত, বাহরুর রায়েক, রদ্দুল মোহতারে উল্লেখ আছে)
 
উপরোক্ত কিতাবসমূহে যদিও ওষুধ ইত্যাদি মূল রাস্তা অর্থাৎ নাক, কান, মুখ ইত্যাদি দিয়ে মগজ অথবা পেটে পৌছার কথা বলা হয়েছে কিন্তু ইমামগণের নিকট মূল রাস্তা শর্ত নয়, যেমন এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে,
وابو حنيفة رحمه الله تعالى يقول المفسد للصوم وصول المفطر الى باطنه فالعنرة للواصلل لاللمسلك (مبسوط)
অর্থঃ- “হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রোযা ভঙ্গের কারণ হলো- রোযা ভঙ্গকারী কোন কিছু ভিতরে প্রবেশ করা, সুতরাং পৌছাটাই গ্রহণযোগ্য, মূল রাস্তা নয় |” (মাবসূত)
 
وابو حنيفة رحمة الله عليه وسلم يعتبر الوصول
আর ফতহুল ক্বাদীর ২য় জিঃ ২৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট পৌছাটাই গ্রহণযোগ্য |”
 
অতএব, মূল রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করুক অথবা মূল রাস্তা ব্যতীত অন্য কোন স্থান দিয়েই প্রবেশ করুক না কেন, যদি মগজ অথবা পেটে পৌছে, তবে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে |
 
{ বিঃদ্রঃ- ওষুধ ইত্যাদি মূল রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করা ও মূল রাস্তা ব্যতীত অন্যকোন রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী পোস্টগুলোতে আসছে }
 
উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, রোজা ভঙ্গকারী কোন কিছু যেমন ওষুধ ইত্যাদি মগজ অথবা পেটে পৌছালে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে | অর্থাৎ ফিক্বাহবিদগণের নিকট রোযা ভঙ্গ হওয়ার জন্যে ইত্যাদি মগজ অথবা পেটে পৌছা শর্ত |
 
আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের বক্তব্যের দ্বারা যেহেতু স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, ইনজেকশন মগজে পৌছে যায়, সেহেতু ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে | অতএব ইমদাদুল ফতওয়ায় যেটা বলা হয়েছে ইনজেকশন মগজে পৌছেনা সেটা সম্পূর্ণ ভুল |
 
(চলবে)
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে