রাজনৈতিক অস্থিরতায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পাচার


দেশের ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের কারণে বর্তমানে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে কালো টাকার পাশাপাশি বৈধ আয়ের অনেক টাকা ডলারে রূপান্তরিত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটাকে অর্থনীতির জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত হিসেবে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) গোয়েন্দা সেলের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশ থেকে পাচার হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাদের শঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো দেশ থেকে পাচার হয়ে যাবে। এনবিআর’এর তথ্য মতে, গত পাঁচ বছর ধরেই প্রতিবছর গড়ে পাচার হচ্ছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচনের বছরে এটা দ্বিগুণ হবে- এটাকেই স্বাভাবিক মনে করছে রাজস্ব বোর্ড।
অর্থ মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতি বছরের বাজেটেই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলেও তা তেমন কাজে আসছে না। গত ৪২ বছরে সাদা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশে ১শ বিলিয়ন ডলারের (৮ লাখ কোটি টাকা) বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের সঙ্গে একান্ত আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক গতিধারার আলোকে ২০০৭-০৮-এর মতো আরেকটি ঘটনা ঘটে কিনা এ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা। আর এক্ষেত্রে তাদের মনে ভয় জাগাচ্ছে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্যাতনের স্মৃতি।
তারা জানান, তখনকার সরকারের পেছনের শক্তি তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক হাতিয়ে নেয় হাজার কোটি টাকা। তাই এবারও একই সমস্যায় পড়তে চান না তারা। তাই বিভিন্ন উপায়ে তারা তাদের অর্থ দেশের সীমানা পার করছেন। অনেকে রপ্তানি আয় দেশে আনছেন না। প্রয়োজনে নিজেরাও যাতে পালাতে পারেন সে ব্যবস্থাও করে রেখেছেন অনেকে।
বাংলাদেশে হুন্ডি ডলারের সবচেয়ে বড় খদ্দের আন্ডার ইনভয়েসিং পদ্ধতি ব্যবহারকারী আমদানিকারকেরা। আমদানিকারকদের বৃহদাংশই নিয়মিতভাবে কিংবা প্রায়ই আন্ডার ইনভয়েসিং পদ্ধতি ব্যবহার করে শুল্ক, মূসক, সম্পূরক কর, সারচার্জ ইত্যাদি ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে। দেশের গার্মেন্টস কারখানার মালিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাক-টু ব্যাক এলসি এবং শুল্কমুক্ত গার্মেন্টস পণ্য আমদানির সুযোগের অপব্যবহার করে আন্ডার ইনভয়েসিং পদ্ধতির মাধ্যমে অতিরিক্ত কাপড় আমদানি করার প্রমাণ মিলেছে গবেষণায়। যে কাপড় যথাস্থানে ঘুষ-নজরানা দিয়ে বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং কারখানা থেকে বের করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই দুই নম্বরি কারবারেরই আরেক নাম ‘লিকেজ’। গার্মেন্টস মালিকদের বেশির ভাগ এই দুইনম্বরি কারবারের সাথে জড়িত বলে জানা যাচ্ছে। এমনিভাবে আন্ডার ইনভয়েসিং কম-বেশি সব পণ্য আমদানিতেই ব্যবহৃত হয় শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়ার জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে, আর অতিরিক্ত পণ্যের ‘অতিরিক্ত মূল্য’ পরিশোধে প্রয়োজন পড়ে হুন্ডি ডলারের। উচ্চহারে শুল্ক-কর থাকলেই আন্ডার ইনভয়েসিং বেশি হয়।
হুন্ডি ডলারের আরেক বড় খদ্দের পুঁজি পাচারকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পুঁজি পাচারকে ইংরেজিতে বলা হয় ক্যাপিটাল প¬াইট। যেসব ব্যবসায়ী রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছেন, তারা তাদের অনার্জিত ও অপ্রদর্শিত কালোটাকার বড় অংশ বিদেশে ঘরবাড়ি-জায়গাজমি কেনার জন্য, বিদেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করার জন্য, বিদেশে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য বা দোকানপাট-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্রয় ও পরিচালনার জন্য পাচার করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এ দেশের ‘পলাতক পুঁজির’ প্রধান গন্তব্য। মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। যেসব রাজনীতিক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির কল্যাণে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যান কিংবা যেসব আমলা আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির ফায়দাভোগী, তারা তাদের অনার্জিত অর্থের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিদেশে পুঁজি পাচারকে বেছে নেওয়াটাই স্বাভাবিক মনে করেন। হুন্ডি ডলারের চাহিদার স্ফীতি ২০১১ সালে ইনফর্মাল বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের দাম ৯০ টাকার ওপরে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ওই সময়ের ধস যেসব রাঘব বোয়াল পুঁজি লুটেরা ঘটিয়েছিল, তাদের লুণ্ঠিত পুঁজি দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছিল ব্যাপক হারে। অনেকেই জানেন না, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই – সব দেশে বাংলাদেশি পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন অনেক শিল্পকারখানা, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে গত তিন দশকে। হুন্ডি পদ্ধতি ব্যবহার করেই এসব পুঁজিপতি তাদের বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছেন, এটা কি সরকার জানে না? এদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতাও রয়েছেন।
বিদেশে চিকিৎসা করানোর জন্য হুন্ডি পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার করা হয়, এটাও ওপেন সিক্রেট। প্রায় লক্ষাধিক বিত্তবান পরিবারের ছেলেমেয়ে বিদেশে লেখাপড়া করছে। তাদের ব্যয় নির্বাহ করার জন্য হুন্ডি পদ্ধতিরই আশ্রয় নিতে হয়। অবৈধ অর্থ উপার্জনকারী পুলিশ সার্জেন্ট, কাস্টমস সুপারিনটেনডেন্ট কিংবা আয়কর পরিদর্শক দেশে বাড়ি বানাতে চাইলে বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে চাইলে, বিদেশে অভিবাসীদের সহায়তায় বিদেশ থেকে হুন্ডি ডলার কিনে ফর্মাল চ্যানেলের (ব্যাংক বা অন্যান্য চ্যানেল) মাধ্যমে ওই ডলার প্রেরণ করলে, সেটা আর কালোটাকা থাকে না, বৈধ রেমিট্যান্স হয়ে যায়। তারপর ওই ডলারের সমপরিমাণ টাকা যে ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ করা হোক, ওই অর্থের উৎস নিয়ে আর প্রশ্ন তোলা যায় না। এ ধরনের লেনদেনই মানি লন্ডারিংকে সহজসাধ্য করে তুলেছে এ দেশে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বড় বড় নগরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা-প্রকৌশলী-পেশাজীবীরা দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করে এভাবে তাদের নতুন ঠিকানা গড়ে তুলছেন বলে গবেষণায় দেখা গেছে। ন্যূনতম ৪০ হাজার ডলার যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করলে মার্কিন ভিসা পাওয়া যেত। কানাডায়ও একই ধরনের নিয়ম রয়েছে। মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতেও নির্ধারিত পরিমাণ পুঁজি নিয়ে যেতে পারলে রেসিডেন্টশিপ পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্পেন, ইতালি ও গ্রিস একই ধরনের নিয়ম চালু করেছে। আর বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশ।
বাংলাদেশের কয়েক’শ ব্যবসায়ী-শিল্পপতি দেশের ব্যাংক-ঋণ হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় পাচার করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে শিল্প-কারখানা, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া, মরিশাস, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে পাচার করা বাংলাদেশি পুঁজি বিনিয়োগ করার প্রমাণও মিলেছে গবেষণায়। এ ধরনের পুঁজি পাচারকারী বৈদেশিক বিনিয়োগকারীর তালিকায় এফবিসিসিআইয়ের একাধিক সাবেক সভাপতিও রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। খবরটা কি সরকারের জানা নেই? যদি জানা থাকে, তাহলে ওই রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? বৈধ পদ্ধতিতে তো বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য পুঁজি স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেই। তাহলে এসব বিনিয়োগকারী কীভাবে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি নিয়ে গেলেন?

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে