রাজনীতিক নামধারী পুঁজিবাদীদের কবলে বাজার। সিন্ডিকেটের কবলে পুরো বাজার ব্যবস্থাপনা। প্রান্তিক কৃষক ও সাধারণ মানুষ উভয়ই চরমভাবে শোষিত হচ্ছে।


ভোগ্যপণ্য সবাইকেই কমবেশি কিনতে হয়। বাজারের অসঙ্গতি থাকলে, মূল্যে কারসাজি থাকলে ঠকতে হয়। সংগঠিত বাজার ব্যবস্থা থাকলে বাজারে কারসাজি করার অবকাশ থাকে কম। বাজারে অসংগঠিত থাকলে ব্যবসায়ীরা কারসাজির মাধ্যমে বেশি মূল্য নিতে সুযোগ পেতে পারে। আমাদের ভোগ্যপণ্যের বাজার অসংগঠিত এবং সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়ী শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে। তাই সবাইকে ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যেই পণ্য ক্রয় করতে হয়। এ প্রেক্ষাপটে ভোক্তা হিসেবে আমরা বেশি দাম পরিশোধে বাধ্য থাকছি। ভোগ্যপণ্য তার উৎপাদন উৎস হিসেবে কৃষিজাত এবং শিল্পজাত। শিল্পজাত পণ্যের কিছু দেশে উৎপাদিত আবার কিছু বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। বাজার ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে গড়তে হলে এসব উৎস থেকে যে পণ্য বাজারে আসে, ব্যবসায়ীদের ক্রয় মূল্য জানা দরকার। শিল্পজাত দেশী কিংবা বিদেশী পণ্যের দাম বের করা অনেকটা সহজ। ক্রয় নথিপত্র থেকেই মূল্য বের করা সম্ভব। কিন্তু কৃষিজাত পণ্যের বেলায় ব্যবসায়ীদের ক্রয় মূল্য নিখুঁতভাবে জানার ক্ষেত্রে সমস্যা বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে কৃষিজাত পণ্যে মূল্য কারসাজির সুযোগ বেশি বিদ্যমান। বাজার ব্যবস্থাপনায় বাইরের কারো নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে না; বরং ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার উপরই মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে এবং বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

ফলে ব্যবসায়ীদের কারো অতি মুনাফা করার ইচ্ছা থাকলে সহজেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। আমাদের দেশে বিপুল মানুষ বাস করছে। ফলে মূল্য কারসাজির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার পথ অনেক দূর বিস্তৃত। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে এ দুষ্ট ক্ষতের কারণে মানুষকে বেশি মূল্য দিয়ে যেতেই হবে। আর সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা গড়তে হলে এর মুখ্য উপাদান হলো ব্যবসায়িক নৈতিকতা এবং সরকার দক্ষ নিয়ন্ত্রণ।
বিগত সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমার সুফল, ডলারের দাম কমার সুফল সবই পেয়েছে ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠার পর স্থানীয় বাজারে বোতলজাত তেলের দাম যা ছিল এখনো প্রায় তা-ই আছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার পরও ভোজ্যতেলের দাম কমেনি। মনিটরিং সেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম হওয়া উচিত ৯০ টাকা। তবে বাজারে ওই তেল বিক্রি হচ্ছে ৯৮ থেকে ১০০ টাকা দরে। লিটারে বেশি নেয়া হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা। পণ্যের মজুদ সম্পর্কে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় মজুদদাররা এখনো সক্রিয়। পণ্যের দাম বাড়ানোর পেছনে দেশজুড়ে তৎপর কয়েকটি সিন্ডিকেটকে সরকার এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। দায়ী সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরতে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ সরকার। অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অনেকেরই সাথে রয়েছে এসব সিন্ডিকেটের সখ্য। এছাড়া সিন্ডিকেট সদস্যদের অনেকেই সরাসরি সরকারদলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। সাম্প্রতিককালে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এসব সিন্ডিকেটের একটি তালিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নেয়া হয়নি। আগে শুধুু আমদানির মাধ্যমে আসা বিভিন্ন পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে এসব সিন্ডিকেট। এখন দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যও চলে গেছে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের সবজি রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে চারগুণ মূল্যে।
কত টাকায় পণ্য আমদানি করা হচ্ছে এবং তা পরে কী দামে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে তার কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও সরকারের তরফ থেকে এর কোনো কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত দেখা যায়নি। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠন করে। এসব কমিটি গঠন পর্যন্তই শেষ। কমিটি বাজারে এ পর্যন্ত কোনো ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য মনিটরিং এবং আগাম পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হলেও ওই কমিটির কার্যক্রম এখন নেই বললেই চলে।
কৃষকদের উৎপাদিত ভোগ্যপণ্য-যেমন শাক-সবজি এসব কয়েক ধামে ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছানো হয়। এসব পণ্য ক্রেতা পর্যায়ে যোগান নিশ্চিত করতে ফড়িয়া, আড়তদার এবং খুচরো ব্যবসায়ীর হাত হয়ে আসে। কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় আড়তে বিক্রয় করে। ব্যবসায়ীগণ তা ক্রয় করে পরিবহন করে শহরের আড়তে বিক্রয় করে থাকে। আর শহরের আড়ত থেকে খুচরো ব্যবসায়ীরা তা কিনে তাদের দোকানে বিক্রয় করে থাকে। এক্ষেত্রে স্থানীয় আড়তদার তার ইচ্ছামতো দামে কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে। সেখান থেকে পাইকারী ব্যবসায়ী তার ইচ্ছামতো মূল্যে পণ্য ক্রয় করে শহরের আড়তে নিয়ে আসে। শহরের আড়তদার তার ইচ্ছামতো পাইকারকে পণ্যের দাম পরিশোধ করে থাকে। শহরের আড়তদারগণ তাদের ইচ্ছা মাফিক মূল্যে খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রয় করে। অর্থাৎ কৃষিজাত ভোগ্যপণ্য যা কাঁচামাল হিসেবে পরিচিত এর দাম নির্ধারণে ফড়িয়াও আড়তদারদের ইচ্ছাই সব। খুচরো বাজারে শাক-সবজি। তরিতরকারির প্রচুর যোগান থাকলেও দেখা যায় দাম চড়া। কাঁচামরিচ নিয়ে প্রায় বছরেই তুলকালাম কা- ঘটতে দেখা যায়। কুড়ি থেকে আড়াইশ টাকায় এক কেজি কাঁচামরিচ বিক্রয় হতে দেখা যায়। পবিত্র রমাদ্বান শরীফ শুরু হলেই চার পাঁচগুণ দামে বেগুন বিক্রয় হতে দেখা যায়। শসা, খিরাইয়ের বেলায়ও একই অবস্থা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ দোকানদারের ইচ্ছামতোই এসব পণ্য কিনতে বাধ্য। এ প্রক্রিয়ায় ক্রেতারা চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হলেও উৎপাদনকারী কৃষকগণ তেমন লাভবান হয় না। এ প্রক্রিয়া এভাবে চলতে দিলে ক্রেতা সাধরণকে অব্যাহতভাবে ঠকতেই হবে নিঃসন্দেহে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীদের মাঝে ব্যবসায়িক নৈতিকতা মোটেও কাজ করছে না। এর অবসান হওয়া দরকার।
কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মূল দায়িত্ব উৎপাদন বাড়ানো। কৃষকের মাঝে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে কাজ করতে হবে। মূলত কৃষক যাতে তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় তার জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সবাই মিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে