মূর্তিপূজারী সম্প্রদায়ের কৃত্রিম ‘আভিজাত্য’


পৃথিবীতে যেসব বংশ অভিজাত বংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোন না কোন বীরপুরুষ কিংবা স্বাধীনতাকামী রাজার সন্ধান মেলে। যে রাজা বা বীরপুরুষ কোন গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছে, কিংবা তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে।
কিন্তু বাঙালি মূর্তিপূজারীদের ইতিহাসে কখনোই তাদের কোন রাজবংশের অস্তিত্ব ছিলনা। কিন্তু তারপরও তারা তাদের মুসলিম মনিবদেরকে সরিয়ে রাতারাতি ‘অভিজাত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজরা আসার পর। এই কথিত ‘আভিজাত্য’ তারা অর্জন করেছিল ইংরেজদের ঔরসে তাদের মা বোনদের গর্ভে শ্বেতাঙ্গ পূজারী সন্তানের জন্ম দিয়ে। এ প্রসঙ্গে ধনঞ্জয় দাস মজুমদার তার ‘বাঙলা ও বাঙালির ইতিহাস’ বইতে উল্লেখ করেছে
“মুসলমান যুগে আরব ও পারস্যের পদস্থ রাজকর্মচারীগণকে যাহারা আপন আপন স্ত্রী বা পুত্রবধূদিগকে ‘ডোলা’ দিয়া চাকুরী করিত, তাহাদের বংশধরগণ অনুরূপভাবে ইংরেজ কর্মচারীদের ‘ডোলা’ দিয়া আপন আপন পরিবারবর্গকে শ্বেতাঙ্গ করিয়া সমাজে আভিজাত্যের সৃষ্টি করিত।”(পৃষ্ঠা ৬১)
ব্রিটিশদের অবৈধ ঔরসজাত সন্তান জন্ম দেয়ার পেছনে শুধু মূর্তিপূজারীদের নয়, ব্রিটিশদেরও স্বার্থ জড়িত ছিল। গোলাম আহমদ মোর্তজা তার রচিত ‘বজ্রকলম’ বইতে উল্লেখ করেছে-
“এই বিদ্রোহের (সিপাহী বিদ্রোহ) সময় কলিকাতার ইংরেজসৃষ্ট কায়স্থ ব্রাহ্মাণ জমিদারেরা এবং বৌবাজারের খালিকুঠিতে সৃষ্ট শ্বেতাঙ্গ মূর্তিপূজারী কর্মচারীরা সমগ্র ভারতের মধ্যে মিরাট, লখনৌ, ঝাঁসি, বেরেলী, দমদম, বারাকপুর এবং বালিগঞ্জে ইংরেজদিগকে রক্ষা করিয়াছিল। পরে তাহাদের গোয়েন্দাগণ পলাতক সিপাহীগণকে গ্রেফতার করতে সাহায্য করে।”
অর্থাৎ ইংরেজরা এসব অবৈধ মূর্তিপূজারীসন্তানদের জন্ম দিয়ে তাদের কৃত্রিম আভিজাত্য সৃষ্টি করেছিল, যেন তারা তাদের মায়েদের ব্রিটিশ উপপতিদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা করে চলে।
নিজের মা বোনদের পরপুরুষের বিছানায় পাঠিয়ে কথিত ‘আভিজাত্য’ লাভের ন্যক্কারজনক নজির পৃথিবীর আর কোন জাতির ইতিহাসেই নেই। কিন্তু পরগাছা যত বিশালই হোকনা কেন, তার কখনোই শেকড় থাকে না; যাকে আঁকড়ে ধরে সে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে। বাঙালি মূর্তিপূজারীর কৃত্রিম আভিজাত্যের মুখোশও খসে পড়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, যখন মূর্তিপূজারী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষে। বাঙালি মূর্তিপূজারী তার অতীত ইতিহাস থেকে মূর্তিপূজারী সন্ত্রাসবাদের প্রেরণা হিসেবে কাউকে হাজির করতে পারেনি, যে কারণে তার অবস্থান হলো ভারতীয় মূর্তিপূজারী সম্প্রদায়ের সবার নিচে। কারণটা আগেই বলা হয়েছে, তাহলো বাঙালি মূর্তিপূজারীর ইতিহাসে কোন রাজবংশ নেই। মোটকথা বাঙালি মূর্তিপূজারী সম্প্রদায়ের কোন শেকড় বাংলার মাটিতে নেই। এই পরগাছা বাঙালি মূর্তিপূজারী সম্প্রদায় বীরত্ব দিয়ে কিছু অর্জন করেনি। যা করেছে, কথিত আভিজাত্য যা পেয়েছে সব শাসকগোষ্ঠীকে তেল দিয়েই পেয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ প্রসঙ্গে যা বলেছিল তা দিয়েই লেখাটি শেষ করছি,
“বাঙালী মূর্তিপূজারীর বল নাই, বিক্রম নাই, বিদ্যাও নাই, বুদ্ধিও নাই। সুতরাং বাঙালী মূর্তিপূজারীর একমাত্র ভরসা তৈল। বাঙালী মূর্তিপূজারীদিগের যে কেহ কিছু করিয়াছে, সকলই তৈলের জোরে, তাহাদের তৈলের মূল্য অধিক নয়; এবং কি কৌশলে সেই তৈল বিধাতৃপুরুষদিগের সুখসেব্য হয়, তাহাও অতি অল্পলোক জানে। যাহারা জানে, তাহাদিগকে আমরা ধন্যবাদ দিই। তাহারাই আমাদের দেশের বড় লোক, তাহারাই আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করিয়া আছে।”

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে