মিরাজ শরীফের সংক্ষিপ্ত বর্ননা।


মি’রাজ শরীফ হলো নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সীমাহীন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশের এক বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা। আর তা হলো কুল-মাখলূক্বাত, বিশেষ করে ফেরেশতা, জিন ও ইনসান তারা সম্যকরূপে অবগত নয় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার যিনি হাবীব, যিনি কুল-কায়িনাতের নবী ও রসূল, নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে খালিক্ব, মালিক, রব, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার কী সম্পর্ক রয়েছে; সেটা জানানো ও বুঝানোর জন্যেই মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত প্রকাশের একাদশ বছরে মি’রাজ শরীফ-এর আনুষ্ঠানিকতার ব্যবস্থা করেন। এখানে বিশেষভাবে জানার বিষয় হলো, এই মি’রাজ শরীফেই যে কেবল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক দীদার লাভে ধন্য হয়েছেন তা নয়। বরং সৃষ্টির শুরু থেকেই তিনি মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার মুবারক দীদারে ছিলেন, এখনও আছেন এবং অনন্তকাল ধরে থাকবেন। সুবহানাল্লাহ! যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে, স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন- “খালিক্ব, মালিক, রব, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার সাথে আমার প্রতিটি মুহূর্ত বা সময় এমনভাবে অতিবাহিত হয়, যেখানে কোনো নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম এবং কোনো নৈকট্যশীল ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা পৌঁছতে সক্ষম নন।” (জামিউছ ছগীর)হযরত উলামায়ে কিরামগণ উনাদের পরিভাষায় মসজিদে হারাম অর্থাৎ বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে মসজিদে আক্বছা অর্থাৎ বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফ পর্যন্ত ভ্রমণকে ইছরা বলা হয়। আর মসজিদে আক্বছা থেকে ছিদরাতুল মুনতাহা অতঃপর সেখান থেকে মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক সাক্ষাৎ পর্যন্ত ভ্রমণকে মি’রাজ শরীফ বলা হয়। কখনো কখনো উভয় ভ্রমণকে একত্রে ইসরা ও মি’রাজ বলা হয়। উল্লেখ্য, ‘ইসরা’-এর শাব্দিক অর্থ হলো রাতের বেলা ভ্রমণ করা। আর মি’রাজ-এর শাব্দিক অর্থ হলো সিঁড়ি বা সোপান। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ২৭শে রজব সোমবার রাতের বেলা বোরাকে চড়ে বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফ-এ গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে সমস্ত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইমাম হয়ে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন। নামায শেষে বাইতুল মুক্বাদ্দাস শরীফ থেকে বের হওয়ার পর উনার জন্য বেহেশত থেকে যমরদ ও যবরযদ পাথরের একটি সিঁড়ি আনয়ন করা হয়। তিনি পুনরায় বোরাকে সওয়ার হয়ে উক্ত সিঁড়ির উপর দিয়ে ভ্রমণ ও পরিদর্শন করে করে সপ্তাকাশ গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে বাইতুল মা’মূর যা হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ক্বিবলা, জান্নাত, জাহান্নাম, শরীফুল আক্বলাম অর্থাৎ তাক্বদীর ও বিধি-বিধান লিপিবদ্ধ করার দফতর, ছিদরাতুল মুনতাহা ইত্যাদি নিদর্শনসমূহ পরিদর্শন করেন। অতঃপর সেখান থেকে সবুজ রঙের ‘রফরফ’ নামক মখমলী আসন মুবারক-এ উপবেশন করে বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত নূরের পর্দাসমূহ অতিক্রম করে অবশেষে মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার পবিত্র দরবার শরীফ-এ পৌঁছেন ও উনার পরম দীদারে মিলিত হন। সুবহানাল্লাহ!এ মর্মে কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে- “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন ও ঝুঁকে গেলেন, অতঃপর ধনুকের দু’মাথা যেরূপভাবে মিলিত হয় তদ্রপ, বরং তার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী হলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যা ওহী করার তা করেন।” (সূরা নজম-৮,৯,১০)অর্থাৎ কোনো ব্যবধান ও মাধ্যম ব্যতীত দীদার ও কথোপকথন হয়। সুবহানাল্লাহ! হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে এক সুদীর্ঘ হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কথোপকথনকালে বলেন, “আমি আপনাকে আমার হাবীব ও খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছি। সমগ্র মানবজাতির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী আর জাহান্নামের ব্যাপারে ভয়প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। আপনার বক্ষ মুবারক সম্প্রসারিত করেছি। আপনার দায়িত্বের বোঝা সহজ করে দিয়েছি। আপনার আলোচনাকে সমুন্নত করেছি। আমার অদ্বিতীয়তা ও তাওহীদের বাণীর সাথে আপনার রসূল হওয়া ও বান্দা হওয়ার বাণীকে সংযোজন করেছি। আপনার উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং মধ্যপন্থা অবলম্বী উম্মত বানিয়েছি। মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের অভ্যুদয়। মর্যাদা ও সম্মানের দিক দিয়ে তাদেরকে প্রথম কাতারের উম্মত আর আবির্ভাবের দিক দিয়ে সর্বশেষ উম্মত বানিয়েছি। আপনার উম্মতের মধ্যে এমন কতক লোক জন্মগ্রহণ করবেন যাদের অন্তরে আমার কালাম লিপিবদ্ধ থাকবে। অস্তিত্বের দিক দিয়ে আপনি সর্বপ্রথম নবী আর যমীনে আগমনের দিক দিয়ে সর্বশেষ নবী। আপনাকে সূরা ফাতিহা হাদিয়া করেছি। আপনার পূর্বে অন্য কেউ এ সূরা লাভ করেনি। আপনাকে আরশের নিচে রক্ষিত খনি থেকে সূরা বাক্বারার শেষাংশের আয়াত শরীফসমূহ হাদিয়া করেছি। আপনার পূর্বে কোনো হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে তা হাদিয়া করিনি। আপনাকে হাউজে কাওছার হাদিয়া করেছি। বিশেষ করে আটটি বিষয় আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে। মুসলমান হওয়ার উপাধি, হিজরত, জিহাদ, নামায, ছদকা, রমাদ্বান মাসের রোযা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কার্যের নিষেধ। (খাছায়িছুল কুবরা)অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা স্বীয় সান্নিধ্যে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন। বিভিন্ন প্রকার সুসংবাদ দান করে উনাকে আনন্দিত করেন। বিশেষ বিশেষ বিধি-বিধান ও বিভিন্ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেন। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো উনার উম্মতের দায়িত্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা। অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রদত্ত বিভিন্ন বিধি-বিধান ও দিক-নির্দেশনা ও সুসংবাদসহ আনন্দের সাথে প্রত্যাবর্তন করেন। সুবহানাল্লাহ!

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে