রাজাকারের জবানবন্দি (৭)


১৯৭১ সালে ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায় রচনা করেছে আল-বাদর রাজাকাররা। ঘাতক রাজাকাররা কত জঘন্য বর্বরতা, নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, বিভৎস রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্ণনাতীত। আল-বাদর রাজাকারদের নির্দয় নিপীড়নের কাহিনী যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে। গা শিহরিত এমনই এক ঘটনা ‘রাজাকারের জবানবন্দি’ শিরনামে লিপিবদ্ধ করেছেন কানাডা প্রবাসী এম বাহাউদ্দিন। এখানে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হল:

পূর্বের পর……………..

আমাদের অপারেশন চলল রাত দিন, যখন তখন। মিরপুর, মুহম্মদপুর, রায়ের বাজার, কাটাবন, ধানম-ি, ওদিকে তেজগাঁ, কারওয়ান বাজার, গুলশান যখন যেখানে সুবিধা আমরা অপারেশন শুরু করলাম।
এর মধ্যে আমাদের আনসারী হুযূরের প্রমোশন হয়ে চলে গেছে হেড কোয়ার্টারে। হুযূরের জায়গায় প্রমোশন পেয়েছে আশিক। এখন আমাদের প্লাটুনে প্রায় ষাট জন রাজাকার কাজ করে। আসলে সব বিহারিরাই রাজাকার। আমার কাজে খুশি হয়ে আশিক আমাকে আরও দায়িত্ব দিয়েছে। এখন আমি নিজেই অপারেশন লিডার। সব করতে পারি। বুঝতে পারলাম শত্রু চেনার প্রয়োজন নেই। বাঙালি হলেই হল। যাদের ঘরে সোনা-দানা টাকা-পয়সা আছে তারাই দেশের শত্রু।
বাঙালি সব খতম করতে হবে। সেই আদেশে আমি আমার দল নিয়ে মিরপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে হানা দিয়েছি। যে বাড়ীতে পুরুষ পেয়েছি তাদের ধরে এনে তাদের দিয়েই কবর খুড়িয়েছি। তারপর তাদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে খতম করেছি। মিরপুরের বধ্যভুমি বলে পরিচিত আজকের যে জায়গা তাতে আমার দান অনেক। বেশিরভাগ শত্রু আমিই খতম করে ওখানে মাটিচাপা দিয়েছি। কখনও খোলা জায়গায় ফেলে এসেছি। তাদের বাড়িঘর লুট করেছি। লুটের মাল আমার দলের মাঝে ভাগ করে দিয়েছি ঈমানের সাথে। ইসলাম ধর্মের প্রধান অঙ্গ ঈমান। আমার ঈমান খুব শক্ত। আমার এসব কাজে খুশি হয়ে আশিক আমাকে প্রমোশন দিল কমান্ডার হিসেবে। তখন আমার ক্ষমতা আরও বেড়ে গেল।
একদিন গেলাম ধানমন্ডির একটা বাড়ীতে। আমাদের কাছে খবর ছিল বাড়ীর মালিক আ’লীগ করে। অনেক ধনী। কাজেই সে দেশের শত্রু। মুক্তি। একদিন সকাল দশটায় একটা ছোট ট্রাক নিয়ে আমরা সে বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। বিরাট দু’তলা বাড়ী। লোহার গেইট। অনেক ধাক্কাধাক্কির পরও দরজা খোলেনি। গুরগনকে এখন আর বলতে হয় না। দরজা ভাঙার জন্য সে উস্তাদ। একবার তার দিকে তাকালেই হল। আমি তার দিকে তাকাতেই সে তার কাজ শেষ করে ফেলল। আমরা পাঁচজন বিনা বাধায় বাড়ীর ভেতর ঢুকলাম। নীচের তলায় অনেকগুলো রুম। জিনিসপত্রে ঠাসা। দামী ফার্নিচার। একটা রুমে দেখলাম বেশ কিছু সুটকেস রাখা আছে। মনে হল- হয় যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে না হয় চলে গেছে। সবগুলো রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম। কেউ নেই। কিন্তু এতসব জিনিস কিভাবে নিব! আমাদের ট্রাকে জায়গা হবে না। ভাবলাম একবারে না পারি কয়েকবারে নেয়া যাবে। আমরা উপরে গেলাম। চারটা রুম। তিনটা রুম ভেতর থেকে বন্ধ। একটায় তালা দেয়া। বুঝলাম তিনটা রুমে মানুষ আছে। ধাক্কা দিলাম। খোলেনি। তারপর গুরগন তার কাজ করল। দরজা খুলতেই আমরা ভেতরে ঢুকলাম। খুঁজতে লাগলাম মানুষ এবং সোনা-দানা কি আছে। স্টিলের আলমারী বন্ধ। পাশে আলনায় অনেক দামী কাপড়। দামী ফার্নিচার। পেছন থেকে থেকে গুড্ডু চিৎকার করে উঠল, মিল গায়া! সে খাটের নীচ থেকে একটা লোক টেনে বের করে আনল। দেখলাম আধ বয়সি লোকটা কাঁপছে। আমি খুব জোরে একটা ঘুসি লাগিয়ে দিলাম তার মুখে। বললাম, আলমারির চাবি দে! সে কাঁপতে কাঁপতে বালিশের নিচে থেকে চাবি দিল। আলমারিতে আমরা অনেক টাকা পয়সা সোনা-দানা পেলাম।
গুড্ডু আবার চিৎকার করে উঠল, কিমতি চিজ মিল গায়া উস্তাদ! দেখলাম আলনার পেছন থেকে এক অনিন্দ সুন্দরী মহিলাকে সে টেনে বের করে আনল। মহিলার বয়স তিরিশের উপর হবে। এমন সুন্দরী মহিলা আমি আর দেখিনি। তার গায়ে অনেক গহনা। জ্বল জ্বল করছে। মহিলা আমার পায়ের উপর পরে কেঁদে উঠল। বলল, আমাদের সব নিয়ে যাও! আমাদেরকে মেরো না! এর মধ্যে গুরগন লোকটার হাত পিছমোরা করে বেঁধে ফেলল। গুরগনের কাছে সব সময় দড়ি আর চোখ বাঁধার কাপড় থাকে। তার লম্বা জামার পকেটে আরও অনেক কিছু রাখা যায়। লোকটা যেন একটা পুতুল। কোন কথা বলছে না। গুরগন তাকে নীচে ফেলে পা দিয়ে মাথা চেপে ধরেছে। একটার পর একটা লাথি দিচ্ছে। কোন আওয়াজ নেই। বোধ হয় বোবা। তারপর মহিলাকে হাত বেঁধে আমরা সব রুম দেখলাম। যে রুমটা তালা দেয়া সে রুমের চাবি নিলাম মহিলার ব্যাগ থেকে। খুলে দেখলাম। রুমে মানুষ নেই। তবে কাপড়-চোপড় ভর্তি। খাটের নিচে খুঁজলাম। দেখলাম একটা কম্বল পড়ে আছে। টান দিতেই এটা ভারি মনে হল। বের করে আনলাম। কম্বলটা সরাতেই একটা চিৎকার করে উঠল। একটা দশ বার বছরের মেয়ে। কম্বল জড়িয়ে এখানে লুকিয়ে আছে। আর বাইরে থেকে তালা দিয়ে রেখেছে।

অপেক্ষায় থাকুন, আরো আসছে …………………………….

রাজাকারের জবানবন্দি (৬)

Views All Time
2
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. আল-বাদর রাজাকাররা। ঘাতক রাজাকাররা কত জঘন্য বর্বরতা, নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, বিভৎস রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্ণনাতীত। আল-বাদর রাজাকারদের নির্দয় নিপীড়নের কাহিনী যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে। গা শিহরিত এমনই এক ঘটনা ‘রাজাকারের জবানবন্দি’ Announce Announce Announce Announce Announce Announce Announce Announce Announce Announce

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে