রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছে


আরাকানে বিপন্ন মানবতা

রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছে

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে বসবাসকারী মুসলমানদের উপর দীর্ঘদিন থেকেই অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে আসছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতি রাখাইন (মগ) সন্ত্রাসীরা। এতে রয়েছে সরকারি মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা। নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ আর লুটপাট করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না তারা। নির্বিচারে হত্যাও করছে। অনেককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ক্রুসেডীয় বর্বরতার চেয়েও নির্মম ওই হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন শত শত মুসলিম রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। হত্যার পর তাদের লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে সাগরে। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির শিকারও হয়েছেন বহু মুসলিম নারী। উপজাতি রাখাইন (মগ) সন্ত্রাসীদের নির্যাতনের সঙ্গী হচ্ছে মিয়ানমারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও। তাদের সামনেই মুসলমানদের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে এসব রোহিঙ্গা মুসলমান নাফ নদী পাড়ি দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশের নির্দয় মহাজোট সরকার। জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আবেদন-নিবেদন সত্ত্বেও বাংলাদেশ কোনো শরণার্থী নিতে রাজি হয়নি। মিয়ানমার সীমান্তে কড়া পাহারায় বিজিবি ও কোস্টগার্ড। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা এসব নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশব্যাক করা হয়েছে, হচ্ছে মিয়ানমারে। অনেকে মিয়ানমারে ফিরতে না পেরে অথৈ সাগরে ভেসেছে দিনের পর দিন। কোনো কোনো নৌকা পানিতেই ডুবিয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর যালিম সদস্যরা। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্মরণকালের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে নানাভাবে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ইন্টারনেট, স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে রিপোর্ট তৈরি করেছেনে টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদাতা।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতি রাখাইন (মগ) সন্ত্রাসীদের লোমহর্ষক নির্মম অবিশ্বাস্য অত্যাচারে বিপন্ন হয়ে পড়েছে মানবতা। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। সে দেশের সরকার আরাকান রাজ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো হচ্ছে ভয়াবহ নির্যাতন। তাদের আহাজারি ও আর্তনাদে আরাকানের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সর্বত্র কান্নার রোল পড়েছে। অব্যাহত অমানবিক নির্যাতনে আরাকানের আকিয়াব বিমানবন্দর সংলগ্ন প্রাচীনতম শফি খান জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা জিয়াউল হকসহ হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। তা এখনো অব্যাহত আছে।
গত এক মাস ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীতে অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলমানের লাশ ভাসতে দেখা গেছে। সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী থেকে ওয়ালিদং সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারিতে রয়েছে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ বিজিবি। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন লোকজন জানান, মিয়ানমারের তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় গত ১৮ জুন ২০১২ ঈসায়ী একদল রোহিঙ্গা মুসলমান সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিজিবি তাদের পুশব্যাক করে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের মংডু, আকিয়াব, বুচিডং ও কেয়ত্তর শহরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাড়িতেই বন্দি অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। কোনোমতেই তাদের বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছে না মিয়ানমারের আইন প্রয়োগকারী সদস্যরা। তবে রোহিঙ্গারা সে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনের কথা বলে বাংলাদেশ ও চীন সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তারা বলছে, সে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বর্বর, জংলী, উচ্ছৃঙ্খল উপজাতি মগ (রাখাইন), চাকমাসহ যালিম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সন্ত্রাসী লোকরা মুসলমানদের হাজার হাজার বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসায় আগুন দিয়েছে। চালিয়েছে লুটতরাজ। নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে মুসলমানদের উপর। এছাড়াও শত শত মুসলমানের লাশ মাথা ন্যাড়া করে লাল কাপড় পরিয়ে মংডুর তিনমাইল-চারমাইল, বাঘঘোনা, বুমুপাড়া, নূরুল্লাপাড়া, হাইচচুরাতা, কাইন্দাপাড়া, সিকদারপাড়া, নলবনিয়া ও কালাব্রিজ এলাকায় পুঁতে রেখে ওরা রাখাইন সন্ত্রাসীদের মৃতদেহ বলে অপপ্রচার করছে।
সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনকালে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের দাঙ্গায় হাজার হাজার মুসলমান মারা যাওয়ার পর সে দেশের সরকার সীমান্ত বাহিনী নাসাকা সদস্যদের পাশাপাশি সীমান্তজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সীমান্তে পরিস্থিতি উত্তেজনাকর না হলেও রাখাইন সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেয়া আগুনে অসংখ্য বাড়িঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মিয়ানমার থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আকিয়াব শহরের ওয়্যারলেসপাড়া, জাইল্যাপাড়া, রোহিঙ্গাপাড়া, নাজিরপাড়া, কাহারীপাড়া, মংডু শহরের চারকোপা, চারমাইল, তিনমাইল, ছনখোলাপাড়া, আশিখ্যাপাড়া, খাইন্দাপাড়া, বোমোপাড়া, কোনারপাড়া, কাদিরপাড়া, নুরুল্লাহপাড়া, বাঘঘোনা গ্রামে নাসাকা ও পুলিশ সদস্যরা দফায় দফায় ব্যাপক গুলিবর্ষণ করলে বহু লোক আহত হয়েছে। মংডু শহর থেকে মোবাইলফোনে মিয়ানমারের এক নাগরিক সাংবাদিকদের জানান, গত ১১ জুন ২০১২ ঈ. সেনাবাহিনীর গুলিতে জাহাজকাটা গ্রামে ২ রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছে। বর্তমানে সে দেশের সরকার নাসাকা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। ওই ব্যক্তি আরও জানান, ৪টি বোট নিয়ে প্রায় সাতশ’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ সেন্টমার্টিন সাগরপথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা নদীতেই ভাসছিল। ওই বোটে বেশকিছু গুলিবিদ্ধ ও আহত মানুষও ছিল বলে তিনি জানান। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। মিয়ানমারের আরাকানের ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের মংডু উপশহর এবং আকিয়াব সে দেশের সামরিক জান্তা সীমান্ত বাহিনী নাসাকা এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন (মগ) উগ্রপন্থীদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে চলছে। এখনও আরাকান ও আকিয়াবে ধর্মীয় সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর দমন ও নিপীড়ন চলছে। রোহিঙ্গা মুসলমান ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে ওই দেশের সামরিক জান্তা ও নাসাকা বাহিনীর সহযোগিতায় লুটতরাজ চলছে অব্যাহতভাবে। এ অবস্থার মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে অর্ধাহারে-অনাহারে জীবনযাপন করছে। তাদের আর্তনাদে আকিয়াবের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নির্যাতিত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানরা ফরিয়াদ করছে, হে আল্লাহ পাক! এ যালিম সরকারের কালোহাত থেকে আমাদের বাঁচাও এবং বিশ্বের মুসলিম দেশের প্রতি কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলছেন, আপনারা আমাদের ঈমানী ভাই, সে হিসেবে আপনারা এগিয়ে আসুন। আমাদের রক্ষা করুন। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক যেসব সংস্থা বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের নির্দয় মহাজোট সরকার বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করছে।
আরাকানে জ্বলছে বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসা :
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেছে, আরাকান রাজ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে মুসলমানদের হাজার হাজার বসতভিটা। যে লোকটি একদিন আগেও সম্পদশালী ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সহায়-সম্পদ হারিয়ে উদ্বাস্তু ও শরণার্থী হয়ে গেছে। অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা। যালিম বৌদ্ধদের লুণ্ঠনকারী সন্ত্রাসী বাহিনী লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে সহায়-সম্পদ। রাখাইন সন্ত্রাসীরা মুসলমানদের হত্যা করে মৃতের লাশ সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এসব লাশ বাংলাদেশের নৌসীমানায় প্রবেশ করছে। মিয়ানমারে নৌবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ সাগরে অবস্থান করছে এবং তারা রাখাইন সন্ত্রাসীদের পক্ষে একতরফা ভূমিকা রাখছে। মংডুর বমুপাড়ায় ১২ জুন সকাল ১০টায় মুসলমানের দুটি ঘর পুড়িয়ে দিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। দেশটির বিশেষ বাহিনী তথা লুণ্ঠন বাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ বন্দরনগরী আকিয়াবের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় গ্রাম নাজিরপাড়ার প্রায় ২৭শ’ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে। পুড়িয়ে দিয়েছে বেশকিছু মসজিদ ও দোকানপাট। মুসলমানদের মৃত লাশ গাড়িতে করে নিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। জীবিতদের ধরে গাড়িতে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত মুসলমানদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে, পরে তাদের সাগরে ডুবিয়ে মারা হচ্ছে। এসব লাশ সেন্টমার্টিনের অদূরে দেখেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। টেকনাফ নয়াপাড়ার খুরের মুখের জেলে আবদুশ শুক্কুর ২টি লাশ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। আকিয়াবের মৌলভীপাড়া ও হাড্ডিহলা গ্রামের প্রায় ২৫শ’ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
আরাকানে রাখাইন সন্ত্রাসীরা শুধু জ্বালিয়ে পুড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি। তারা মুসলমানদের নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুটপাট করে নিচ্ছে। মহিলাদের সম্ভ্রমহরণ করছে। গত ১২ জুন ২০১২ ঈ. সকাল ৯টায় মংডু বাজারের খেলার মাঠের সামনে মোহাম্মদ আলীর রামং ফার্মেসি ও বাড়ির মালামাল লুট করে নেয় রাখাইন সন্ত্রাসীরা। ৩নং সেক্টরে কুকুমো, আকিয়াব, থাইমোতে সেনাবাহিনী কর্মকর্তার সম্মুখে ঘরবাড়ি এবং মসজিদে আগুন দেয় ও ভাংচুর করে। আকিয়াবের জেলার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা মেরে বং অগ্নিসংযোগে নিহতদের মাথা ন্যাড়া করে ভিক্ষুদের লাল পোশাক পরিয়ে দেয়ার খবর মিয়ানমারের টিভি চ্যানেল ও ওয়েবসাইটে প্রচারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি :
টেকনাফের ৪২ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, পুরো সীমান্ত এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টেকনাফ উপজেলার শামলাপুরে একটি অস্থায়ী বিজিবির চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সীমান্তে বিজিবি সদস্য বাড়ানো ও অবৈধ অনুপ্রবেশ আশঙ্কা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও বিওপিগুলোকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। নাফ নদে টহল জোরদার করা হয়েছে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে বন্দর ও ট্রানজিট ঘাটগুলোর কার্যক্রম অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
মানবিক বিপর্যয় : মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। গুলিবিদ্ধরা চিকিৎসাহীন অবস্থায় মৃত্যুপথের যাত্রী হলেও কোথাও চিকিৎসা নিতে পারছে না। অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছে। এদিকে গুলিবিদ্ধ কয়েকজন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। গুলিবিদ্ধ কয়েকজন হলেন মংডু জামতলীপাড়ার আহমদ হোছনের ছেলে কালা হোছন (৬০), নাপিতের ডেইল এলাকার মকুতল হোছনের ছেলে হাফিজুর রহমান (২০), বাসুরপাড়া দুদুমিয়ার ছেলে ছৈয়দি (৩৫), কাহারীপাড়া হাফেজ আহমদের ছেলে রিদুয়ান (১৭), মংডু নয়াপাড়া এলাকার আবু জমিলের ছেলে মো. তৈয়ুব (১৮)। গুলিবিদ্ধরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা গুলিবিদ্ধ কালা হোছেন (৬০) জানান, মিয়ানমারে চিকিৎসা নিতে না পারায় মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে এসেছি। এছাড়া সরকারি বাহিনীর ইন্ধনে রাখাইন সন্ত্রাসীদের অমানুষিক নির্যাতন সইতে না পেরে ১১ জুন ৮টি ট্রলারে প্রায় ৫০৪ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় নাফ নদে ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভাসছিল। কিন্তু বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশে ঢুকতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা কোথায় গেছে জানা নেই তার।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাবেক মেম্বার নূর মোহাম্মদ জানান, এসব ট্রলারে গুরুতর অসুস্থ, আহত, গুলিবিদ্ধ ও সন্তানসম্ভাবা মহিলারা আছে। তাছাড়া অনাহারজনিত কারণে তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত কাহিল। দ্বীপের লোকজন রান্না করা ভাত ও পিপাসা মেটানোর জন্য পানি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাধার মুখে তা দেয়া সম্ভব হয়নি। অনুপ্রবেশের জন্য মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম নাফ নদে নৌকা নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। নিরুপায় বহু মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও সাগরে ভাসছিল। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ভাসমান ট্রলারে ৮ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ১১ জুন ভোররাতে নাসাকা বাহিনীর ধাওয়ায় ৪টি রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের পাশে রহিঙ্গা প্রবেশ ইস্যুতে কথা বলার সময় সেখানে হাজির হন দুই নারী। মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে ঢুকে অটোরিকশা নিয়ে সোজা চলে এসেছেন কুতুপালংয়ে। বখতিয়ার বাজার এলাকায় মিয়ানমারের কয়েকজন প্রবেশকারী বলেছিলেন, মূলত হাটের দিন মিয়ানমার থেকে অনেক লোক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তবে এলাকাবাসী জানান, প্রতিদিনই ুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। সীমান্ত এলাকায় কিছু সময় দাঁড়ালেই দু-একজন করে আসতে দেখা যায়।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তে কিছু দূর যাওয়ার পর মাঠ আর সীমানা খুঁটি দেখিয়ে সহযাত্রীদের একজন বলেন, ‘ওই যে মিয়ানমার। দেখেন, মিয়ানমার থেকে কয়েকজন বাংলাদেশের ভেতর ঢুকছে।’ এ সময় এক বিজিবি সদস্যকে লাঠি হাতে ওদের না আসার ইশারা দিতে দেখা গেল। আরও কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর শীর্ণকায় এক শিশুকে কাঁদতে দেখে তাকে কেউ মেরেছে কি-না, শিশুটি জবাব না দিয়ে বাংলাদেশের আরও ভেতরে আসার রাস্তার দিকে তাকিয়ে কাঁদে। তমব্রু সীমান্তের কাছাকাছি যে জায়গায় অটোরিকশা থামল, তার একটি বাড়ির পুকুরপাড় থেকে স্পষ্ট দেখা গেল সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের লোকজনের আনাগোনা। ছোট এক পাহাড়ের ওপর নাসাকা বাহিনীর ক্যাম্পও চোখে পড়ল।
২০০৫-এর পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ :
২০০৫ সালের পর বাংলাদেশ থেকে একজন রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত প্রায় ২৯ হাজার রোহিঙ্গাকে জোর করে ফেরত পাঠানোর সুযোগ বাংলাদেশের যেমন নেই, তেমনি নানা বাধার তারাও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চায় না। দু’দশক ধরে প্রায় সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. রংধনুরংধনু says:

    রুখে দিন জুলুমবাজ কাফেরদেরকে Announce Knife Knife Hammer

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে