শুধুমাত্র শোষণ করার জন্যই ঢাকা শহরকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে না


রাস্তার দুইদিকে যেভাবে অট্টালিকা গড়ে উঠেছে, সেগুলো ভেঙে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রশস্ত করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। রাজউককে কোনো অবকাঠামোর অনুমোদন দেয়ার আগে রাস্তা সম্পর্কে আরও শক্ত অবস্থান দেখাতে হবে। আবার রাজউক, সিটি করপোরেশন বা সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে শুধু দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীকেন্দ্রিক শ্রমের অভিবাসন কমানো গেলে, জনসংখ্যার চাপ এমনিতেই কমে যাবে আশা করা যায়। শিল্প-কারখানা সাধ্যমতো রাজধানীর বাইরে স্থানান্তর করা গেলে উৎপাদনের খরচ যেমন কমে আসবে, তেমনি স্থানীয় শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে। তৈরি হবে নতুন উদ্যোক্তা।
কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান, যত ব্যয়বহুল স্থানেই হোক, সেখানে শ্রমিক শ্রম বিক্রি করতে যাবে। তবে যেখানে শ্রম সস্তা, সহজলভ্য, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শ্রমিক এবং উদ্যোক্তা দুই পক্ষের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে। গরিব মানুষের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না; কিন্তু শ্রমশক্তি থাকে। বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করে ঢাকা বা আশপাশের বাইরে শিল্প-কারখানা স্থাপন বা স্থানান্তর করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমে যাবে। অন্যথায় দেশের মানুষ যদি শ্রমঘন পরিবেশে অভিগমন করে, তাহলে আমাদের ঢাকা, আমাদের প্রিয় রাজধানী শহর মানুষের চাপে ভরপুর হতেই থাকবে। আর বিশ্বের বসবাস-অযোগ্য শহরের তকমা আমাদের গায়ে লাগতেই থাকবে। তখন রাজধানী ঢাকাকে তার প্রাণস্পন্দন ফিরিয়ে দিতে সরকারের যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ বেগ পেতে হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এ অবস্থায় ঢাকা পরিণত হয়েছে দেশবাসীর প্রধান গন্তব্যস্থলে। আর এ কারণেই অতিরিক্ত চাপ সইতে না পেরে ঢাকা হারাচ্ছে তার স্বাভাবিকতা। এ অবস্থা থেকে এ মহানগরীকে বাঁচানোর জন্য বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়েছেন বিকেন্দ্রীকরণ-এর ওপর।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ৮২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিই ঢাকায়। ৩৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ৩২টিই এ ঢাকা মহানগরীতে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের চরম ভারসাম্যহীন অবস্থার এটিই বাস্তবচিত্র।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮২টি। এর মধ্যে ৬০টি ঢাকা শহরে। ৩৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ৩২টি ঢাকাতে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, মানের দিক থেকেও দেশের সেরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এ শহরটিতে কেন্দ্রীভূত।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (মে, ২০০৯) তথ্য অনুযায়ী, ৬টি বিভাগে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় ১ কোটি ৭ লাখ ৭৩ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর মধ্যে ৩০ লাখ ৩০ হাজার (২৮ শতাংশ) শিক্ষার্থী শুধু ঢাকা বিভাগেই। এর বড় অংশটি ঢাকা শহরে।
অপরদিকে, দেশে সবচেয়ে বেশি স্কুল চট্টগ্রাম বিভাগে (৭০৬টি), আর ঢাকা বিভাগে ৫৮৫টি। কিন্তু, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ঢাকায় বেশি। অন্যদিকে, কলেজের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে ২২২টি, যা যে কোনো বিভাগের চেয়ে অনেক বেশি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নূর-উন-নবী বলেন, ‘ছেলেমেয়ের ভালো শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার জন্য সারা দেশের মানুষের প্রথম পছন্দের শহর ঢাকা।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, ‘বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা ছাড়া ঢাকাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে