প্রসঙ্গ: মেট্রোরেল


মেট্রোরেলের ফলাফল আর যাই হোক না কেন, এতে অন্ততঃ যানজট কমবে না বরং দ্বিগুন হতে বাধ্য।

অন্য সব কারণ বাদ দিয়ে শুধু একটা কারনই বিবেচনা করা হোক। সেটা হচ্ছে, যে ষ্টেশনগুলোতে রেল থামবে সেখান থেকে যাত্রীদের গন্তব্য স্থলে যাওয়ার বা আসার বাহন কি হবে? রিক্সা, সিএনজি, নাকি পাঠাও-উবার ইত্যাদি। আর তাছাড়া সেগুলোর ওয়েটিং এর জন্যে কোন অবকাঠামোর ব্যবস্থা তো চোখে পড়ে না।

অতএব, ঢাকা শহরের যানজট মেট্রোরেলের কারনে কমে যাবে এটা যারা আশা করেন তারা বোকার স্বর্গেই বাস করছেন। বাস্তবতা হলো যে, সব পাত্রেরই যেমন একটা ধারন ক্ষমতা থাকে যা অতিক্রম করলেই পাত্রের ভেতরের জিনিষ বাহিরে উপচে পড়ে – তেমনি এই শহরের বসবাসকারী মানুষ এবং তাদের যানবাহন এই শহরের ধারন ক্ষমতার অনেক বাইরে চলে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ বছর পরে এমন একদিন আসবে যেদিন দেখা যাবে যে নিজের গ্যারেজ থেকে গাড়ী আর রাস্তায় বেরই করা যাচ্ছে না। এখনিই তো সকাল-সন্ধ্যা পাড়া মহল্লাগুলোর অলিগুলো পর্যন্ত জ্যামের কারনে সব বন্ধ হয়ে থাকে।

যানজট কমানোর যে স্বপ্ন দেখিয়ে মেট্রোরেল তৈরী করা হচ্ছে সেই স্বপ্ন পূরন হবার কোন সম্ভাবনাই যে নেই, সেটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ –

 

১. মেট্রোরেলে করে মানুষ যাবে, গাড়ী নয়। এখন রাস্তায় যে পরিমান গাড়ী চলছে, তখনও তো একই পরিমান গাড়ীই চলবে, একই পরিমান রিকশাও চলবে, বাসও চলবে। সুতরাং, কিছু সংখ্যক মানুষ যেহেতু মেট্রোরেলে যাবে, তাই তখন রাস্তার গাড়ীগুলোতে হয়তো মানুষের চাপ একটু কমবে ঠিকই কিন্তু, গাড়ীর সংখ্যা তো আর কমবে না। অতএব, যানজটও কমার কোন কারণ নেই।

 

২. প্রতিদিন অফিসে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে এবং আসতে যাতায়ত খরচ বাবদ বর্তমানে একটি পরিবারের যে খরচ হয় তখন তার দুই থেকে তিনগুন বেশী খরচ হবে। কারণ, মেট্রোরেলের ভাড়া বাস ভাড়ার অন্তত দ্বিগুন তো হবেই, তিনগুনও হতে পারে।  আর মেট্রোরেল স্টেশনে যাওযা আসার ভাড়া ইত্যাদি খাতেও খরচ বাড়বে। বিমানবন্দর থেকে নরসিংদী বর্তমান আন্তঃনগর (তিতাস কমিউটার) ট্রেন ভাড়া ৪০ টাকা। অথচ উত্তরা থেকে মতিঝিল মেট্রোরেল ভাড়াই হবে ১০০ টাকার বেশী।

 

৩. বর্তমানে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে ৫০% গাড়ী চলে যায় এবং বাকী ৫০% ফ্লাইওভারের নীচ দিয়ে যাওয়ায় ফ্লাইওভারের নীচে যানজট কম হয় কিন্তু মেট্রোরেলের উপর দিয়ে কোন গাড়ী তো যাবেই না, বরং মেট্রোরেলের জন্য নীচের রাস্তা চিকন হয়ে গিয়ে সেখানে তীব্র যানজট তৈরী হবে।

 

৪. মেট্রোরেল চালু হলে সেটা হয়ত কিছুদিন ভালই চলবে। কিন্তু, পরে যদি দেখা যায় যে বাসওয়ালাদের পেটে লাথি পড়ছে তখন সরকার মেট্রোরেলকে এমন সিস্টেমে ফেলে দেবে, যেমনটা বর্তমান রেলওয়েকে ফেলে রাখা হয়েছে। যারা নিয়মিত কমলাপুর টু বিমানবন্দর ট্রেনে যাতায়াত করেন শুধুমাত্র তারাই আমার এই বক্তব্যের বাস্তবতাটা বুঝবেন।

“পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা লাগবে” টাইপের গুজব হয়ত মেট্রোরেলের বেলায় ছড়ায় নি। কিন্তু, আমার মনে হয়,  আচিরেই মেট্রোরেলেরই গলার কাটা যাবে। কারণ, পরিচর্যার অভ্যাস যে জাতির নেই, সে জাতির জন্য এমন প্রকল্প ভয়ংকর হয়ে উঠে। রেল কর্তৃপক্ষ যে পরিমাণ অদক্ষ তাতে তারা যে মেট্রোরেলের পরিচর্যা করতে পারবে না এটা শতভাগ নিশ্চিত। আর সাধারণ যাত্রীরাও যে অনেক দ্বায়িত্ববান সেটা বাসের সিটের কাভার, বাসের মেঝেতে বাদামের খোসা , বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট, কাগজের স্তুপ দেখলেই বোঝা যায়।

মেট্রোরেলের এই কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে জনগনের যে পরিমান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে তার মুল্য উসুলে মেট্রোরেলের জীবনকাল পার হয়ে যাবে। আর শারীরিক, মানসিক, অফিসিয়াল টর্চার এগুলোর মুল্য যোগ করলে মেট্রোরেল জনগণের কাছে আজীবন ঋনি হয়ে থাকবে। ফুটপাত দখলমুক্ত না করা, লেন প্রবর্তন না করা, রাস্তার মোড়গুলোতে বুয়েটের মডেল ফলো না করা, ইত্যাদি কারণে মেট্রোরেল অচিরেই এক মাকাল ফল মার্কা প্রকল্পে পরিণত হতে যাচ্ছে। অথচ, মেট্রোরেল প্রকল্প ঢাকা শহরের সবুজের শেষটুকুও চুষে নিয়েছে। যেনো এই শহরে আর গাছেপালার কোন দরকার নেই।

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে