“লংমার্চ” পালন করা ইসলাম উনার দৃষ্টিতে সম্পূর্ন হারাম, নাযায়িজ ও কুফরী। ধারাবাহিক পর্ব-৩


ইসলামের আলোকে লংমার্চের উপরোক্ত ইতিহাস আলোচনা করলে বিষয়টি দুভাবে মূল্যায়িত হতে পারেঃ

(ক) প্রথম দিক হচ্ছে-

(১) লংমার্চ করার অর্থ মাওসেতুংকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সূরা আহ্যাব/২১)

(২) লংমার্চ কমিউনিষ্ট নেতা মাওসেতুং-এর একক আবিস্কার। সুতরাং লংমার্চ করা তাকেই অনুসরণ করা।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

اطيعوا الله ورسوله ان كنتم مؤمنين.

অর্থঃ- “যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করো।” (সূরা আনফাল/১)

(৩) লংমার্চ করার অর্থ কমিউনিজমকে সমর্থন করা ও বাতিল মতবাদের সাহায্য নেয়া।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولاتعاونوا على الاثم والعدوان.

অর্থঃ- “তোমরা পাপ ও শত্রুতার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করনা।” (সূরা মায়িদা/২)

(৪) লংমার্চ করার অর্থ কমিউনিষ্ট আইন-কানুনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা উদ্যোগ নেয়া বা চাওয়া।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

افحكم الجاهلية يبغون ومن احسن من الله حكما لقوم يوقنون.

অর্থঃ- “তোমরা কি জাহিলিয়াতের হুকুম-আহকাম, নিয়ম-কানুন চাও? অথচ আল্লাহ্ পাক থেকে উত্তম হুকুম দাতা ও আইন-কানুন প্রণেতা কে রয়েছেন বিশ্বাসীদের জন্য।” (সূরা মায়িদা/৫০)

(৫) ইসলামকে অপূর্ণ মনে করা।    অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا.

অর্থঃ- “আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং নিয়ামতকে তোমাদের উপর পূর্ণ করে দিলাম এবং দ্বীন ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করে দিলাম।” (সূরা মায়িদা/৩)

(৬) হক্ব ও নাহক্বকে মিশ্রিত করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولا تلبسوا الحق بالباطل.

অর্থঃ- “তোমরা হক্বকে নাহক্বের সাথে মিশ্রিত করোনা।” (সূরা বাক্বারা/৪২)

(৭) ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম তালাশ করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

من يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে তার থেকে তা কখনই গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)

(৮) লংমার্চ করলে গণফৌজ, লালফৌজ, চীনা কমিউনিষ্ট তথা মাওসেতুং বর্ণিত লংমার্চের মধ্যে বিশ্ব মুক্তির বীজ লুকিয়ে আছে এ কথা স্বীকার ও প্রমাণ করা।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

افغير دين الله يبغون وله اسلم من فى السموت والارض طوعا وكرها واليه يرجعون.

অর্থঃ- “তোমরা কি আল্লাহ্ পাক-এর দ্বীন (ইসলাম) ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ কর। অথচ তাঁর জন্য আসমান-যমীনের সবকিছু ইচ্ছা এবং অনিচ্ছায় সমর্পিত রয়েছে এবং সবকিছু তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৩)

 (খ) আর দ্বিতীয় দিক হচ্ছে-

(১) লংমার্চ না হলে চীনা কমিউনিষ্টরা সিয়েনসি প্রদেশ থেকে বের হতে পারতো না। সুতরাং কমিউনিষ্ট মতবাদও প্রতিষ্ঠা পেতনা।

অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

من سن فى الاسلام سنة سيئة كان عليه وزرها ووزر من عمل بها.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলামের মধ্যে কোন বদ প্রথা প্রচলন করলো এর গুণাহ্ তার উপর বর্তাবে এবং যারা উক্ত বদ প্রথা আমল করবে তার গুণাহ্ও  তার উপর বর্তাবে।” (মুসলিম, মিশকাত)

(২) লংমার্চ সম্মুখ জয়ের কাহিনী নয় বরং পিছন দিকে পলায়নের কাহিনী বা প্ররিক্রমা।

অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

من وقر صاحب بدعة فقد اعان على هدم الاسلام.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কোন বিদ্য়াতী বা গোমরাহ্কে সম্মান করল সে যেন ইসলাম ধ্বংসের কাজে সাহায্য করল।” (মিশকাত শরীফ)

(৩) লংমার্চ মাওসেতুং, গণফৌজ, লালফৌজ তথা কমিউনিষ্টদের কৃতিত্ব ও বীরত্বগাঁথাকে প্রচার ও প্রকাশ করা।

অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

اذا مدح الفاسق اهتز له العرش.

অর্থঃ- “যখন কোন ফাসিক-ফুজ্জার বা কাফিরের প্রশংসা করা হয় তখন তার কারণে আল্লাহ্ পাক-এর আরশ কাঁপে।” (মিশকাত শরীফ)

লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয নেইঃ

উপরোক্ত পর্যালোচনার পর আমরা লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয কিনা তা তাহকীক্ব করব। লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয নেই। আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

 يايها الذين امنوا لاتقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكفرين عذاب اليم.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ তোমরা রঈনা বলোনা উনজুরনা বল এবং শ্রবণ কর (বা শুনতে থাক) আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/১০৪)

এ আয়াতের শানে নুযুলে বলা হয়, ইহুদীরা হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেবার জন্য রঈনা শব্দ ব্যবহার করত যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হলো- ‘আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন’ যা ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয় আর খারাপ অর্থে ‘হে মূর্খ’, ‘হে মেষ শাবক’ এবং হিব্রু ভাষার একটি বদ্দোয়া। ইহুদীরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রঈনা বলে সম্বোধন করত। যাতে প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল খারাপ অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা। অন্যান্য ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ রঈনা শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে হুজুর পাক ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলে তখন ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসাহাসি করত। এতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন তবুও কিছু বলতেন না। কেননা, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না। যেমন, কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

وما ينطق عن الهوى ان هو الاوحى يوحى.

অর্থঃ- “তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজের থেকে মনগড়া কোন কথা বলেন না।” (সুরা নজম/৩,৪)

এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের আয়াত নাযীল করে রঈনা শব্দের বদলে উনজুরনা শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ রঈনা শব্দ ভাল খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হলেও উনজুরনা শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হত। তাই যে সকল শব্দ ভাল মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে উপরোক্ত আয়াত মোতাবিক ওটার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তাই লংমার্চ শব্দের দু’টি অর্থ- আভিধানিক ও ব্যবহারিক থাকলেও, আর আভিধানিক অর্থে লংমার্চের অর্থ লম্বা সফর হলেও এ অর্থে লংমার্চ কখনও ব্যবহৃত হয়নি বরং তার ব্যবহারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্যবহারিক অর্থে নাস্তিকদের পলায়নের ও নাস্তিক্যবাদের প্রতিষ্ঠার এক বিশেষ পদ্ধতিকে বুঝায় এবং এই অর্থেই এটা মশহুর। তাই লংমার্চ যেহেতু ভাল ও মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। তাই কুরআন শরীফের উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী এই শব্দ ব্যবহার করা যাবেনা। কারণ লংমার্চ সর্ব প্রথম বিধর্মী নাস্তিক্যবাদের ধারক ও বাহক মাওসেতুং কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়।

লংমার্চ করা জায়েয নেইঃ

আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

ان الدين عند الله السلام.

অর্থঃ-“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাকের নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম।” (সুরা আলে ইমরান/১৯)

আর এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে ইরশাদ করেছেন,

ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (নিয়ম-নীতি, অন্য ধর্ম) তালাশ করে, তা কখনই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)

আর এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال: انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى؟ لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.

অর্থঃ- হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইহুদীদের অনেক ধর্মীয় কাহিনী, কথা-বার্তা, নিয়ম-কানুন ইত্যাদি শ্রবণ করে থাকি যা আমাদের নিকট ভাল লাগে। আমরা এর থেকে কিছু লিখে রাখতে পারবো কি? তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমরাও কি তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ বা বিভ্রান্ত রয়েছ? যেভাবে ইহুদী-নাসারাগণ বিভ্রান্ত রয়েছে? আল্লাহ্ পাক-এর কসম! আমি তোমাদের নিকট সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও পরিপূর্ণ দ্বীন এনেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম যদি এখন থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (আহমদ, বায়হাক্বী, শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত)

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+