মৌমাছি ও তার মৌচাক নির্মাণ: এক অনন্য বিষ্ময়!


মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ করেন,

وَأَوْحَىٰ رَ‌بُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ‌ وَمِمَّا يَعْرِ‌شُونَ 0 ثُمَّ كُلِي مِن كُلِّ الثَّمَرَ‌اتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَ‌بِّكِ ذُلُلًا ۚ يَخْرُ‌جُ مِن بُطُونِهَا شَرَ‌ابٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِّلنَّاسِ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُ‌ونَ

অর্থ: আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ দিলেন, পর্বতগাত্রে, বৃক্ষ ও উঁচু চালে মৌচাক নির্মাণ কর। এরপর সর্বপ্রকার ফল হতে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথ সমূহে চলমান হও। তার পেট হতে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরা নাহল, আয়াত শরীফ: ৬৮-৬৯)

মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশের প্রতিফলন আমরা মৌমাছির মধ্যে দেখতে পাই। মৌমাছি বিভিন্ন উঁচু স্থানে তাদের মৌচাক তৈরি করে, বিভিন্ন ফুল হতে পরাগ আহরণ করে এবং তা হতে মধু উৎপাদন করে। উৎপাদিত মধু মৌচাকে সংরক্ষণ করে।

সংগৃহীত ফুলের পরাগ হতে মূলত স্ত্রী মৌমাছিরাই (কর্মী মৌমাছিরা) মধু উৎপাদন করে। যা অনেক গবেষণার পরীক্ষালব্দ ফল। অথচ মহান আল্লাহ পাক তিনি ১৪০০ বছর পূর্বেই মানবজাতিকে এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন- ভক্ষণ কর, উন্মুক্ত পথ সমূহে চলমান ও তার পেট – এ শব্দ তিনটির ক্ষেত্রে আরবীতে যথাক্রমে فَاسْلُكِي ,كُلِي ও بُطُونِهَا শব্দ ৩টি ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্ত্রীবাচক শব্দ। এখানে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করে কর্মী মৌমাছিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু উক্ত শব্দগুলো পুরুষবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি অর্থাৎ পুরুষ মৌমাছিকে ইঙ্গিত করা হয়নি। পুরুষ মৌমাছিকে ইঙ্গিত করা হলে فَاسْلُكْ ,كُلْ ও بُطُونِهِ শব্দ ৩টি ব্যবহৃত হতো।

মৌমাছিদের মৌচাক তৈরির ক্ষেত্রেও একটি আশ্চর্য বিষয় পরিলক্ষিত হয়। কেউ মৌমাছির একটি বৃহৎ দল কর্তৃক মৌচাক নির্মাণ দৃশ্য দেখলে অবশ্যই নির্মাণের ফলাফলের কথা চিন্তা করে দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে যেতে পারে। পরস্পর স্বাধীনভাবে কার্যরত এই প্রাণীকে দেখে মনে হতে পারে যে, সম্ভবত তারা মনোরম অবকাঠামোটি গড়ে তুলতে পারবে না। আবার বিপরীত দিকে, তারা কঠোরভাবে নির্দেশ পালনের মনোভাব নিয়ে একতাবদ্ধভাবে কাজটি করছে। বস্তুত, বিভিন্ন অবস্থান হতে তারা মৌচাক নির্মাণের কাজ শুরু করলেও সবাই ঠিকই একই আকারের প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করে এবং মৌচাকের মাঝখানে এসে কাজটি সমাধা করে । মৌচাকের মাঝে এসে যখন সবার কাজটি শেষ হয় তখন জোড়া দেয়ার স্থানটি আর বোঝা যায় না। এমনকি একটি প্রকোষ্ঠ একাধিক মৌমাছি তৈরি করলেও তাতে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না।

আরেকটি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মৌমাছি তার মৌচাক তৈরির সময় প্রকোষ্ঠগুলো ষড়কোণী করে তৈরি করে থাকে। এ বিষয় নিয়েও বিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা করেছে। গবেষণায় যে বিষয়টি পাওয়া যায় তা হলো-

মৌচাকের প্রকোষ্ঠ যদি বৃত্তাকার বা অন্য কোন আকৃতি যেমন অষ্টকোণী বা পাঁচকোণী হয় তবে প্রকোষ্ঠগুলোর মধ্যে খালি স্থান থেকে যায়। এতে শুধুমাত্র স্থানের অপচয়ই হয় না বরং মৌমাছি মৌচাকের সব দেয়ালগুলোর জন্য কিংবা প্রতিটি প্রকোষ্ঠের অংশ বিশেষের জন্য পৃথক দেয়াল নির্মাণ করতে বাধ্য হয়। ফলশ্রুতিতে মৌচাক তৈরির উপাদানের অপচয় ঘটে।চিত্র: প্রকোষ্ঠগুলো বৃত্তাকার, অষ্টকোণী বা পাঁচকোণী হলে প্রকোষ্ঠগুলোর মধ্যে খালি স্থান (কালো স্থানগুলো) থেকে যায়। ফলে বৃত্তাকার প্রকোষ্ঠের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকোষ্ঠের পৃথক দেয়াল নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে আর অষ্টকোণী বা পাঁচকোণী প্রকোষ্ঠ হলে প্রকোষ্ঠের অংশ বিশেষের জন্য দেয়াল নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে ।

কেবলমাত্র ত্রিকোণী, চতুষ্কোণী কিংবা ষড়কোণী প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করলে এই অপচয় রোধ করা সম্ভব। তবে শর্ত হচ্ছে ত্রিকোণী, চতুষ্কোণী (বর্গাকৃতি) কিংবা ষড়কোণী প্রকোষ্ঠের গভীরতা একই থাকলেই সমপরিমাণ বস্তু ধারণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই তিনটি জ্যামিতিক অবয়বের সমান ক্ষেত্রফল হলেও ষড়কোণী অবয়বের পরিধি হচ্ছে সবচেয়ে ছোট। এর মানে হল, একই ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করতে হলে, ত্রিকোণী কিংবা চতুষ্কোণী প্রকোষ্ঠের তুলনায় ষড়কোণী প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করলে অবশ্যই সবচেয়ে কম পরিমাণ নির্মাণ উপাদানের প্রয়োজন হবে। তাই কোন বস্তু গুদামজাতের জন্য অর্থাৎ মধু সংরক্ষণের জন্য মৌচাকের ষড়কোণী প্রকোষ্ঠ হচ্ছে সবচেয়ে সাশ্রয়ী নকশা। চিত্র: প্রকোষ্ঠগুলো ত্রিকোণী, চতুষ্কোণী কিংবা ষড়কোণী হলে প্রকোষ্ঠগুলোর মধ্যে খালি স্থান (কালো স্থানগুলো) থাকে না। ফলে নির্মাণ উপাদানের অপচয় ঘটে না।

মৌচাক নির্মাণের সময় মৌমাছিকে পৃথকভাবে তিনটি কোণের ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হয়।

১) প্রতিটি প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরীণ কোণ

২) অনুভূমিক থেকে প্রকোষ্ঠের ঊর্ধ্বাভিমুখী কোণ বা অক্ষদণ্ডের কোণ

৩) প্রকোষ্ঠগুলোর গোড়ায় সমবাহু বিশিষ্ট রম্বসগুলোর কোণের পরিমাপ

মৌমাছি সর্বদা অভ্যন্তরীণ কোণের পরিমাপ ১২ ডিগ্রী বজায় রেখে ষড়কোণী প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করে। মৌচাক নির্মাণের সময় অন্য যে কোণটি ঠিক রাখার জন্য মনোযোগ দিতে হয় তা হচ্ছে অক্ষদণ্ডের কোণ অর্থাৎ প্রকোষ্ঠগুলো ভূমির সাথে কতটুকু কাত হয়ে থাকতে হবে। প্রকোষ্ঠগুলো যদি ভূমির সাথে সমান্তরাল হয় তাহলে প্রকোষ্ঠে রক্ষিত মধু গড়িয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। তাই অক্ষদণ্ডের সাথে ১৩ ডিগ্রী কোণে প্রকোষ্ঠগুলো নির্মাণ করে মধু গড়িয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। তৃতীয় কোণটির বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

চিত্র: মৌমাছি কর্তৃক নির্মিত মৌচাক-এর সম্মুখ ও আড়াআড়ি দৃশ্য

আমরা বুঝতে পারলাম যে, মৌচাক একটি বিশেষ অবকাঠামো। মূলত মহান আল্লাহ পাক উনার অসীম প্রজ্ঞা ও স্থাপত্যশৈলীর একটি অনুপম নিদর্শন হলো মৌমাছি কর্তৃক মৌচাক নির্মাণ।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. খুবই সুন্দর পোস্ট।ভাল লাগলো।এই রকম আরো পোস্ট চাই। Clover

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে