রাজাকারের জবানবন্দি (৫)


১৯৭১ সালে ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায় রচনা করেছে আল-বাদর রাজাকাররা। ঘাতক রাজাকাররা কত জঘন্য বর্বরতা, নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, বিভৎস রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্ণনাতীত। আল-বাদর রাজাকারদের নির্দয় নিপীড়নের কাহিনী যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে। গা শিহরিত এমনই এক ঘটনা ‘রাজাকারের জবানবন্দি’ শিরনামে লিপিবদ্ধ করেছেন কানাডা প্রবাসী এম বাহাউদ্দিন। এখানে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হল:

পূর্বের পর……………..

এরই মধ্যে একদিন আশিক নিয়ে গেল পাশের আর একটা বাড়ীতে। বাড়ীর গেটে গিয়েই ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুনলাম। মাগো! বাবাগো! বাঁচাও! বাঁচাও! ভেতরে ঢুকে দেখলাম বেশ বড় বাড়ী। অনেকগুলো রুম। এখানে আরও অনেক রাজাকার যার যার কাজে ব্যস্ত। যে রুম থেকে চিৎকার আসছে সে রুমে নিয়ে গেল না। আশিক কয়েকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আসলাম, ইসমাইল, সেলিম, পারভেজ, আসফাক এবং আরও কয়েকজন। আশিক বলল এই মোকাম আমাদের টর্চার সেন্টার। যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলে বা কাজ করে, যারা মুক্তিযোদ্ধা তাদের ধরে এনে এখানে শাস্তি দিই। আমরা না পারলে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেই। ভেতরের রুমে এখন কিছু বাঙালকো শাস্তি চলছে। এখন আমরা অপারেশনে যাব। বলে সে একজনকে ডাক দিল, এই গুড্ডু, চল মেরা সাথ। গুড্ডুর সাথে আর একজন এল নাম গুরগন।
আমরা চারজন রওয়ানা দিলাম। বেশ কিছুদূর এসে একটা বড় বাড়ীর গেটে দাঁড়াল আশিক। আশিক এখানকার লোক। সব চিনে। বিশেষ করে ইলেকশনের সময় কারা শেখ মুজিবের পক্ষে কথা বলেছে সে সব চিনে রেখেছে। তার মত আরও অনেক স্থানীয় বিহারী আছে যারা এসব খবর রাখে। তারাই এই রাজাকারের সমস্ত কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। গেটে দাঁড়িয়ে আশিক ধাক্কা দিল। একবার দু’বার দেবার পরও কেউ খুলেনি। গুরগনকে ইশারা করতেই সে এক লাথি দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ফেলল। গুরগনের দেহটার কোন বিশদ ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু বলব একটা ছোট খাটো দৈত্য। এক লাথিতেই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল সবাই। না, বাড়ীতে কোন মানুষ নেই। একবারে শুনশান। নিস্তব্দ।
আমার ট্রেনিং চলছে। আশিকের পিছু পিছু চললাম। একতলার সব কয়টা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিছু কাপড়-চোপড় আর আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই নাই। উপর তলায় গিয়ে দেখলাম তিনটা রুম। ভেতরে থেকে দরজা বন্ধ। আশেক দরজায় ধাক্কা দিল। খুলেনি। তারপর গুরগনের দিকে তাকাতেই দিল লাথি। দরজা খুলে পড়ে গেল।
ভেতরে একজন বৃদ্ধা খাটের উপর বসে কাঁপছে। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। আশিক জিজ্ঞেস করল, সোনা দানা ক্যায় হ্যায় সব লও বুড্ডি! বৃদ্ধা হাত দিয়ে একটা আলমারি দেখিয়ে দিল। গুড্ডু খুলল। খুব বেশি টাকা পয়সা পাওয়া গেল না। তবে দামী কিছু মেডেল পাওয়া গেল। তারপর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে আশিক জিজ্ঞেস করল, আওর কেয়া হ্যায়।
আর কিছু… বলেই বৃদ্ধার গলা বন্ধ হয়ে এল।
গুরগন বৃদ্ধাকে টান দিয়ে নীচে ফেলে পা দিয়ে চেপে ধরে বলল-বাতাও! সবকুচ বাতাও! বৃদ্ধা কোন কথাই বলতে পারল না। তারপর আশিকের কোমরে গোজা পিস্তলটা একবার আওয়াজ হল। বৃদ্ধা একবার শুধু একটু নড়ে উঠল। তারপর নিথর।
তারপর পাশের রুমে গেল। তেমনি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। গুরগন ভাঙল। ভেতরে দশ বছরের এক সুন্দর নাদুস-নুদুস ছেলেকে আঁকড়ে ধরে তার মা কাঁপছে। মা ও ছেলের এমন রূপ আমি কখনও দেখিনি। যেমন মায়ের রূপ তেমনি ছেলের। হঠাৎ আমার হল এখন তো আমার ট্রেনিং চলছে। মন দুর্বল হলে চলবে না। বলা হয়েছে আমরা এখন দেশ রক্ষার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। এসময় দয়ামায়া থাকতে পারবে না। দেশ রক্ষার জন্য সবকিছুই জায়িয। পাশে দাঁড়ানো বাড়ীর মালিক পুরুষটি থর থর কাঁপছে। আশিক এক টান দিয়ে ছেলেটিকে তার মার কোল থেকে ছিনিয়ে এনে সার্টের কলার ধরে বলল, বহুত আচ্ছা লেড়কা! বহুত খুবছুরত! পিস্তলটা লোকটার দিকে ধরে জিজ্ঞেস করল, টাকা পয়সা কোথায় বের কর।
লোকটা তাড়াতাড়ি ঘরের এক কোণ থেকে তার স্টিলের আলমারিতে রাখা টাকার বান্ডেল এনে দিল। বলল, তোমাদের যা লাগে সব নিয়ে যাও। আমাদের জানে মেরো না। ………………

অপেক্ষায় থাকুন, আরো আসছে …………………………….

রাজাকারের জবানবন্দি (৩)
রাজাকারের জবানবন্দি (৪)

Views All Time
1
Views Today
4
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. হৃদয় বিদারক …… Rain Rain
    [img]http://www.sabujbanglablog.net/wp-content/uploads/2011/11/flowerrain.jpg[/img]

  2. আসলে বর্ণনায়তো সব আসে না। তাদের জুলুম-নির্যাতন, রাহাজানি, পৈশাচিকতা আরো কঠিন মারাত্মক। এদের উপর আল্লাহ পাক উনার লা’নত।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে