শবে বরাত


1494440404
শবে বরাত কি ? শব অর্থ রাত্রি বা রজনী,বরাত অর্থ ভাগ্য = ভাগ্য রজনী । শবে বরাত শব্দটি ফারসী । হাদীস শরীফ উনার ভাষায় লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান । সম্মানীত কুরআন শরীফ উনার ভাষায় লাইলাতুম মুবারাকা = বরকত পূর্ণ রজনী ।
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ﴿٣﴾ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ﴿٤﴾ أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا ۚ إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ ﴿٥﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে (শবে বরাতে) কুরআন নাযিল করেছি অর্থাৎ নাযিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিশ্চয়ই আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। উক্ত রাত্রিতে আমার নির্দেশে আমার পক্ষ থেকে সমস্ত প্রজ্ঞাময় কাজগুলো ফায়ছালা করা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (পবিত্র সূরা দুখান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩-৫)
উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ‘লাইলাতুল মুবারাকাহ’ শব্দ দ্বারা ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান’ তথা অর্ধ শা’বানের রাত বা শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে। সর্বজনমান্য বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীরগুলোসহ সকল তাফসীরসমূহে এ কথাই উল্লেখ আছে। মুসলমানগণের দোয়া কবুলের রাত, ক্ষমা বা মাগফিরাতের রাত, তওবা কবুলের রাত, বিপদ-আপদ থেকে নাযাত পাওয়ার রাত এবং এক বছরের হায়াত ও রিযিকের ফায়সালার রাত। (সুবহানাল্লাহ)

***আখিরী রসূল, রহমতুল্লিল আলামীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
اِنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِـىْ خَـمْسِ لَيَالٍ اَوَّلُ لَيْلَةٍ مّنْ رَجَبَ وَلَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَلَيْلَةُ الْقَدْرِ الْـمُبَارَكَةِ وَلَيْلَتَا الْعِيْدَيْنِ
“নিশ্চয়ই পাঁচ রাত্রিতে দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়ে থাকে। (১) রজব মাসের প্রথম রাতে, (২) শবে বরাতের রাতে, (৩) ক্বদরের রাতে, (৪) ঈদুল ফিতরের রাতে, (৫) ঈদুল আযহার রাতে।” (মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ, আমালুল ইয়াত্তমি ওয়াল লাইলাতি)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عنْ حَضْرَتْ عَلِيِّ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ‏ اِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُوْمُوا لَيْلَهَا وَصُوْمُوا يَوْمَهَا‏‏ فَاِنَّ اللهَ يَنْزِلُ فِيْهَا لِغُرُوْبِ الشَّمْسِ اِلَى سَـمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُوْلُ اَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَاَغْفِرَ لَهٗ اَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَاَرْزُقَهٗ اَلاَ مُبْتَلًى فَاُعَافِيَهٗ اَلاَ كَذَا اَلاَ كَذَا حَتّٰ يَطْلُعَ الْفَجْرُ‏. هَلْ مِنْ تَائِبٍ فَاَتُوبُ عَلَيْهِ هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَاٰتُ مَسْئُوْلَهٗ اَلاَ كَذَا اَلاَ كَذَا حَتّٰ يَطْلُعَ الْفَجْرُ
অর্থ : “আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন পবিত্র শা’বান মাস উনার ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত শরীফ উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত বরবতপূর্ণ রাত্রি উনার মধ্যে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত বরকতপূর্ণ রাত্রি উনার মধ্যে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষণা করেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করবো। কোন মুছিবতগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিবো। এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” সুবহানাল্লাহ! (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, কোন তওবাকারী আছো কি? আমি তার তওবা কবুল করব। কোন প্রার্থী আছো কি? আমি তার তার প্রার্থীত বিষয় দিয়ে দিব। এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” সুবহানাল্লাহ!
– রহমতে খাছ লাভ করা যায়
– গুনাহখাতা ক্ষমা হয়
– রিযিক বরকত হয়। কুদরতী রিযিকের ব্যবস্থা হয়।
– মুছিবতগ্রস্থ: সমস্ত মুছিবত দূর হয়
– তওবা: কবুল করা হয়
– যাচিত বিষয়, চাহিদা: বান্দার সকল যাচিত বিষয় এবং চাহিদা মিটিয়ে দেয়া হয় । সুবহানাল্লাহ ।

– ***সম্মানীত শবে বরাত শরীফ উনার রাত্রীতে করণীয় বিষয় :

* ছলাতুল ঈশা আদায়,
* মীলাদ শরীফ-ক্বিয়াম শরীফ পাঠ,
* তওবা ইস্তগিফার,
* মকবুল মুনাজাত শরীফ
* ছলাতুত তাসবীহ: অতঃপর ছলাতুত তাসবীহ-এর নামায পড়া হয়, যার দ্বারা মানুষের সমস্ত গুণাহখতা ক্ষমা হয়,
* যিকির-আযকার করা: যিকির-আযকার করা হয় যার দ্বারা অন্তর ইছলাহ হয়।
* কুরআন শরীফ তিলাওয়াত: পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা হয় যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা-উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কেননা নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত হচ্ছে সর্বোত্তম আমল।
* মীলাদ শরীফ-ক্বিয়াম শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ: মীলাদ শরীফ, ক্বিয়াম শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ করা হয়, যার দ্বারা আল্লাহ পাক-উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিইয়ীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
* শবে বরাত উনার নামায পড়া: ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ রাকায়াত নামায পড়া হয়
* তাহাজ্জুদের নামায পড়া, যা দ্বারা আল্লাহ পাক-উনার নৈকট্য হাছিল হবে।
শবে বরাতের নামাযের ফযীলত সম্পর্কে ‘তাফসীরে রুহুল মায়ানীতে’ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘যে ব্যক্তি শবে বরাতের নামায আদায় করবে সে ব্যক্তি ২০টি মকবুল হজ্জের ও বিশ বছরের রোযার ছওয়াব পাবে।’ সুবহানাল্লাহ! ‘নুজহাতুল মাজালিস’ গ্রন্থে আছে, শবে বরাতের ২ রাকায়াত নামায বনী ইসরাইলের এক বুযূর্গ ব্যক্তির পাথরের ভিতরে থেকে চারশত বছরের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।’ সুবহানাল্লাহ!
ওয়াকেয়া: পাথরের ভিতর আবেদ’
নুযহাতুল মাজালিশ নামক কিতাবের ১ম খণ্ডের ১৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
مر حضرت عيسى بن مريم عليه السلام على جبل فراى فيه صخرة بيضاء فطاف بـها حضرت عيسى عليه السلام وتعجب عنها فاوحى الله اليه اتريد ان ابين لك اعجب مما رأيت قال نعم فان فلقت الصخرة عن رجل بيده عكارة خضراء وعنده شجرة عنب فقال هذا رزق كل يوم فقال كم تعبد الله فى هذا الـحجر فقال منذ اربع مائة سنة فقال حضرت عيسى عليه السلام يا ربى ما اظن انك خلقت خلقا افضل منه فقال من صلى ليلة النصف من شعبان من امة مـحمد صلى الله عليه وسلم ركعتين فهو افضل من عبادته اربع مائة عام قال عيسى عليه السلام ليتنى من امة مـحمد صلى الله عليه وسلم.
অর্থ: হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ার উপরে দিয়ে চলছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি সাদা পাথর দেখতে পেলেন। তিনি ওই পাথরের চারপাশে ঘুরে আশ্চর্যান্বিত হলেন। হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার আশ্চর্যবোধ দেখে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার নিকট ওহী পাঠিয়ে বললেন, হে আমার নবী হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম! আপনি সাদা পাথরখানা দেখেই অবাক হয়েছেন! এর চেয়ে আশ্চর্যজনক বস্তু আপনি কি দেখতে চান?
জবাবে হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি- জি বলতে না বলতেই পাথরটি ফেটে গেলো। উহার মধ্যে সবুজ রঙের লাঠি হাতে নিয়ে একজন বুযুর্গ ব্যক্তি দাঁড়ানো আছেন এবং উনার সামনে একটি আঙ্গুরের গাছ আছে। তখন সেই বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, ইহা আমার প্রতি দিনের খাবার। এরপর হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি ওই বুযুর্গ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনি কতকাল পর্যন্ত এই সাদা পাথরের ভিতরে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত আছেন? হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার এই প্রশ্নের জবাবে বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, সুদীর্ঘ চারশত বৎসর ধরে এই পাথরের ভিতরে আমি ইবাদত-বন্দেগী করছি। তখন হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি (আরো আশ্চর্য হয়ে) বললেন, ইয়া বারে ইলাহী! আমার ধারণা যে, হয়তোবা আপনি এই বুযুর্গ ব্যক্তির চেয়ে আর কোনো উত্তম মাখলুক সৃষ্টি করেননি। হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার এই আবেগপূর্ণ বাণী শুনে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, উম্মতে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের কোনো ব্যক্তি যদি অর্ধ শা’বানের রাতে তথা শবে বরাতে ২ রাকায়াত নামায আদায় করে তাহলে তা এই বুযুর্গ ব্যক্তির চারশত বৎসরের ইবাদত হতেও উত্তম হবে। সুবহানাল্লাহ!
হযরত রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি এই কথা শুনে বললেন, হায় আফসোস! আমি যদি আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামূল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মত তথা উম্মতে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে পারতাম। সুবহানাল্লাহ! (নুযহাতুল মাজালিস)
আল্লাহ পাক আমাদেরকে বিশেষ করে শবে বরাতের রাত্রে খাছ ভাবে ইবাদত বন্দেগী করার তৈফিক দান করুন । আমীন !

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে