রাজাকারের জবানবন্দি (৪)


১৯৭১ সালে ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায় রচনা করেছে আল-বাদর রাজাকাররা। ঘাতক রাজাকাররা কত জঘন্য বর্বরতা, নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, বিভৎস রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্ণনাতীত। আল-বাদর রাজাকারদের নির্দয় নিপীড়নের কাহিনী যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে। গা শিহরিত এমনই এক ঘটনা ‘রাজাকারের জবানবন্দি’ শিরনামে লিপিবদ্ধ করেছেন কানাডা প্রবাসী এম বাহাউদ্দিন। এখানে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হল:

দু’দিনের পর আবার যখন উকিলের অফিসে গেলাম। উকিল তখন অন্য মক্কেলের সাথে ব্যস্ত। আমাদের দেখে উঠে এল এবং বলল: আমি এখন একটা বড় মামলার মক্কেলের সাথে ব্যস্ত আছি। জবানবন্দির কপি আমি পেয়েছি, তার নিজের ভাষা বাংলা এবং ইংরেজি দু’টোই আছে। আমি ওই মক্কেলের সাথে কথা শেষ করে আসতে আসতে তুমি বরং জবানবন্দিটা এক নজর দেখে নাও। এই বলে সে একটা ফাইল আমার হাতে দিয়ে পাশের কামরায় চলে গেল।
আমি ফাইলটা খুলে দেখলাম। প্রথমেই বাংলায় জবানবন্দি। তার নীচে ইংরেজিতে টাইপ করা। নিজের ভাষাতেই পড়তে স্বাচ্ছন্দ বোধ করলাম। বাংলায় ৬২ পৃষ্ঠা। এত বড় জবানবন্দি! কি লিখেছে এত সব! কতক্ষণে শেষ করব! বেচারা! ভয়ে মুখে যা এসেছে তাই বোধ হয় বলেছে। দেখা যাক কি বলেছে।
আমি পড়তে শুরু করলাম:

জবানবন্দি-
আমার নাম আলহাজ্জ মুহাম্মদ ইয়াসিন হাওলাদার। বাড়ী বাংলাদেশের .. জেলার… গ্রামে। পিতা মৃত: মুহাম্মদ আতর আলী হাওলাদার। স্থায়ী ঠিকনা… বাংলাদেশ। বর্তমান ঠিকানা …. কানাডা।
আমার যখন পঁচিশ বছর বয়স তখনই আমার পিতা আমার বিয়ে দেন আমাদেরই গ্রামের শুক্কর বেপারীর একমাত্র মেয়ে ষোড়সি আমেনার সাথে। আমি দেরীতে লেখাপড়া শুরু করি। যখন মাদরাসার ফাজিল শ্রেণীতে পড়ি তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন আমার বয়স তিরিশের মত। আমার মাদরাসার প্রিন্সিপাল কলিমুল্লাহ হুযূর আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি একদিন বললেন, দেশটা ইন্ডিয়া নিয়ে যাচ্ছে। এই পাক ওয়াতানকে রক্ষা করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। এখন জিহাদের সময়। বসে থাকলে চলবে না। দেশটা রক্ষা কর। চলে যাও রাজাকার বাহিনীতে। যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়। বাঁচলে গাজী, মরলে শহীদ মানে বেহেস্ত নসীব।
কলিমুল্লাহ হুযূরের একটা চিঠি নিয়ে আমি ঢাকার মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমার স্ত্রী আমেনাকে বলে এলাম আমি হুযূরের কাজে ঢাকা যাচ্ছি, ফিরতে কতদিন লাগবে জানি না।
যে ঠিকানায় এসে পৌঁছলাম সেটা একটা ছোট একতলা বাড়ী। চিঠি যার নামে দিয়েছে তার নাম মৌলানা ইকবাল আনসারী। দরজায় একটা লোকের সাথে দেখা হল। ইকবাল আনসারীর নাম বলতেই ভেতরে নিয়ে গেল। দেখলাম তিনি একজন জবরদস্ত আলিম। মাথায় পাক কিস্তি টুপি, মুখে কাঁচাপাকা চাপ দাড়ি। পরনে লম্বা শেরোয়ানি। হাতে পানের ডিব্বা। পানের রসে ঠোট লাল হয়ে আছে। সালাম দিয়ে চিঠিটা তার হাতে দিতেই তিনি খুলে পড়লেন। তারপর বললেন, মেরা দুস্ত তুমকো ভেজা, তুম বাঙাল হ্যায়, উর্দু জানতে হো?
মাদরাসায় আমি আরবীর চেয়ে উর্দুতে ভাল রেজাল্ট করতাম। ভাল বলতে পারি। বললাম, জি হুযূর, উর্দু জানতে হো।
জু বুলেগা সব কার সেকতা হু?
জি হুযূর, কাজ করতেই তো এসেছি। এই দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। তাই যুদ্ধে যোগ দিতে এসেছি। আমাকে সুযোগ দিন দেশের খিদমত করার জন্য।
তিনি খুশি হয়ে ডাক দিলেন, আশিক! ইদার আও। পাশের রুম থেকে আশিক নামক লোকটি এসে দাঁড়াল। তার মাথায় পাগড়ী, লম্বা দাড়ি, পরনে পাকিস্তানী শেরুয়ানি। ইকবাল হুযূর বললেন, ইয়ে আদমি কো মেরা দুস্ত ভেজা। উসকু সব কুচ শিখা লও। এক পিস্তল দে দও।
সেই থেকে আমার নতুন জীবনের যাত্রা শুরু।
আও বলতেই আমি তার পিছু রওয়ানা দিলাম। পাশের রুমে নিয়ে গেল আমাকে। এই বাড়ীতে দুটি মাত্র রুম। প্রথমটিতে ইকবাল হুযূর বসেন কিন্তু মালপত্রে ভর্তি। একটা টেবিল আর দুটা চেয়ারের কোন রকমে জায়গা হয়েছে। আর বাকী রুম বড় ছোট অনেক সুটকেস আর বাক্স পেটরা দিয়ে ভর্তি। আর এই রুমে অনেকগুলো কাঠের বাক্স একটার উপর আর একটা সিলিং পর্যন্ত রাখা। একপাশে অনেকগুলো দড়ি, লোহার শিকল, চাপাতি ইত্যাদি একপাশে রাখা। আর এক পাশে অনেকগুলো বন্দুক ওয়ালের সাথে খাড়া করে রাখা আছে। আশিক আমাকে বলল, একটা বন্দুক উঠাও। আমার জীবনে এই প্রথম বন্দুক দেখলাম। ভয়ে হাতে নিচ্ছি না। আশিক বলল, ইয়ে লডেড নেহি। খালি। ইয়ে হ্যায় থ্রি নট থ্রি। বহুত কাম হুতা হ্যায়। মানুষের শরীরে যেদিকে গুলী ঢুকে তা দেখা যায় না। কিন্তু যেদিকে বের হয় সেদিকে বড় একটা গোস্তের খ- নিয়ে বের হয়। কুচ পরওয়া নেহি, লও। আমি হাতে নিলাম। সে আমাকে একে একে দেখিয়ে দিল কিভাবে গুলী ভরতে হয়, কিভাবে গুলী ছুড়তে হয়। কিছুক্ষণের মাঝে এটা শিখে ফেললাম। তারপর সে আমাকে একটা খালি জায়গায় নিয়ে গেল। একটা বড় দালানের পেছনে ওয়ালে একটা মরা গাছের গুড়ি দাঁড় করানো আছে। সে আমাকে ওটা লক্ষ্য করে গুলী ছুড়তে বলল। আমি ভয়ে পারলাম না। তারপর সে নিজে গুলী ছুঁড়ে আমাকে দেখিয়ে দিল। আমি শুরু করলাম। একটার পর একটা ছুঁড়ে নিশানা ঠিক করতে লাগলাম। দু’দিনের মধ্যে আমি পাকা হয়ে গেলাম।
আশিক বলল, এখানে শুধু আমিই বাঙাল। অন্য ডিভিশনে অনেক বাঙাল আছে।
আশিক আমাকে তাদের পোশাক দিল। লম্বা পাকিস্তানী শেলোয়ার পায়জামা, একটা পাকিস্তানী কারুকার্যখচিত টুপি। আর একটা রাইফেল। আশিক বলল, আভি পিস্তল কা শর্ট হ্যায়। রাইফেল ছে আচ্ছা কাম চলতা হ্যায়। রাইফেল কাঁধে নিয়েই আমার মনে হল আমি একজন মহা ক্ষমতাশালী সম্রাট হয়ে গেলাম। পৃথিবীটা এখন আমার হাতের মুঠোয়। যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। আমাকে আর বাঙালি বলে চেনাই যায় না। তাছাড়া ঢাকা শহরে আমার কেউ নেই। আমাকে চেনার কোন প্রশ্নই আসে না।

রাজাকারের জবানবন্দি (২)
রাজাকারের জবানবন্দি (৩)

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+