মুসলিম শাসনামলে বাংলায় এবং উত্তরভারতে দেশবিভাগের আগপর্যন্ত শিক্ষিত হিন্দুদের সংস্কৃতি ছিল ‘মুসলমানী সংস্কৃতি’


মুসলিম শাসনের সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষিত হিন্দুদের সংস্কৃতি নিয়ে প্রাবন্ধিক নীরদ সি চৌধুরী তার রচিত ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছে- “বাঙালি হিন্দু পুরুষ ইংরেজ রাজত্বের আগে একমাত্র মুসলমান নবাবের কর্মচারী হইলে মুসলমানী পোষাক পরিত, উহা অন্দরে লইয়া যাওয়া হইত না। বাহিরে বৈঠকখানার পাশে একটা ঘর থাকিত, সেখানে চোগা-চাপকান-ইজার ছাড়িয়া পুরুষেরা ধুতি পরিয়া ভিতরের বাড়িতে প্রবেশ করিত। তাহার প্রবেশদ্বারে গঙ্গাজল ও তুলসীপাতা থাকিত, মেøচ্ছ পোষাক পরিবার অশুচিতা হইতে শুদ্ধ হইবার জন্য পুরুষেরা গায়ে গঙ্গাজল ছিটাইয়া মাথায় একটা দুইটা তুলসীপাতা দিত।…মুসলমান যুগে সম্পন্ন বাঙালী হিন্দু সামাজিক মর্যাদার খাতিরে মুসলমানী পোষাক পরিত ও ফারসী বলিত। ইহার পর তাহারা ইউরোপীয় ধরণের পোষাক পরিয়া ইংরেজিতে কথা বলিতে লাগিল।” কলকাতায় যেহেতু ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের রাজধানী ছিল, সেহেতু বাংলাদেশে ব্রিটিশদের দালাল শ্রেণী হিসেবে বাঙালি হিন্দুদের প্রভাব বেশি ছিল। কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে তা ছিল না। ফলে সেসব জায়গায় এমনকি সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের পরও মুসলিমপ্রধান সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। এ নিয়ে আক্ষেপ করে নীরদ সি চৌধুরী ১৯৬৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকাতে প্রকাশিত ‘হিন্দুর মুসলমানী পরিচ্ছদ কেন?’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে- “বাংলাদেশের সঙ্গে হিন্দুস্তানের (উত্তরভারতের) যে বড় সামাজিক ও সংস্কৃতিগত প্রভেদ গত দুই-তিন শত বৎসর ধরিয়া (অর্থাৎ ব্রিটিশআমলের সময়টিতে) দেখা গিয়াছে তাহা এই- আমাদের (হিন্দুদের) মধ্যে নাগরিক, সভ্য ও বিদগ্ধ জনরা হিন্দু; আর মুসলমানরা প্রধানত গ্রামবাসী, কৃষক। আর আগে হিন্দুস্তানে ছিল ইহার উল্টা- হিন্দুরা প্রধানত গ্রামবাসী, কৃষক, খুব বেশি হইলে দোকানদার; আর মুসলমানরা ছিল নাগরিক সভ্যতার অবলম্বন। তাই হিন্দুস্তানে হিন্দু মাত্রেই সভ্য বলিয়া গৃহীত হইতে চাহিলে মুসলমানী রীতি ধরিত, অর্থাৎ তাহাদের (হিন্দুদের) ভাষা হইত উর্দু-ফার্সী, পোষাক হইত আচকান ইত্যাদি, আদব-কায়দাও হইত মুসলমানসুলভ। এখন যেমন সামাজিক প্রতিষ্ঠা জন্য লোকে ‘সাহেব’ হইতে চায়, তখন তাহারা মুসলমান হইত। ইহা ছাড়া সামাজিক জীবনে বিদগ্ধ হিন্দু, মুসলমানেরই সঙ্গে মেলামেশা করিত বেশি।” (সূত্র: নির্বাচিত প্রবন্ধ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, পৃষ্ঠা ২২৩) অর্থাৎ ভারতবর্ষের বুকে মূলধারার সভ্য-সংস্কৃতির ধারক-বাহক হচ্ছে মুসলমানগণ। হিন্দুরা যদি সভ্য হতে চাইত, তাহলে তারা মুসলমানদের মতোই হতো। বিপরীতে বর্তমানে যেই হিন্দু সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার চলছে, তা হচ্ছে- ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনামলে প্রচলিত মূলধারার সভ্য সংস্কৃতি বহির্ভূত সমাজচ্যুতদের সংস্কৃতি। ব্রিটিশআমলে কলকাতার পতিতালয়গুলোকে কেন্দ্র করে এই সংস্কৃতির উদ্ভব।
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে