যিনি মহিয়ান!


aa
কদম মুবারক

জন্ম ও শৈশব :

ইসলামী জগতের প্রাতঃ গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিলাদত শরীফ থেকে বিছাল শরীফ পর্যন্ত আমরা যে ওয়াকিয়া বা ইতিহাস দেখতে পাই; তার মধ্যে হাজারো নছীহত বা ইবরত রয়ে গেছে। আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ করেন, “সাবধান! নিশ্চয় যাঁরা আল্লাহ পাক উনার ওলী উনাদের কোনো ভয় নেই এবং চিন্তা-পেরেশানীও নেই।”
বড়পীর হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর সম্পর্কে পূর্ববর্তী আওলিয়া-ই-কিরামগণ ভবিষ্যতবানী করে গেছেন। আওলাদে রসুল এবং আহ্লে বাইতের অন্তর্ভূক্ত হযরত ইমাম জাফর সাদিক রহমতুল্লাহি আলাইহি (যিনি হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর পীর সাহেব ছিলেন) তিনি তাঁর কাশফূল গুয়ুব নামক কিতাবে বড়পীর হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন ১৪৮ হিজরীর ১১ই রজব জুম্মার রাত্রে আমি যথারীতি কোরআন শরীফ তিলওয়াত ও যিকির আযকার করে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে স্বপে¦ দেখতে পাই, আমি আলমে নাসুথ থেকে (পৃথিবী হতে) উর্ধারোহন করে আলমে মালাকুত এবং আলমে মালাকুত থেকে আলমে জাবারুতে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে এক বিশাল ময়দান দেখতে পেলাম। সেই ময়দানের এক পার্শ্বে মারোয়ারী পাথরের একটা তাবু টাঙানো। সেখান থেকে আল্লাহ্র রসুল সাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) আমার কাছে এসে বললেন, “হে ইমাম জাফর সাদিক (রঃ), আল্লাহ্র রসুল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে ডাকছেন। আমি সাথে সাথে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গেলাম। দেখলাম সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ও আওলিয়া\ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি গণের পবিত্র রূহ মোবারক সেখানে উপস্থিত আছেন। এবং সমস্ত ফিরিশতা কাতারবন্দী হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা খুব সুন্দর আসনের মধ্যে আল্লাহ্র রসুল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বসা অবস্থায় আছেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখা মাত্র বসার জন্য ইশারা করলেন। আমি বসলাম। বিছুক্ষনের মধ্যে হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস্ সালাম ও ইমাম হুসাইন আলাইহিস্ সালাম হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম এর পার্শ্বে এসে বসলেন। ইত্যবসরে দেখা গেল দু’টি রূহ মোবারক এসে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম এর ডান জানু মোবারক ও বাম জানু মোবারকে বসলেন। বসার পর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে ইমাম জাফর সাদেক রহমতুল্লাহি আলাইহি আজ থেকে তিনদিন পর তুমি আমার কাছে চলে আসবে। আমি চাই তুমি আলমে জাবারুতের অবস্থা দর্শন করে তা আলমে নাসূতের মধ্যে লিপিবদ্ধ করে আস। একথা বলার পর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি কি জান এ রূহ দু’টি কার? আমার ডান জানু মোবারকে যার রূহ মোবারক দেখতে পেলে তিনি আমার থেকে পাঁচশত বৎসর পর পৃথিবীতে আগমন করবেন। তিনি হলেন গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আমার বাম জানু মোবারকে যে রূহটি আছেন তিনি হলেন, হযরত আলী আহম্মদ সাবের কালিয়ারী রহমতুল্লাহি আলাইহি । আল্লাহ্ পাক তাঁর এ দুই খাস মকবুল বান্দা দ্বারা ইসলামের অনেক খিদমত নিবেন। তারপর পার্শ্বে বসে থাকা অবস্থায় হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দ্বয়কে বললেন, “তোমাদের শাহাদাতের পর আমি আমার উম্মতের কথা ভেবে চিন্তিত হই। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁর এই দুই মাহ্বুব বান্দা দ্বারা আমাকে সুসংবাদ দান করেন। হযরত ইমাম জাফর সাদেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি উক্ত স্বপ¦ দেখার পর ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং সকালে উঠে কাশফুল গুয়ুব কিতাবে তা লিপিবদ্ধ করলাম।” এই কাশফুল গয়ুব কিতাব তিনি ইন্তিকালের পূর্বেই লিখেছিলেন এবং সত্যিই তিনি তিনদিন পরেই ইন্তিকাল করেন। সেই দুই মাহবুব বান্দার অন্যতম একজন মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি। সুবহানাল্লাহ!
হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ আছে, “প্রত্যেক হিজরী শতকের শুরুতে আল্লাহ পাক তিনি এই উম্মতের ইছলাহর জন্য এমন লোক প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনের সংস্কার করবেন।” অর্থাৎ বিদয়াত, বেশরা এবং শরীয়ত বিগর্হীত কাজগুলোর সংশোধন করবেন। স্মরনীয় আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব,দরবেশকুল শিরোমনি, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি  ১লা রমজানুল মোবারক হিজরী ৪৭০ বা ৪৭১ সালে পারস্যের এক বিখ্যাত জনপদ ‘জিলানে’ এ জনপদে বিলাদত (জন্মগ্রহন) করেন। উনার বংশতালিকায় পিতা সায়েদ শেখ আবু সালেহ  রহমতুল্লাহি আলাইহি  এর একাদশতম উর্ধ্বতন পুরুষ হযরত হাসান  আলাইহি সালাম এবং তার মাতা সা’ইয়িদুনা হযরত যাহারা আলাইহাস সালাম এর চৌদ্দতম উর্ধ্বতন পুর্বপুরুষ ছিলেন হযরত ইমাম হোসেইন আলাইহি সালাম।এভাবেই তিনি পিতৃ সুত্রে হাসানী ও মাতৃ সুত্রে হোসাইনী বংশধারার উত্তরসুরী। বিখ্যাত অলী আল্লাহ্ হযরত জোনাইদ বাগদাদী (রঃ) এর সম্বন্ধে জানা যায় যে, তিনি একদিন মোরাকাবার হালতে ছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, “তাঁর কদম আমার গর্দানের উপর”্। এই বলে তিনি ঘাড় নত করলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ৫০০ হিজরীতে হযরত আব্দুল কাদির নামে একজন বিখ্যাত অলী আল্লাহ্ জন্ম গ্রহণ করবেন। তাঁর উপাদি হবে মুহিউদ্দীন। আল্লাহ্ পাকের হুকুমে তিনি বলবেন, “সকল অলীগণের গর্দানের উপর আমার কদম”। আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর পিতা সাইয়্যেদ আবু সালেহ মুসা জঙ্গি দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন বিশেষ পুন্যবান,কামেল ও বোযর্গ ব্যক্তি ছিলেন।সচ্চরিত্রতা ও আল্লাহ প্রেমের বিবিধ গুন তাহার মধ্যে বিরাজমান ছিল।যৌবন কালে যখন তিনি বিয়ে করেননি তখনকার একটি ঘটনা ! তিনি একদিন নদীর ধারে ক্লান্ত অবস্হায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন একটি আপেন পানিতে ভেষে যাচ্ছে।তিনি ফলটি উঠিয়ে আনলেন ও পরম তৃপ্তিসহকারে ভক্ষন করলেন।কিছুক্ষন পর হঠাৎ তর মনে হল এই ফলটি খাওয়া তাহার ঠিক হলো ? এই ফলের মালিকতো তিনি নন।কোথা হতে এ ফল ভেসে এসেছে কে জানে।তার অনুমতিতো নেয়া হয়নি।তাহলে তিনি কি পরদ্রব্য ভক্ষনজনিত অপরাধ নিয়ে মহা বিচারকের সামনে হাজির হবেন ? যে করেই হোক মালিকের ঠিকানা বের করে মাফ চেয়ে নিতে হবে।তাই তিনি স্রোতের বিপরীত দিকে বিষন্নচিত্তে আপেল ফলের বাগানের সন্ধান করিতে লাগিলেন এবং বাগানের ও বাগানের মালিকের সন্ধান পেলেন।বাগানের মালিক সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনিও একজন খোদাভীরু ধর্মপ্রান সাধক।আল্লাহপাকের মারেফতের সাগরে সর্বতাই তিনি নিমজ্জিত থাকেন।তার কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে তার কাছে ক্ষমা চাইলেন যুবক আবু সালেহ মুসা জঙ্গি দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি ।বিস্মিত হলেন বাগানের মালিক।এই যুবকের অন্তরে কি আল্লাহভীতি।একেতো হাত ছাড়া করা যায় না।তিনি বললেন, ‘আপেলেরতো অনেক মুল্য।কি এনেছ তার জন্য ?’ আবু সালেহ মুসা জঙ্গি দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি জবাব দিলেন,’আমার কাছেতো কোন টাকাপয়সা নেই’ তবে গায়ে খেটে মুল্য পরিশোধ করতে চাই।আপনি যতদিন খুশী গায়ে খাটিয়ে নিতে পারেন।’হজরত সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন ওয়াদা করবার আগে ভাল করে ভেবে দেখ। আবু সালেহ মুসা জঙ্গি দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন আমি ওয়াদা পুর্ন করবো ইনশাআল্লাহ। সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন তোমাকে পুরো এক বৎসর বাগানের দেখাশোনার কাজ করতে হবে উপরন্তু আমি যখন যে কাজের হুকুম দিব তাই করতে হবে। কোন কথা ছাড়াই সব শর্ত মেনে নিলেন আবু সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি ।সময় শেষ হবার পর নুতন শর্ত যুক্ত করলেন সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি ।তিনি বললেন ‘আমার একটি অন্ধ,বধির ও বোবা কন্যা আছে তাকে তোমার বিয়ে করতে হবে । তাতেও রাজী হলেন আবু সালেহ।বিয়ের পর বাসর ঘরে ঢুকেই তাজ্জব বনে গেলেন আবু সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি ।তার নব বধুতো অপরুপা! অন্ধ,বধির বা বোবা কিছুই নন।হযরত আবু সালে রহমতুল্লাহি আলাইহি ঘরথেকে বের হয়ে গেলেন এবং সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আস্ত করলেন ইনিই আপনার আহলিয়া। পরদিন ব্যখ্যা দিলেন সাওমায়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি ।আমার এই কন্যা কোনদিন ঘরের বাইরে যায়নি,বাইরের কোন লোকের দিকে কখনো চোখ তুলে তাকায়নি এবং তার মুখে কখনও অশ্লীল বাক্য উচ্চারিত হয়নি।তাই তাকে আমি অন্ধ,বধির ও বোবা বলেছিলাম। এমন তাকওয়া ধারী পিতা ও এমন পর্দানশীল ঘরে তাসরিফ নিলেন শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন মাতৃগর্ভে তখন একদিন তার মাতা সাইয়্যেদেনা উম্মুল খায়ের ফাতেমা রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে দেখেন যে মানব জাতির আদি মাতা, হযরত আদম আলাইহি সালাম উনার স্ত্রী হজরত হাওয়া আলাইহাস সালাম সহাস্য আনন্দে তাকে বলছেন,”ওগো ফাতেমা ! তুমি বিশ্বচরাচরের ভাগ্যবতী মহিলা।তোমার গর্ভে যে সন্তান আছে,সে হবে আওলিয়াকুল শিরমনি গাউসুল আজম।”

অনুরুপ আরেক স্বপ্নে দেখিলেন হযরত হযরত ইব্রাহিম আলাইহি সালাম উনার স্ত্রী বিবি সারা আলাইহাস সারাম  মধুর স্বরে বললেন,”হে সৌভাগ্যবতী ফাতেমা !আল্লাহ পাকের মারেফাত তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক ‘নুরে আজম’ তোমার গর্ভে আছে।সুতরাং তুমি নিবিষ্ট মনে আল্লাহর গুনগানে নিমগ্ন থেক।”

একই ভাবে আবার দেখলেন ফেরাউনের পুন্যবতী স্ত্রী আসিয়া আলাইহাস সালাম মধুর কন্ঠে বলছেন,”ওগো সৌভাগ্যবতী ও মর্যাদাশীলা ফাতেমা ! আমি তোমাকে এক অনির্বচনীয় শুভসংবাদ প্রদান করছি। তুমি অতিশয় সৌভাগ্যবতী ও মর্যাদাশীলা রমনী।তোমার গর্ভে যে আওলিয়াকুল শ্রেষ্ঠ সন্তানের আবির্ভাব হয়েছে,পৃতিবীর বুকে তার উপাধি হবে ‘রওশন জমির’ ু।সুতরাং তুমি সতর্কতার সহিত সেই শুভক্ষনের জন্য অপেক্ষা করতে থাক।”এরকম আরো বহু স্বপ্ন তিনি তার গর্ভাবস্হায় দেখেন।

হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর বয়স যখন মাত্র ৫ বৎসর তখনই তিনি পিতৃহীন হন।তার লালন-পালন ও পড়াশোনার দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের উপর।মা চরকায় সুতা কেটে জিবীকা নির্বাহ করতে শুরু করেন।মাতা পুত্রকে কখনও কখনও অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়।যেদিন ঘরে কিছু খাবার না থাকতো তখন মা বলতেন,”আজ আমরা আল্লাহপাকের মেহমান।”খুব অল্প বয়সেই হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি মকতবে যাওয়া শুরু করেন।বাল্যবয়সেই বিভিন্ন আলৌকিক ঘটনাও ঘটতে শুরু করে।একবার সমবয়সী বালকদের সাথে খেলায় যোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে গায়েবী আওয়াজ এলো,”হে বরকতময় সত্তা ,আমারকাছে এসো!”কথা শোনা গেলেও কন্ঠটি কার বা কোথ্থেকে এলো কিছুই তিনি বুঝতে পারলেন না।তাছারা কোন লোকও তিনি সেখানে দেখতে পেলেন না।তাই ভয়ে দৌড়ে তিনি ময়ের কাছে চলে এলেন। এরকম আরো বহুবার হয়েছে।একবার নিদ্রাকাতর অবস্হায় সুখময় নিদ্রা যাচ্ছিলেন।এমন সময় ঘুমের ঘরে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন-একজন

উজ্জল জ্যোতিবিশিষ্ট স্বর্গীয় ফিরেশতা তাহার শিয়রের নিকট এসে অত্যন্ত কোমল স্বরে বলিতেছেন- ”হে আল্লাহর মনোনিত আব্দুল কাদির!উঠ,আর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থেক না।সুখ শয্যার কোলে ঢলে পড়বার জন্য এই পৃথিবিতে তোমার আগমন ঘটেনি।তোমার কর্তব্য ও দায়িত্ব সুদুরপ্রসারী! মোহগ্রস্হ,নিদ্রাচ্ছন্ন জনগনকে নিদ্রার মোহ থেকে মুক্ত করিবার জন্যই তোমার আগমন ঘটেছে।

শিক্ষা জীবন :

হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর বাল্য শিক্ষার হাতে খড়ি হয়েছিল জ্ঞানবান পিতা ও গুনবতী মাতার মাধ্যমে।তিনি স্বীয় পিতা -মাতার মাধ্যমেই প্রথমিক স্তরের শিক্ষনীয় বিষয়গুলি গৃহে বসেই সমাপ্ত করেছিলেন।মক্তবে প্রথম যখন উপস্থিত হন তখন হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে ইন্টার ভিউতে উনি একটানে ১৯ পার কুরআন শরীফ তেলাওয়ত করে উপস্হিত সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। উনাকে বলাহয় আপনি থেমে গেলেন? তখন হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বল্লেন তিনি মায়ের রেহেমে থাকা অবস্থায় উনার মাতা ১৯ পারা কুরআন শরীফ হেফজ বা তেলাওয়াত করেন এবং সেই সাথে তিনি তা হেফজ করেছিলেন।গৃহশিক্ষার বাইরেও তিনি জিলান নগরের স্হানীয় মক্তবেও বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন।একবার তিনি মক্তবে উপস্হিত হলে সেখানে বসার জন্য কোন স্হান পাচ্ছিলেন না।এমন সময় অদৃশ্য হতে আওয়াজ হলো,”হে শিক্ষার্থীগন!এই বালকের জন্য তোমরা একটু স্হান করে দাও,যাহাতে তিনি বসতে পারেন।” কেহই আওয়াজের দিকে তেমন লক্ষ্য দিল না।পরিশেষে আবার গম্ভীর কন্ঠে দৈববানী ঘোষিত হলো, ”হে শিক্ষার্থীগন!তোমরা কি দেখিতএ পাইতেছ না যে,আল্লাহর প্রিয় অলী দ্বারে দাড়িয়ে আছে ? উঠ,তাহাকে বসিবার স্হান করে দাও। অযথা বিলম্ব করে সময় অপচয় কর না।”এই অদৃশ্য বানী ছাত্র শিক্ষক সকলের কর্নেই ভীষনভাবে আঘাত করল।সকলেই হতচকিত ও বিস্ময়াপন্ন হয়ে গেল এবং বড় পীর আব্দুল কাদির রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বসবার স্হান করে দিল। তার প্রখর ধীশক্তি,প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞার ফলে বাল্যকালেই তিনি অসাধারন পান্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হন। কোন এক জিলহজ্ব মাসের ৯ম দিবসে শহর ছেরে গ্রামের দিকে গেলেন।সেখানে এক গাভীর গায়ে হাত দিতেই গাভীটি তার দিকে তাকালো এবং বলতে লাগলো,”হে হযরত আব্দুল কাদির ! আল্লাহ পাক তোমাকে কৃষিকাজের জন্য সৃষ্টি করেন নি বা জীবিকা অর্জনের হুকুমও তোমাকে দেননি”গাভীর মুখে কথা শুনতে পেয়ে ভীত সন্ত্রস্হ অবস্হায় বাড়ী ফিরে এলেন এবং মনের উদ্বেগে ঘরের ছাদে উঠে নানা কথা ভাবছিলেন।এমনসময় তিনি দেখতে পেলেন মক্কা শরীফ পর্যন্ত সমস্ত এলাকা তার সামনে উন্মুক্ত । চোখের সামনে তিনি আল্লাহর ঘর দেখতে পেলেন।তিনি আরো দেখতে পেলেন আরাফাতে হাজ্বী সাহেবরা অবস্হান করছেন।অতএব গায়বী ইঙ্গিতের মর্ম বোঝতে চেষ্টা করে তিনি মাকে দ্বীনী উচ্চশিক্ষার জন্য বাগদাদ গমনের ইচ্ছার কথা জানালেন।মা হৃষ্টচিত্তে অনুমতি দিয়ে তার পাথেয় প্রস্তুতিতে লেগে গেলেন।রওনার দিন জামার ভেতরে ৪০টি স্বর্নমুদ্রা সেলাই করে দিয়ে তার মা বললেন,”আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা হও।সততা ও বিশ্বস্ততাকে নিজের আদর্শরুপে শক্ত হাতে ধারন করবে।”

ঘটনাক্রমে রাস্তায় ডাকাত পড়লো।এক ডাকাত শিশু আব্দুল কাদিরকে তার কাছে কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করলো।তিনি অকপটে স্বীকার করলো জামার ভিতর সেলাইকরা ৪০টি স্বর্নমুদ্রার কথা।বালকের সততায় ও সরলতায় ডাকাত মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলো,এবিপদের মুহুর্তে লোকেরা প্রকাশ্য সম্পদও গোপন ফেলে আর আপনি এ গোপন সম্পদের কথা কেন আমাকে দিলে ? বালক আ্ব্দুল কাদির রহমতুল্লাহি আলাইহি জবাব দিল,”আমার আম্মা আমাকে সর্বদা সত্য কথা বলার উপদেশ দিয়েছেন।”

আল্লাহওয়ালাদের কথায় এমন প্রভাব থাকে যা পাষান হৃদয়ও একমুহুর্তে গলিত হতে পারে।ডাকাত সর্দার কাদতে শুরু করলো এবং বলল,”এবালকটি তার মায়ের নির্দেশ এত বিপদের মধ্যেও যেভাবে মানল ,আমি কি আমার সৃষ্টিকর্তা প্রভর হুকুম কি এভাবে মানছি ?আমিতো অর্থ-সম্পদের লোভে মহান মহান মালিকের অবাধ্য হয়ে শত শত মানুষের সর্বনাশ করছি”্।কাফেলার লুন্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে ডাকাত তার গোটা দলশ তওবা করে ডাকাতি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো ।বলা হয় এই এই ডাতদ দলের সবাইনাকি পরবর্তীতে আল্লাহর এক ওলীতে পরিনত হয়েছিলেন।

উচ্চশিক্সার জন্য তিনি ৪৮৮ হিজরীতে যখন প্রথম তিনি বাগদাদ গমন করেন তখন তার বয়স হয়েছিল আঠার বৎসর।বাগদাত এসে তিনি শায়েখ আবু সাইদ ইবনে মোবারক মাখযুমী হাম্বলী রহমতুল্লাহি আলাইহি,আবুল ওয়াফা আলী ইবনে আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আবু মোহাম্ম ইবনে হোসাইন ইবনে মুহাম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট ইলমে ফিখ,শায়েখ আবু গালিবমুহাম্মদ ইবনে হাসান বাকিল্লানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, শায়েখ আবু সাইদ ইবনে আব্দুল করীম রহমতুল্লাহি আলাইহি ও শায়েখ আবুল গানায়েম মুহম্মদ ইবনে আলী ইবনে মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখের নিকট এলমে হাদীস

এবং শায়েখ আবু যাকারিয়া তাবরেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিকট সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ লাভ করেন।শায়খ জীলানীর বাহ্যিক ও ইলমে তসাওফ চর্চার  শায়খ আবু সাঈদ মাখযুমীর মনে তরুন এ ছাত্র  যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে এতই সুধারনা ও আস্হাশীলতার সৃষ্টি করল যে,নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা তত্তাবধান ও পরিচালনার দায়িত্ব শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট অর্পন করে তিনি নিজে অবসর গ্রহন করেন।

শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এ মাদ্রাসার উন্নতি ও উৎকর্ষের কাজে আত্ননিয়োগ করেন।হাদীস ,তাফসির,ফিকহ ও অন্যান্য জ্ঙান বিজ্ঞানের শিক্ষাদান নিজেই শুরু করেন।পাশাপাশি ওয়াজ নসিহত ও তালিম তালকিন কর্মসুচীও চালু করেন ।অল্পদিনের মধ্যেই এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম চারিদিকে ছরিয়ে পড়লো এবং দেশ বিদেশের বিদ্যার্থীরা এতএ ছুটে আসতে লাগলো।এ পর্যায়ে মাদরাসার নামকরনও শায়খের সাথেই সম্পৃক্ত হয়ে ‘মাদরাসায়ে কাদেরিয়া” হয়ে গেল।

শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর শিক্ষকতার জীবন ছিল ৫২৫ থেকে ৫৬১ হিজরি পর্যন্ত মোট ৩৬ বছর।যাতে তিনি দিনের প্রথম ভাগে তাফসির ও হাদীস,যোহরের পর পবিত্র কোরাআন,আর অন্যান্য সময় ফিকহ,উসুল ইত্যাদি বিষয়ের পাঠ দান করতেন।আল্লাহ তাআলা তাকে বাহ্যিক জ্ঞান ও বিদ্যায় এতই ব্যুৎপত্তি দান করেছইলেন যে, যখন ফতোয়া দান করতেন তখণ কোন উৎস বা গ্রন্হ দেখার প্রয়োজন হতো না।কাগজ কলম নিয়ে কোনরুপ চিন্তা ভাবনা ছাড়াই উপস্হিত তিনি যা লিখতেন ,সমকালীন জ্ঞানীগুনি ও আলেম সমাজ ইহাকেই দলীল স্বরুপ মনে করতেন ।

বুজুর্গী

একবার লোকেরা বড়পীর গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে জিজ্ঞেস করল, হুজুর আপনি কি মোজাদ্দেদে জামান? তিনি বললেন, হ্যাঁ । তারপর বলা হল, আপনি কি সুলতানুল আরেফীন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবার বলা হল, আপনি কি কুতুবুল আলম? তিনি বললেন হ্যাঁ। তখন সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। তিনি বললেন, আরও প্রশ্ন কর। তোমরা যা বলবে আমি তারও উপরে, তারও উপরে, তারও উপরে। তোমাদের মধ্যে অনেক লোক আছে, আমি যে মাকামে অবস্থান করি, তারা তার কোন খবরই রাখেনা। যে সমস্ত মাকামগুলির বর্ণনা পরবর্তীতে হযরত মোজাদ্দিদে আলফেসানী (রঃ) তাঁর মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করেছেন।

মোটকথা নবী রসুল আলাইহিমুস সালাম গণের পর একজন মানুষের পক্ষে যত মাকাম অর্জন করা সম্ভব আল্লাহ্ পাক গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে তা দিয়েছেন। এটা সুত্যিই তাঁর জন্য এক বিশেষ মর্যাদা (বলা হয়ে থাকে আল্লাহ্ পাকের এমন অলি কমই অতিবাহিত হয়েছেন, যাঁরা গাউসুল আজম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর রূহানী তাওয়াজ্জুহ্ বা নেছবত হাসিল করেন নাই)

তিনি হযরত শায়খ আবুল খায়ের হামদান বিন মোছলেম দাব্বান রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দরবারে আসা\যাওয়া করতে লাগলেন এবং কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে তাসাউফ শিক্ষায় নিমগ্ন হলেন। হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘ পচিঁশ বৎসরকাল ইরাকের নির্জন বন\জঙ্গলে, মাঠে\প্রান্তরে এবং ভগ্ন প্রায় বাড়ী\ঘরে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি যখন ইরাকের জঙ্গলে সাধনা বা রিয়াজত করতাম তখন একদা আমার খুব পানির তৃষ্ণা পেলো, এমন সময় আল্লাহ্ পাকের কুদরতে আকাশে ঘন কালো মেঘের ছায়া নেমে এলো এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই বৃষ্টি আরম্ভ হল। আমি তৃপ্তিভরে পানি পান করলাম। এরপর আকাশে একটা আলোকপাত দেখা দিলো, যা সমস্ত আকাশকে আলোকিত করে ফেললো। অতঃপর ঐ আলোকপিন্ড হতে আওয়াজ এলো – হে আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আমি আপনার আল্লাহ্। আমি আপনার ইবাদত বন্দিগীতে সন্তুষ্ট হইয়া সমস্ত হারাম গুলিকে আপনার জন্য হালাল করিয়া দিলাম। ইহা ইবলিশের ধোকাবাজি বা প্রতারনা বুঝতে পেরে সাথে সাথে পড়লেন, “হে বিতাড়িত শয়তান! দূর হয়ে যা এখান থেকে” ্। এই অকেয়া দ্বারা বুঝা যায়, হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কত বড় সুক্ষ্মদর্শী ছিলেন। কারন যাহা হারাম হওয়ার তাহা হারাম হিসাবে সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আর যাহা হালাল হওয়ার তাহা হালাল হিসাবেই সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কেননা, ওহী বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অথচ আজকাল এক শ্রেণীর ফকীর নামধারী ভন্ড ব্যক্তিরা বলে থাকে যে, উপরের মাকামে উঠলে ইবাদতের প্রয়োজন হয়না। তারা কোরআন শরীফের নিন্মোক্ত আয়াত শরীফের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। যেমন

– ইয়াক্কীন বা মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমরা ইবাদত করতে থাক। ভন্ডরা ইয়াক্কিন এর শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস ধরে নিয়েছে। ইবাদত বন্দেগীতে মোটামুটি বিশ্বাস এসে গেলে তাদের মতে আর ইবাদত না করলেও চলবে।

অথচ সমস্ত মোফাচ্ছিরে কিরামগণ একমত যে এখানে ইয়াক্কীন শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। তাছাড়া যিনি সকল নবী রসুলদের রসুল, যিনি সাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও জীবনের শেষ পর্যন্ত এত বেশী যিকির আযকার ও ইবাদত বন্দেগী করতেন যে, নামাজ পড়তে পড়তে আল্লাহ্র রসুল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পা মোবারক ফুলে যেত। সাহাবা\ই\কিরাম রাদিয়া্ল্লাহ আনহুম গণ জিজ্ঞাসা করতেন, হে আল্লাহ্র রসুল, আল্লাহ্ পাকতো আপনার আগে পিছের সমস্ত গুনাহ্ই মাফ করে দিয়েছেন। তবে আপনি কেন ইবাদতে এত কষ্ট করেন? আল্লাহ্র রসুল হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি কি আল্লাহ্ পাকের শোকরগুজারি বান্দা হবনা”?

তাই মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে ইবাদত বন্দেগী করে যেতে হবে। এবং যিনি যত মর্যদাশীল হবেন তাঁর ভয়ভীতিও তত বেশী হবে।  আল্লাহ্র রসুল সাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খালেছ অনুসরণকারী হিসাবে হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে দেখতে পাই।

আল্লাহ্ পাক আওলিয়া\ই\কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি গণকে অনেক বুজুর্গী বা কারামত দান করেছেন। যাহা কোরআন শরীফেও উল্লেখ করেছেন। যেমন হযরত মরিয়ম আলাইহাস সলাম এর হুজরা শরীফে মৌসুম ব্যতীত ফল ফলাদি পাওয়া যেত। আর হযরত সোলায়মান আলাহি সালাম এর প্রধান মন্ত্রী হযরত আসাফ বিন বরখীয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন অলী আল্লাহ্ ছিলেন। তিনি রানী বিলকিসের সিংহাসন চোখের পলকে হযরত সোলায়মান আলাইহি সালাম এর দরবারে পেশ করেছিলেন। উপরোক্ত দু’টি ঘটনা সম্পর্কেই আল্লাহ্ পাক কোরআন শরীফের সূরা ইমরানের ৩৭ নং আয়াত শরীফ এবং সূরা নমলের ৩৮,৩৯ ও ৪০ নং আয়াত শরীফের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।

আর আকায়েদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,

“আল্লাহ্ওয়ালাগণের কারামত সত্য”্। আর কিতাবে উল্লেখ করা হয়- “আল্লাহ্ পাক আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি গণকে এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যে, ইচ্ছে করলে তাঁরা নিক্ষেপীত তীরকে লক্ষ্যস্থানে পৌঁছার পূর্বেই আবার তা ফিরিয়ে আনতে পারেন।”

সেই কারণেই আমরা প্রত্যেক আল্লাহ্ওয়ালাগণের জীবনীতে কমবেশী কারামত দেখতে পাই। তদ্রুপ হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর জীবনেও আমরা তাঁর অসংখ্য আশ্চর্য্য ধরণের কারামত দেখতে পাই। তাঁর দোয়ার বরকতে অনেক নেক সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে। যাঁরা নাকি পরবর্তীতে অনেক উঁচু পর্যায়ের অলী আল্লাহ্ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহ্রাওয়ার্দী এবং মহীউদ্দীন হযরত ইবনুল আরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নাম উল্লেখযোগ্য। ফুরফুরা শরীফের পীর সাহেব হযরত আবু বকর সিদ্দীক রহমতুল্লাহি আলাইহি কে একবার কিছু লোক হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দীর্ঘ ১২ বৎসর পর ডুবে যাওয়া একটি বর যাত্রীদলকে নতুন করে বাচানোর কারামতের সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর এই কারামত বিশ্বাস করেন। কেননা আল্লাহ্র অলী রহমতুল্লাহি আলাইহি গণের কারামত সত্য। তাই হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর কারামত কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের দলীল দ্বারাই প্রমানিত।

আহাল ও ইয়াল

হযরত গাউসুল আজম  শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ক্রমান্বয়ে চারটি বিবাহ করেছিলেন। তাঁকে বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশে বিবাহ করেছেন। তাঁর মোট ৪৯ জন সন্তান সন্ততি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৭ জন পুত্র সন্তান এবং ২২ জন মেয়ে সস্তান ছিলেন। তাঁরা সকলেই অতি উঁচু দরজার অলি আল্লাহ্ ছিলেন। তাঁদের  অনেক বড় বড় সন্মানিত উপাধি ছিল।

হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রায় সারা বৎসরই রোজা থাকতেন। সাধারণ রুটি খেতেন। অনেক সময় খুব মূল্যবান কাপড় পড়তেন। অনেক সময় অল্প দামের কাপড়ও পরতেন। অর্থাৎ হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উঠা, বসা, চলা, ফিরা, কথা, বার্তা, পোশাক, পরিচ্ছদ, ঘর, সংসার ইত্যাদি প্রতিটি কাজ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণে করতেন। কেননা তিনি ছিলেন খাছ নায়েবে নবী।

কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মাহ্বুবে সোবহানী, কুতুবে রব্বানী হযরত গাউসুল আজম শায়খ সাইয়্যিদ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর জীবনীতে অনেক নসিহত ও ইবরত রয়ে গেছে।

রওজা শরীফ

বিদায়/ বিছাল শরীফ

‘বাহজাতুল আসরার’ নামক কিতাবে হযরত শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ৫৬০ হিজরীর রবীউল আউয়াল শরীফ মাস হতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

‘তাওয়ারিখে আউলিয়া’ নামক কিতাবে হযরত শায়খ আব্দুল ফতেহ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, রোববার দিবাগত রাত্রে অর্থাৎ সোমবার রাত্রে গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি গোসল করেন। গোসলান্তে ইশার নামায আদায় করে তিনি উম্মতে হাবীবীগণের গুনাহখাতা মাফের জন্য ও তাদের উপর খাছ রহমতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর গায়েব হতে আওয়াজ আসলো, “হে প্রশান্ত নফস, আপনি সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত হয়ে নিজ প্রতিপালক উনার দিকে প্রত্যাবর্তন করুন। আপনি আমার নেককার বান্দার মধ্যে শামিল হয়ে যান এবং বেহেশতে প্রবেশ করুন।” এরপর তিনি কালিমা শরীফ পাঠ করে তাআজ্জাজা (অর্থ বিজয়ী হওয়া) উচ্চারণ করতে লাগলেন এবং তিনি আল্লাহ, আল্লাহ, আল্লাহ বললেন। এরপর জিহ্বা মুবারক তালু মুবারক-এর সাথে লেগে গেলো। এভাবে ৫৬১ হিজরীর ১১ই রবীউছ ছানী মাসের সোমবার শরীফ-এ গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি আল্লাহ পাক উনার মহান দরবারে প্রত্যাবর্তন করলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) আর এ দিনটিই সারাবিশ্বে ‘পবিত্র ফাতিহায়ে ইয়াজদাহম’ নামে মশহুর। ১৪৩২ হিজরীর জন্য আগামী ১৭ই মার্চ বৃহস্পতিবার পবিত্র ফাতিহায়ে ইয়াজদাহম।

গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনী মুবারক-এ অনেক নছীহত ও ইবরত রয়ে গেছে। আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ-এর ‘সূরা ইউসূফ’ বর্ণনা করার পর বলেন, “নিশ্চয় এই ঘটনার মধ্যে জ্ঞানীগণের জন্য রয়েছে নছীহত।” এ আয়াত শরীফ থেকে ছাবিত করা হয় যে, পরবর্তী লোকদের জন্য পূর্ববর্তী লোকদের ঘটনাগুলি ইবরতস্বরূপ। তাই প্রত্যেকের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে- গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র সাওয়ানেহ উমরী মুবারক জেনে উনাকে মুহব্বত ও অনুসরণ করে আল্লাহওয়ালা হওয়ার কোশেশ করা এবং পবিত্র ফাতিহায়ে ইয়াজদাহম উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারসহ পৃথিবীর সকল দেশের সরকারের উচিত- যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যতার সাথে এ দিনটি পালন করা এবং এ দিনের সম্মানার্থে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

৫টি মন্তব্য

  1. সরলমতসরলমত says:

    অবশ্যই ছুটি ঘোষনা করা উচিত।
    এ জরুরী , তথ্য বহুল পোষ্ট শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

  2. ****নাঈম দুর্জয়**** says:

    Osam akta post. Pore nijer biddata aktu baria nilam. Tx amon post dewar jonno

  3. প্রভাতের সূর্যপ্রভাতের সূর্য says:

    তথ্য বহুল পোষ্ট এর জন্য অনেক ধন্যবাদ । Coffee Clover

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে