“লংমাচ” ইসলাম উনার দৃষ্টিতে হারাম, নাজায়িজ ও কুফরী। ধারাবাহিক পর্ব-৪


বিধর্মদের সাথে অমিল রাখা শরীয়তের মুবারক নির্দেশঃ

তাই আমরা দেখতে পাই ইহুদী-খ্রীষ্টান তথা বিধর্মীরা যে সকল আমল করত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সকল জিনিস স্বয়ং নিজেও অনুসরণ করতেন না এবং আমাদেরকেও কঠোরভাবে অনুসরণ না করার জন্য তাগিদ দিতেন। যেমন, ইহুদী-নাসারারা আশুরার একদিন রোযা রাখত, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতে মুহম্মদীকে দুইদিন রোযা রাখতে বললেন। ইহুদী-নাসারারা দেরী করে ইফতার করত। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণকে তাড়াতাড়ি ইফতার করতে বলেন। আবার ইহুদীরা শুধুমাত্র পাগড়ী ব্যবহার করত। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি ছাড়া পাগড়ী পরতে নিষেধ করেছেন এবং টুপীসহ পাগড়ী ব্যবহার করতে বলেছেন।

দাড়ি ও মোঁচের ব্যাপারে মজুছী (অগ্নি উপাসক) ও মুশরিকদের বিরোধিতা করতে বলেছেন।     যেমন, তারা দাড়ি কাটতো ও মোঁচ বড় করত। তাই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা দাড়ী বড় কর ও মোঁচ ছোট কর। ইত্যাদি প্রত্যেক বিষয়ে আল্লাহ্ পাকের রসুল  হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের আস্তিক, নাস্তিক, ইহুদী-নাসারা, মজুছি-মুশরিক তথা বিজাতীয় বিধর্মীদের অনুসরণ না করে বরং খিলাফ করতে বলেছেন। কারণ, আল্লাহ্ পাক বলেন,

هو الذى ارسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا.

অর্থঃ- তিনিই (আল্লাহ্ পাক) তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ (পূর্বের) সমস্ত দ্বীনের উপর প্রাধান্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ্ পাকই যথেষ্ট।” (সূরা ফাত্হ/ ২৮)

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

قل ان هدى الله هو الهدى ولئن اتبعت اهواءهم بعد الذى جاء ك من العلم مالك من الله من ولى ولا نصير.

অর্থঃ- “বলে দিন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর হিদায়েতই প্রকৃত হিদায়েত। আপনার কাছে সত্য ইল্ম (অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম) আসার পরও যদি আপনি তাদের নফসের বা মনগড়া নিয়ম-নীতির অনুসরণ করেন তবে আপনার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নাই বা পাবেননা।” (সুরা বাক্বারা/১২০)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী আমাদের কোন আমল করতে হলে বিধর্মী, বিজাতীয় বা নফসের কোন অনুসরণ করা যাবে না। বা তাদের থেকে কোন নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা যাবে না কারণ তা আল্লাহ্ পাক বাতিল ঘোষণা করেছেন। শুধুমাত্র কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করতে হবে সেটাই নির্দেশ দিয়েছেন। বেদ্বীন ও বদ্দ্বীনদের অনুসরণ ও অনুকরণ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ليس منا من تشبه بغيرنا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমাদের ভিন্ন অন্য জাতির অনুসরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (তিরমিযী, মিশকাত)

তিনি আরো বলেন,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।” (আবূ দাউদ, মুসনদে আহমদ)

এই হাদীস শরীফ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত ঘটনা উল্লেখ করা যায়, হিন্দুস্থানে একজন জবরদস্ত আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। যিনি ইন্তিকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি স্বপে¦ তাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী, আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই আল্লাহ্ পাক-এর ওলী জাওয়াবে বলেন, “আপাতত আমি ভালই আছি কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে। যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ফেরেশ্তারা সরাসরি আল্লাহ্ পাক-এর সম্মুখে পেশ করেন। আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাদের বলেন, “হে ফেরেশ্তাগণ! তোমরা কেন তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছ”? ফেরেশ্তাগণ বলেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমরা তাকে খাছ বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য নিয়ে এসেছি।” এটা শ্রবণ করে আল্লাহ্ পাক বললেন, “তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে। কেননা সে পূঁজা করেছে। এটা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আরজু পেশ করলাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরমাবরদার ছিলাম। কখনও ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং কখনো পুঁজা করিনি আর মন্দিরেও যাইনি।” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “তুমি সেইদিনের কথা স্মরণ কর, যেদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূঁজা হচ্ছিল। তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, উপরে-নীচে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ সবকিছুকে রঙ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ তোমাকে তো কেউ রঙ দেয়নি, এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রঙ দিয়ে দিলাম।” এটা কি তোমার পূঁজা করা হয়নি? তুমি কি জান না,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।”     সুতরাং তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে।” যখন আল্লাহ্ পাক এই কথা বললেন, তখন আমি লা-জওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে বললাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি।” কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্ পাক বললেন, “হ্যাঁ তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হয়েছে।”

বনী ইসরাঈল আমলের অনুরূপ আরও একটি ওয়াকেয়া তফসীরে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ্ পাক হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম-এর উপর ওহী নাযিল করলেন, হে আমার নবী! আপনার উম্মতের মধ্যে ১ লক্ষ লোককে ধ্বংস করে দেয়া হবে, যার মধ্যে ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত (গোমরাহ)। তখন হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত তাই তাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে কিন্তু বাকী ৪০ হাজার লোককে ধ্বংস করা হবে কেন?” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “যেহেতু তারা তাদের সাথে মিলা-মিশা ও ওঠা-বসা করে এবং সম্পর্ক রাখে আর গুণাহের কাজে বাধা দেয় না, তাই তাদেরকেসহ ধ্বংস করে দেয়া হবে।”

উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই সাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-সূরত কোনটাই অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবেনা। যদি কেউ করে তবে তার থেকে সেটা আল্লাহ্ পাক গ্রহণ করবেন না বা কোন সওয়াবও দেবেন না এবং আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন মদদ পাবেনা। যার ফলে সে ইহকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালেও তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে যাদেরকে সে অনুসরণ করতো।      কাজেই লংমার্চ কোন মতেই জায়েয নেই।

বিধর্মীদের তৈরী দ্রব্য-সামগ্রী ব্যবহার করা জায়েয রয়েছে।

সমরাস্ত্র ঃ বিধর্মীদের আকিষ্কৃত সমরাস্ত্র মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করা জায়েয। কেননা কাফিররা হলো মুসলমানদের খাদিম, শুধু তাই নয় সমগ্র মখলুকাতকেই সৃষ্টি করা হয়েছে মুসলমানদের ফায়দার জন্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন,

هو الذى خلق لكم ما فى الارض جميعا.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যিনি তোমাদের (ফায়দার) জন্য দুনিয়ার সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাক্বারা/২৯)

হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

ان الدنيا خلقت لكم وانكم خلقتم للاخرة.

অর্থঃ-“নিশ্চয়ই দুনিয়া তোমাদের (খিদমতের) জন্য তৈরী করা হয়েছে আর তোমরা সৃষ্টি হয়েছ পরকাল (আল্লাহ্ পাক)-এর জন্য।”

কাজেই কাফিররা মুসলমানদের খাদিম। তারা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে এবং করবে। যেমন (গাড়ী, মাইক, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশন) ইত্যাদি। মুসলমানগণ যখন দেখেন কাফিরদের খিদমত শরীয়তের খেলাফ নয়, তখন তারা ইচ্ছা করলে তা গ্রহণ করতে পারেন। আর শরীয়তের খেলাফ হলে অবশ্যই তা বর্জন করতে হবে। অবশ্য কোন মুসলমানও যদি শরীয়তের খেলাফ কিছু আবিষ্কার করে তবে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন,

تعاونوا على البر والتقوى ولا تعاونوا على الاثم والعدوان.

অর্থঃ- “তোমরা নেকী এবং পরহেযগারীর মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য কর। পাপ এবং শত্রুতার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করোনা।” (সূরা মায়িদা/২)

শুধু তাই নয়, বরং কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা বা সমর্থনও করা যাবে না। তাই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اذا عملت الخطيئة فى الارض من شهدها فكرهها كان كمن غاب عنها ومن غاب فرضيها كان كمن شهدها.

অর্থঃ- “পৃথিবীতে যখন কোন অন্যায় বা পাপ সংঘটিত হয়, তখন যে ব্যক্তি ঐ স্থানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ওটাকে ঘৃণা করে, সে যেন সেস্থানে উপস্থিত ছিলনা। আর যে ব্যক্তি অনুপস্থিত থেকেও পাপের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, সে যেন তথায় উপস্থিত ছিল।”

সুতরাং সমগ্র কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও কিয়াসে কোথাও বিধর্মীদের জিনিসপত্র ব্যবহার করা নাজায়েয ঘোষণা করা হয়নি।

আল্লাহ্ পাক বলেন,

يايها الذين امنوا لاتحرموا طيبت ما احل الله لكم ولا تعتدوا ان الله لا يحب المعتدين.

অর্থঃ- “হে মু’মিনগণ! তোমরা ঐসব পবিত্র বস্তু হারাম করনা, যেগুলো আল্লাহ্ পাক তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সীমা অতিক্রমকারীকে পছন্দ করেননা।” (সূরা মায়িদা/৮৭)

কাজেই সমরাস্ত্র ব্যবহার করা জায়েয, যেহেতু প্রথমত তারা আমাদের খাদিম এবং এগুলি ব্যবহার করলে তাদের অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়না এবং আমলও গ্রহণ করা হয় না। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধর্মীদের বহু জিনিসপত্র ব্যবহার করেছেন কিন্তু তাদের নিয়ম-নীতি কখনও অনুসরণ-অনুকরণ করেননি। যেমন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুমী জুব্বা, মিশরীয় সূতী, ইয়ামানী চাদর, যুদ্ধাস্ত্র, শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি বিধর্মীদের নানা প্রকার জিনিস ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাদের নিয়ম-নীতি আমল-আখলাক কখনও অনুসরণ করেননি। তাই বিধর্মীদের জিনিসপত্র যেমন সমরাস্ত্র মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করা জায়েয পক্ষান্তরে লংমার্চ, হরতাল যা তাদের বিশেষ আমল, করলে তাদের নিয়ম-নীতি অনুসরণ-অনুকরণ করা হয় এবং তাদের আমলকে গ্রহণ করা হয়। যা স্পষ্টতঃই শরীয়তে নিষিদ্ধ ও হারাম।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে