রাজাকারের জবানবন্দি (৩)


১৯৭১ সালে ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায় রচনা করেছে আল-বাদর রাজাকাররা। ঘাতক রাজাকাররা কত জঘন্য বর্বরতা, নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, বীভৎস রাহাজানি, হত্যা, সম্ভ্রমহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্ণনাতীত। আল-বাদর রাজাকারদের নির্দয় নিপীড়নের কাহিনী যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে। গা শিহরিত এমনই এক বাস্তব ঘটনা ‘রাজাকারের জবানবন্দি’ শিরোনামে লিপিবদ্ধ করেছেন কানাডা প্রবাসী এম বাহাউদ্দিন। এখানে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হল:

পূর্বে প্রকাশের পর…………..

এ পর্যন্ত তিনটা অভিযোগ হয়েছে। প্রথম হয়েছে ছয়মাস আগে। একটি বার বছরের মেয়ের বাবা-মা অভিযোগ করেছে। তাদের মেয়েকে ধর্মীয় শিক্ষা দেবার সময় সে মলেস্ট করেছে। সেই অভিযোগের পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। কারণ সে একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধ এবং পায়াস লোক। ফাইভ টাইম সে ইবাদত করে, বেশিরভাগ সময় মসজিদে কাটায়। কিন্তু পুলিশ তাকে নজরে রেখেছে। তারপর দু’মাস আগে একই ধরনের অভিযোগ আসে আর একটি পরিবারের কাছ থেকে। এখানেও সে ধর্মীয় শিক্ষা দিত। দশ বছরের একটি মেয়েকে সে কোলে বসিয়ে পড়াচ্ছিল। তার মা দেখে ফেলে ইয়াসিনকে শিক্ষকের কাজ থেকে বাদ দিয়ে পুলিশে অভিযোগ করে। পুলিশ আরও প্রমাণের অপেক্ষায় ছিল। একদিন বিকেলে একটি বার বছরের মেয়ে মেইল চেক করার জন্য মেইল রুমে যায়। তখন অন্য কোন লোকজন ছিল না সেখানে। সাদা পোশাকে পুলিশ তার উপর নজর রাখছিল। যখন মেয়েটি মেইল রুমে ঢুকে তার পিছু পিছু ইয়াসিনও ঢুকে। যদিও তার মেইল চেক করার চাবি ছিল না। এক সময় সে মেয়েটিকে খুব আদর করে জড়িয়ে ধরতেই মেয়েটি তার বাহু থেকে ফসকে দে ছুট। এ সময় দূরে লবির এক কোণে দাঁড়ানো পুলিশ দেখে ফেলে এবং হাতে নাতে গ্রেফতার করে। এসব মামলা খুবই স্পর্শকাতর। কোন সাক্ষী লাগে না। তার বিরুদ্ধে তিনটা অভিযোগ। এখন ভাবছি কিভাবে তাকে বাঁচানো যায়। অথবা মিনিমাম পানিসমেন্ট কিভাবে হতে পারে। আমি আমার আরও সহকারীদের নিয়ে আগামীকাল বসব এই মামলাটা নিয়ে আলোচনার জন্য। এখন কোন পথে এগুনো যায় তা তোমাকে তিন দিন পর বলতে পারব। তুমি বরং তিন দিন পর আমার এখানে আর একবার এস অথবা ফোন করো। আমার এখন কোর্টে যেতে হবে। তোমার সাথে আর কথা বলতে পারব না। সি ইউ, বাই…..।
তিন দিন পর কাসেমকে নিয়ে উপস্থিত হলাম উকিলের অফিসে। উকিল আমাদের দেখে কুশল বিনিময় করে বসতে বলল। আমরা বসার পর উকিল আমার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, দেখ আমার পঁচিশ বছর ওকালতি জীবনে এমন অদ্ভুত মক্কেলের দেখা পাইনি। সে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছে। দোষ স্বীকার করে সে একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছে। তাতে মনে হয় তার বড় ধরনের শাস্তি হয়ে যাবে। আমি ভেবে দেখলাম তাকে সব দোষ দেয়া যায় না। সে ঘাবড়ে গেছে এবং ভয়ে ভাল করে কথাও বলতে পারে না। বোধ হয় পুলিশের চাপে পড়ে এবং ভয়ে এসব জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশ তার উপর খুব চাপ দিয়েছে। কারণ এদেশে সে আছে মাত্র একবছর। তার অতীত সম্বন্ধে কিছুই জানা নেই। তার অতীত জানতে হলে তার দেশে যেতে হবে। তাই তাকে খুব চাপ দিয়ে তার মুখ থেকেই তার অতীত জেনে নিল। সে এক বিরাট স্টেটমেন্ট। তাতে মামলার সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।
কি দিয়েছে সে জবানবন্দি?
আমি তো এখনও কিছুই দেখিনি। দোভাষীর সাহায্যে সে তার নিজের ভাষায় বলেছে তার তা এখন টাইপ হচ্ছে। একটা কপির জন্য আমি দরখাস্ত করেছি। কাল পরশুর মাঝে পেয়ে যাব। তখন বুঝতে পারব কোন দৃষ্টি নিয়ে মামলা লড়তে হবে। জবানবন্দি না দেখে এখন কিছুই বলতে পারব না। তোমরা বরং দু’দিন পর আস। সব দেখে আলোচনা করা যাবে।
আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে দু’জন অনেকক্ষণ চুপচাপ হাটলাম। সাবওয়ের কাছে এসে কাসেম বলল, কাকা, কি হতে পারে জবানবন্দি?
কি আর হবে? বোধ হয় দোষ কিছু করেছে যা আমরা জানি না এবং তা স্বীকার করেছে। এদেশে দোষ স্বীকার করলে অনুকম্পার দৃষ্টিতে শাস্তি হয়। জবানবন্দি দিয়ে বোধ হয় ভালই করেছে। তারপর সারা পথ দু’জনের আর কোন কথা হয়নি।

অপেক্ষায় থাকুন, আরো আসছে …………………………….

রাজাকারের জবানবন্দি (১)
রাজাকারের জবানবন্দি (২)

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+