“লংমার্চ” পালন ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ন হারাম, নাজায়িয ও কুফরী। শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে দলীল এবং সংশ্লিষ্ট প্রামান্য দলীলসহ (আপডেট চলছে)


মুসলমান মাত্রই প্রত্যেককে যেকোন কাজ করতে হলে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা এবং কিয়াসের ভিত্তিতে করতে হবে। তাই লংমার্চ করা শরীয়তসম্মত কিনা আর লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয কিনা তার সমাধান করতে হলে প্রথমে এর উৎপত্তি, ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে হবে এবং তারপর কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সাথে মিলাতে হবে, যদি মিলে তাহলে তা জায়েয আর যদি না মিলে তাহলে তা নাজায়েয।

এখন যেহেতু প্রথমে আমাদের ইতিহাস উৎপত্তি সম্বন্ধে জানতে হবে তাই লংমার্চের ইতিহাস নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
লংমার্চের প্রাক ইতিহাসঃ
১৯২৭ সালটা চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির জন্যে এক দুর্যোগপূর্ণ সময় বলে ধরা হয়। পার্টির নির্দেশে মাওসেতুং তার কর্মক্ষেত্র হুনান প্রদেশে শরৎকালীন ফসল তোলার পূর্বে এক কৃষক বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। হুনানের পার্শ্ববর্তী প্রদেশ কিয়াংসির প্রধান শহর নানচাঙ-এ আরেক কমিউনিষ্ট নেতা আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোটামুটি সফল হয়। এ বাহিনী সদম্ভে ক্যান্টেনের দিকে অভিযান চালাতে গিয়ে চীনের তৎকালীন কমিউনিষ্ট বিরোধী প্রেসিডেন্ট চিয়াঙ কাইশেকের বাহিনীর নিকট পরাজয় বরণ করে। নানচাঙ কয়েক দিনের জন্যে কমিউনিষ্ট পার্টির ফৌজের অধীনে থাকলেও ক্যান্টেনের অভিযানে পরাজিত হয়ে একেকজন একেক দিকে পালিয়ে যায়। হোলাঙ সাংহাইতে, চৌ-এন লাই হংকং-এ, মাওসেতুং তার অবশিষ্ট সৈন্য বাহিনী নিয়ে হুনান আর কিয়াংশি প্রদেশের সীমান্তবর্তী পার্বত্য অরণাঞ্চল চিঙ্খানশান এ পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। কিছুদিন পর চু-তে এখানে এসে মিলিত হয় মাওসেতুং এর সাথে।
এদিকে এ বৎসরটি শেষ হওয়ার পূর্বেই কমিন্টার্ণ চীনের এখানে ওখানে কয়েকটি সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সোভিয়েত বলতে কমিউনিষ্টদের ভাষায় একটি ভুখন্ড, যেখানে কমিউনিষ্টরা তাদের কথিত সাম্যবাদের নীতিতে দেশটাকে শাসন করে অর্থাৎ সেখানে উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা হবে জমিদার বা কারখানা মালিক ও কৃষক-মজদুরের তথাকথিত যৌথ স্বার্থে। জমিদার বা কারখানা মালিকরা এ ব্যবস্থা মেনে না নিলে পুলিশ ও মিলিটারী দিয়ে তাদের বাধ্য করা হবে। কারণে কমিউনিষ্টরা সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজস্ব ফৌজ বা গণফৌজ তৈরী করতে সচেষ্ট হয়।
প্রথম সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কোয়াংতুং প্রদেশের হাই-লু-ফেং সোভিয়েত। এর নেতা ছিল পেং পাই। প্রায় সাত-আট লক্ষ কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এ সোভিয়েত কিন্তু এক বছর না যেতেই ১৯২৮ সালের মার্চে তাকে নির্মূল করে ফেলা হয়।
সেক্রেটারী জেনারেলের পদ- ত্যাগ করে চু-চিউ পাই মস্কো চলে যায়। দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করে লি-লি সান। তার প্রধান সহকারী নিযুক্ত হয় চৌ এন লাই। তিন বছর এর মধ্যেই ব্যাপক আকারের বিপ্লব কর্মসূচী হাতে নেয় লিলি সান। তার আশা ছিল এ বিপ্লব শুধু চীনেই নয় বরং তা হবে সমগ্র বিশ্বে এবং এটাই হবে চুড়ান্ত বিপ্লব এবং বিশ্বের শেষ এবং চুড়ান্ত শ্রেণী সংগ্রাম। ১৯৩০ সালের জুনে লি- মাওসেতুং আর চু-তের অধীনস্ত গণফৌজ নিয়ে পার্শ্ববর্তী কারখানা আছে এমন শহরগুলো বিশেষ করে উহান আর হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশা দখল করে নেয়ার জন্যে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে হুকুমনামা জারী করে।
কিন্তু গণফৌজ সে যুদ্ধে পরাজিত হয়। পেং তে হুয়ির পঞ্চম বাহিনী চাংশা দখল করেও স্থায়িত্ব পায়নি। ফলে পরাজিত বাহিনীর অবশিষ্ট ফৌজ নিয়ে মাওসেতুং এবং চুতে পুনরায় পর্বত কন্দরে পালিয়ে যায়।
১৯৩১ সালের গোড়ার দিকে লিলিসানকে সরে দাঁড়াতে হল নেতৃৃত্বের পদ থেকে। পার্টির নতুন নেতৃত্ব গ্রহণ করে মস্কো ফেরৎ ছাত্রদল, যারা ‘অষ্টবিংশতিবলশেভিক’ নামে পরিচিত। এ দলের তিন জন ছিল চীনা বিপ্লবী। এদের ছদ্ম নাম যথাক্রমে- ওয়াং মিং, পে-কু এবং লো ফু। দলের নেতা ছিল ওয়াং ফু। কিন্তু তার নীতিতে কার্যকর হলনা কিছুই। পার্টির ভিতর হতাশা নেমে এল। শহরাঞ্চলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে হতাশা নেমে এলেও চিঙ্খানশান পার্বত্য ভূখন্ডের গভীরে তিন বন্ধু মাওসেতুং, চুতে আর পেনতে হুয়ি অন্যভাবে কাজ করে যাচ্ছিল।
চিঙ্খানশানের কিয়াংশি সোভিয়েতঃ
হুনান আর কিয়াংশি প্রদেশের সীমান্তে চিঙ্খানশান একটা অরণ্য পর্বত পরিধিতে প্রায় দেড়শ মাইল বিস্তৃত। পাইন আর বাঁশ ঝাড়ের জঙ্গল, নেকড়ে, বুনো শুয়োর আর চিতা বাঘের আড্ডা। চম্বল অরণ্যের মতো এখানেও যুগে যুগে আশ্রয় নিয়েছে ডাকাতের দল। ১৯২৭ সালের শেষদিকে পরাজিত ভগ্নহৃদয় সৈন্যদলের ভগ্নাংশ নিয়ে মাওসেতুং ঐ জঙ্গলে এসে আশ্রয় নেয়। তখন তার সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। হুনান এর কৃষক বিদ্রোহের ব্যর্থতা, নানচাঙ এর পতন, ক্যান্টেনের চুড়ান্ত পরাজয় আর পার্টি থেকে মাওসেতুং এর বহিস্কার ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাও এর অবস্থা শোচনীয়। তবুও হতাশ না হয়ে অদম্য স্পৃহা আর মনোবল নিয়ে ডাকাত দলের সাথে সমঝোতা করে ঐ অরণ্যেই একটা সোভিয়েত গড়ে তুলবার চিন্তায় বিভোর হল মাও। কেন্দ্রীয় কমিটির ভৎসনাকে উপেক্ষা করেই মাও ভাব জমিয়ে তুলল ছয়’শ জন সদস্য বিশিষ্ট ডাকাত দলের সর্দারের সাথে। ছয় মাস পরে ১৯২৮ এর বসন্তকালে মাও এর সাথে নয় শত সৈন্য আর চেনয়ি ও লিন পিয়াও নামের দু’জন সহকারী সহ হাজির হয় চুতে। একই বছরে হুনান এর কৃষক নেতা পেনতেহুয়ি হাজারখানিক নিজস্ব সৈন্য নিয়ে এসে মিলিত হয় তাদের সাথে। তিন বন্ধুর মিলিত বাহিনীর সাথে ডাকাত দল আর স্থানীয় কৃষকদের সমন্বয়ে মোটামুটি একটা সৈন্যদল গঠিত হল। সেই সাথে মাও তার নয়া যুদ্ধনীতি প্রবর্তন করে। কিয়াংশি জঙ্গলে যখন এসব ঘটনা ঘটছে, বহিঃচীন তখন জাপানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়ায় চীনের জনগণ জাপান বিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করলে চিয়াঙ জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং উল্টোভাবে জাপান বিরোধী আন্দোলন দমনে সক্রিয় হয়ে উঠে।
চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চিয়াঙ কাইশেক এরপর ঐ কিয়াংশি সোভিয়েতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে পর পর কয়েকটি অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়। অভিযান পরিচালিত হয় ১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে, দ্বিতীয়বার ১৯৩১ এর বসন্তকালে। এ অভিযানকালে গণফৌজ চিয়াঙ-এর বিশ হাজার সৈন্যকে বন্দী করে তাদের সব আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেয়। জেনারালেসিমো চিয়াঙ কাইশেক তৃতীয় অভিযান পরিচালনা করতে নিজেই এসে আস্তানা গাড়ে, গণফৌজের দশগুণ সৈন্য সমাবেশ করে এবারও ব্যর্থ হয়। মাও এবং চু-র গেরিলা যুদ্ধনীতিতে চিয়াঙ এর দুটি বিগ্রেড আত্মসমর্পন করে। বন্দী হয় বিশ হাজার সৈন্য। সেই সাথে তাদের বিশ হাজার রাইফেল এবং কয়েকশ মেশিনগান। গণফৌজের সৈন্য সংখ্যা তখন দুই লক্ষ। তাদের আছে প্রায় দেড় লাখ রাইফেল। জাপানের সাথে যুদ্ধ বাঁধার ফলে ১৯৩২ সালে চিয়াঙ চতুর্থবার অভিযান পরিচালনা করেও মাও বাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে ১৯৩২ সালে ওয়াং মিং অবসর নিয়ে ফিরে যায় রাশিয়ায়। সেক্রেটারী জেনারেল পো-কু তার সহকারী চৌ-এন লাই এবং একজন জার্মান অটোব্রন, যার ছদ্মনাম লি তে, চিয়াঙ এর চতুর্থ বারের ব্যর্থতায় সাহস বেড়ে গেল ওদের। এক লক্ষ গণফৌজ নিয়ে আশ-পাশের শহরাঞ্চলগুলো দখলের হুকুম জারী করল। মাওসেতুং এ নীতির ঘোর বিরোধী থাকার ফলে তার দলের অনেক অনুচরকেই তখন বহিস্কার করা হয়। কিন্তু পো কু আর লি তের আশা সফল হলনা। ঘটনা প্রবাহিত হল ভিন্ন দিকে। চিয়াঙ জাপানের সঙ্গে আতাত করবে না কমিউনিষ্টের সঙ্গে আতাত করে বহিঃশত্রু জাপানকে তাড়াবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। অবশেষে জাপানের সাথে মামুলী ধরণের একটা সন্ধি করে গৃহশত্রুকে সবংশে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পঞ্চম এবং শেষ অভিযান পরিচালনা করতে গণফৌজকে নির্মূলীকরণে পশ্চিমা শক্তির দেয়া পাঁচ কোটি ডলার মূল্যের গম, আগ্নেয়াস্ত্র এবং চারশ বিমান আর দশ লক্ষ সৈন্যের বিরাট বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয় কিয়াংশি সোভিয়েতের বহিঃদ্বারে। রণনীতি বদলে চিয়াঙ এবার চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল লাল এলাকা।
চিয়াঙ সম্মুখ যুদ্ধ না করে সমস্ত এলাকা ঘিরে রাতারাতি পাকা সড়ক নির্মাণ করে রাস্তার উপর সাজোয়া গাড়ী সাজিয়ে মেশিনগান দিয়ে সৈন্যদের বসিয়ে রাখে। ছেলে-মেয়ে, বাচ্চা-বুড়ো যে কেউ ঐ জঙ্গল ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে দেখা মাত্রই গুলি করার নির্দেশ জারী হলো। অতঃপর পরিখা খনন করে কাঁটা তারের বেড়া দিল চার পাশে। যাতে কেউ জঙ্গল ছেড়ে এপারে আসতে না পারে। ঐ ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত পার্বত্য অরণ্যে এক গ্রেন কুইনিন প্রবেশের ক্ষেত্রেও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
অবস্থা পর্যবেক্ষণ পূর্বক এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্যে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বুহ্য ভেদ করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে মাও এবং চু পরামর্শ দিয়েছিল সেনাপতিকে। কিন্তু জার্মান সেনাপতি লি তে-তা অগ্রাহ্য ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে লি তে মাও এর যুদ্ধনীতি অগ্রাহ্য করে ফুকিয়েন-কিয়াংশি সীমান্তে কোয়াংচাঙ এর রণক্ষেত্রে সম্মূখ যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হয়। এতে গণফৌজের চার হাজার সৈন্য নিহত এবং বিশ হাজার সৈন্য আহত হয়। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাদের ফিরে আসতে হল অবরুদ্ধ জঙ্গলে।
এতদিনে পলিটব্যুরো মাওয়ের মত মেনে নিলো।
সোভিয়েত ছেড়ে সদলবলে পালানোর জন্যে প্রস্তুত হলো। আর মাওসেতুং এর কথানুযায়ী কমিউনিষ্ট তথা লাল ফৌজ বা গণ ফৌজ বাহিনীর এই পলায়ণের কাহিনীই ইতিহাসে লংমার্চ নামে অভিহিত। ১৬ইঅক্টোবর ১৯৩৪ সালে শুরু হলো এই কথিত মহাযাত্রা লংমার্চ। পালানোর কৌশল হিসেবে তারা চীনের দক্ষিণ-পূর্ব কিয়াংশি থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে ঘুরে প্রায় (৬-৮) হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে চীনের উত্তর পশ্চিম সেনসি প্রদেশে পৌঁছে। পথে তাদের ১৮টি পাহাড়ের সারি ও ২৪টি নদী অতিক্রম করতে হয়। মাওসেতুং এর নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের এই দীর্ঘ বিপদসঙ্কুল পথ পলায়নের কাহিনীই ইতিহাসে লংমার্চ নামে অভিহিত বা মশহুর।

চিত্র:  মাওসেতুং লংমার্চ ম্যাপ- ১৯৩৪ সাল

ধারাবাহিক চলবে……………………………………..

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+